ঢাকা, সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

টেস্ট ক্রিকেটকে ওয়ানডে বানিয়ে ফেলেছে ইংল্যান্ড

২০২২ জুলাই ০৬ ০৯:২১:১৭
টেস্ট ক্রিকেটকে ওয়ানডে বানিয়ে ফেলেছে ইংল্যান্ড

বার্মিংহ্যামের ভারতের বিপক্ষে এজবাস্টন টেস্টের চতুর্থ দিন সকাল পর্যন্তও জিততে পারবে এ ধারণা হয়তো ছিল না ইংল্যান্ড ক্রিকেটারদের। তবে, ‘জয়’ এমন একটা টনিক, যা একবার কোনোভাবে পেলে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, চিন্তার প্রখরতা বাড়ে; এই বিশ্বাস জন্মে যে আমি পারবো, পারতে হবেই।

ইংল্যান্ডের নতুন টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকসের ক্যারিয়ারে শেষ দুই-তিন বছরের দিকে তাকালে এ সত্যের দেখা মিলবে যেন সবচেয়ে বেশি। ‘স্নায়ু চাপ’ বলে যে একটা কথা আছে ক্রিকেটে, এ বিষয়টা সম্ভবত কখনোই ছুঁতে পারে না স্টোকসকে।

২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালের শেষ মুহূর্তটা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। বাউন্ডারি গণনায় বেশি হওয়ায় ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন- তা নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। কিন্তু একটা বিষয় খুব কমই আলোচনা হয়। তা হলো, ইংল্যান্ডকে লড়াইয়ের সে পর্যায়ে তুলে এনেছিলেন কে? কার সাহসিকতায় নিশ্চিত হারতে বসা একটি ম্যাচকে এমন শ্বাসরূদ্ধকর পরিসমাপ্তির দিকে নিয়ে এসেছিল?

স্টোকস শুধু বিশ্বকাপের ফাইনালই নয়, টি-টোয়েন্টি কিংবা টেস্ট- এ ধরনের ফিনিশিংয়ের নজির আরও রেখেছেন। হার মানতে না জানা একজন ক্রিকেটার থাকতে জো রুটের পর অন্য কাউকে নেতৃত্বের ভার দেয়ার জন্য খুঁজতে হয়নি ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডকে (ইসিবি)।

স্টোকস নেতৃত্বে, আর ইংল্যান্ড কোনো ম্যাচে ন্যুনতম লড়াই করবে না তা কী করে হয়! এ যেন এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। শুধু তাই নয়, জয়ের ক্ষেত্রে তারা একের পর এক যে নজির গড়ে যাচ্ছে, তা রীতিমত বিস্ময়কর। ভারতের বিপক্ষে এজবাস্টন টেস্টের চতুর্থদিন সকাল পর্যন্তও কারো জানা ছিল না, এই টেস্টে ইংল্যান্ড ঘুরে দাঁড়াতে পারে কিংবা টেস্ট ম্যাচটা বাঁচাতে পারে।

দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতকে ২৪৫ রানে বুক করে ফেলার পরও লক্ষ্য দাঁড়িয়েছিল ৩৭৮ রানের। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে এতবড় লক্ষ্য তাড়া করে ম্যাচ জয়ের ইতিহাস নেই ইংলিশদের। এর আগে ২০১৯ সালে হেডিংলিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৫৮ তাড়া করে ৯ উইকেটে ৩৬২ তুলে জিতেছিল তারা। এটাই ছিল তাদের সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড।

কিন্তু ৩৭৮ রান তাড়া করা, তারওপর ভারতের হাতে রয়েছে যে কোনো সময়ের তুলনায় সেরা পেস বোলিং অ্যাটাক। তাদের বিরুদ্ধে চতুর্থ ইনিংসে এতবড় রান তাড়া করার চিন্তা করাটাও তো চাট্টিখানি কথা নয়। অথচ, সে জায়গায় চতুর্থ দিন শেষ বিকেলেই ম্যাচটে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসেন জো রুট আর জনি বেয়ারেস্টো।

পঞ্চম দিনের জন্য বাকি রাখেন কেবল ১১১ রান। যেটা শেষ দিনের শুরুতে ব্যাট করতে নেমে অবিচ্ছিন্ন থেকেই সংগ্রহ করে নেন রুট আর বেয়ারেস্টো। ৭৬.৪ ওভারে ৭ উইকেটে ম্যাচ জয় করে নেয় ইংল্যান্ড। ওভারপ্রতি রান তোলার গড় ছিল ৪.৯৩। রীতিমত ওয়ানেড স্টাইল।

বেন স্টোকস নেতৃত্বে আসার পর এ নিয়ে চারটি টেস্ট খেললো ইংল্যান্ড। চারটিতেই জয়। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের জয়ের ধরণ। ইংল্যান্ডের এই চার টেস্টে জয়ের ধরণ দেখলে যে কারও চিন্তা হতে বাধ্য, এটা কী সত্যিই ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি নাকি টেস্ট?

