ঢাকা, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

৫ লাখ ইঁদুর মেরে অর্ধশতাধিক পুরস্কার পেলেন, এক কৃষক

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেট নিউজ
২০২৩ নভেম্বর ২৫ ১৫:৩৭:৪০
৫ লাখ ইঁদুর মেরে অর্ধশতাধিক পুরস্কার পেলেন, এক কৃষক

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের কৃষক মো. হোসেন আহমেদ (৮৩)। এলাকায় তিনি তার আসল নামের চেয়ে ইঁদুর শিকারিদের (র্যাট হান্টার) দেওয়া নামেই বেশি পরিচিত। নিজের জমিতে ইঁদুরের উপস্থিতি দেখে তিনি ২০ বছর বয়স থেকে ইঁদুর মারতে শুরু করেন। তখন থেকেই ইঁদুর মারা তার নেশা হয়ে যায়। আর এই নেশায় তিনি ৬০ বছর ধরে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ইঁদুর নিধন করছেন। এসময় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ইঁদুর মেরে অর্ধ শতাধিক পুরস্কার পাওয়া যায়।

ইঁদুর ফসলের বেশি ক্ষতি করে। ইঁদুর তাদের খাওয়ার চেয়ে ১০ গুণ বেশি খাবার নষ্ট করে। তাছাড়া বিভিন্ন রোগ ছড়ায়। মূলত, এই ক