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ এবং ভারতের বিপক্ষে এজবাস্টন টেস্ট। প্রতিটি টেস্টেই চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়া করে ম্যাচ জয় করেছে ইংলিশরা। আর চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়া করার এই ধরণ দেখে এখন প্রতিটি দলই শঙ্কায় ভুগতে শুরু করবে, ইংল্যান্ডকে কত রানের লক্ষ্য দিলে তারা সেটাকে তাড়া করে জয় ছিনিয়ে নিতে পারবে না?

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তো অধিনায়ক স্টোকস বলেই দিয়েছেন, ‘আমি তো ভেবেছিলাম ৪৫০ এর মত লক্ষ্য দাঁড়াবে, তাহলে দেখতাম আমরা কী করি। চতুর্থ দিনের খেলা শেষে আমি আমার সতীর্থদের বলছিলাম, এখন প্রতিপক্ষের জন্য তৃতীয় ইনিংসই হয়ে গেছে চতুর্থ ইনিংসের মত। তারা ব্যাট করবে কি, চিন্তায় অস্থির থাকে, কত রান দিলে আমরা তাড়া করতে পারবো না। শেষ ইনিংসে আমাদের খেলার ধরণ কি হতে পারে, তা নিয়ে তারা বেশি ব্যস্ত থাকে। সুতরাং, আমাদের বড় সাফল্য হলো, তৃতীয় ইনিংসেই প্রতিপক্ষের মধ্যে আমরা একটা ভয় তৈরি করে দিতে পারছি। যা চতুর্থ ইনিংসে আমাদের জন্য দারুণ সহায়ক হচ্ছে।’

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের কথাই ধরুন! লর্ডসে জয়ের জন্য লক্ষ্য ২৭৭ রান। জো রুট সেঞ্চুরি করলেন। ৭৮.৫ ওভার ব্যাট করে ৫ উইকেটে জয় তুলে নিলো ইংলিশরা। ওভার প্রতি রান তুলেছিল ৩.৫৩ করে। তবুও মেনে নেয়া যায় যে, এই ম্যাচে রান তাড়া করে জিতলেও তা ছিল আদর্শ টেস্ট মেজাজে।

কিন্তু পরের তিন ম্যাচে যা করেছেন জনি বেয়ারেস্টো, জো রুট আর বেন স্টোকসরা, তা রীতিমত অবিশ্বাস্য। নটিংহ্যামে দ্বিতীয় ইনিংয়ে জয়ের জন্য ইংল্যান্ড লক্ষ্য পেয়েছিল ২৯৯ রানের। দিনের খেলা সর্বোচ্চ ৭৫ ওভার বাকি। কেউ চিন্তাই করেনি ইংল্যান্ড এত কম সময়ের মধ্যে জয়ের চিন্তা করবে।

কিন্তু কী আশ্চর্য! জনি বেয়ারেস্টো যেন টি-টোয়েন্টি খেললেন। ৯২ বলে করলেন ১৩৬ রান। মাত্র ৫০ ওভারেই জয় তুলে নিলো ইংলিশরা। রান তোলার হার দেখলে ভিমরি খেতে হবে, ৫.৯৮ করে। ওয়ানডেতেও তো ভাঙা উইকেটে এত দ্রুত গতিতে রান তুলে ম্যাচ জয় করা সম্ভব হয় না অনেকের ক্ষেত্রে। সে জায়গায় ইংল্যান্ড ম্যাচ জিতে গেলো ৫ উইকেটে, মাত্র ৫০ ওভারে!

লিডসের হেডিংলিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ টেস্টেও একই ঘটনার পূনরাবৃত্তি। চতুর্থ ইনিংসে ২৯৬ রানের লক্ষ্য পেয়েছিল ইংলিশরা। ওলি পোপের ১০৮ বলে ৮২, জো রুটের ১২৫ বলে ৮৬ এবং টি-টোয়েন্টি স্টাইলে ব্যাট করে মাত্র ৪৪ বলে অপরাজিত ৭১ রান করে ইংল্যান্ডকে ৭ উইকেটের জয় এনে দিলেন জনি বেয়ারেস্টো।

৮টি বাউন্ডারির সঙ্গে ৩টি ছক্কার মার মারলেন তিনি। লিডসের দর্শকরা টেস্ট দেখতে এসে টি-টোয়েন্টির মজা নিয়ে ঘরে ফিরে গেলেন। মাত্র ৫৪.২ ওভারে এবং ওভারপ্রতি ৫.৪৪ গড়ে রান তুললো ইংলিশ ব্যাটাররা।

টি-টোয়েন্টির এই যুগে টেস্ট ক্রিকেটকেও চূড়ান্ত আকর্ষণের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হলো ইংল্যান্ড। শেষ মুহূর্তে যে শ্বাসরূদ্ধকর অবস্থা তৈরি করে তারা ম্যাচ জিতে নিচ্ছে, তাতে সবাই মনে করতে পারে, টেস্ট ক্রিকেটের মেজাজ, টেস্টের ধরণ কিংবা রূপ-বৈচিত্র্য সব কিছুই বদলে দেয়ার সংকল্প করেছে যেন ইংল্যান্ড।

বিষয়টা হয়তো নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ পর্যন্ত থেকে গেলে আলোচনটা আর এগুতো না। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে এজবাস্টনে যেভাবে ইংল্যান্ড ম্যাচ জিতলো, তাতে আলোচনা আবারও উঠে গেলো, ইংল্যান্ড কী তবে টেস্টের ধরণটাই পাল্টে দিচ্ছে?

নিউজিল্যান্ড বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়তে না পারলেও ভারত পেরেছিল। এজবাস্টন টেস্টে তো ভারতই জিতে যাবে মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ ইনিংসে ৩৭৮ রানের বড় বাধাও যে অনায়াসে টপকে যাবে জো রুট আর জনি বেয়ারেস্টো, তা ভাবতে পারেনি কেউ। এ দু’জনের ২৬৯ রানের জুটি এবং ওভারপ্রতি রান তোলার হার ৪.৯৩ দেখলেই বিষয়টা আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে নিশ্চিত।

জনি বেয়ারেস্টো আর জো রুটের কথা আলাদাই বলতে হয়। নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়ার পর জো রুটের ক্ল্যাসিক্যাল ব্যাটিং ফিরে এসেছে। গত চার টেস্টে তিনটি সেঞ্চুরি উপহার দিয়েছেন তিনি। সেঞ্চুরি করে দুটি ম্যাচে সরাসরি জয়ে অবদান রেখেছেন। রান করছেন, সেঞ্চুরি আসছে, তাতে রুটের ব্যাটে বিধ্বংসী রূপ দেখা যায়নি কখনো। ছিল নান্দনিকতা, ক্ল্যাসিক্যাল শটের সংমিশ্রন।

কিন্তু জনি বেয়ারেস্টো? বুনো, হিংস্র, নির্দয় এবং উদ্ধত একজন ব্যাটার। টেস্টকে বানিয়ে দিয়েছেন পুরোপুরি টি-টোয়েন্টি। যে কেউ হঠাৎ দেখলে মনে করবে ভুল করে সাদা পোশাকে বুঝি কেউ টি-টোয়েন্টি খেলতে নেমে গেছেন! আর কি ধারাবাহিকতা! শেষ ৫ ইনিংসের চারটিতেই সেঞ্চুরি! অন্যটি অপরাজিত ৭১, কল্পনা করা যায়?

প্রতিটি সেঞ্চুরি ঝড়ো গতির। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টে তো ১৬১.৩৬ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করেছেন। টি-টোয়েন্টিতেও এত স্ট্রাইক রেট খুঁজে পাওয়া কঠিন। দ্বিতীয় টেস্টে ১৩৬ রান করে দলকে জিনিয়েছিলেন, তারও স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫০ এর কাছাকাছি।

ওয়ানডে ক্রিকেটেও রান বন্যা বইয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে একের পর এক ইতিহাস গড়ে চলেছে ইংল্যান্ড। ৪৯৮, ৪৮১ এবং ৪৪৪- ওয়ানডে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ তিনটি স্কোরের মালিকই হলো ইংলিশরা। সম্প্রতি তারা নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গড়েছে ৪৯৮ রানের বিশাল স্কোরের রেকর্ড।

অধিনায়ক ইয়ন মরগ্যান বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তার পরিবর্তে যাকে অধিনায়ক করা হয়েছে, সেই জস বাটলার জনি বেয়ারেস্টোর মতোই বিধ্বংসী। সর্বশেষ আইপিএলে যিনি একাই চারটি সেঞ্চুরি করেছিলেন। বাটলারের অধীনে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে এবং স্টোকসের অধীনে টেস্টে- আগামীর ক্রিকেট বিশ্ব শাসন করতে প্রস্তুত ইংল্যান্ড। শাসন করাটা যেমনই হোক, সেটা রানের বন্যায় বইয়ে দিয়ে কিংবা টেস্টে অবিশ্বাস্য সব জয় দিয়ে।

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

খেলা এর সর্বশেষ খবর

খেলা - এর সব খবর



রে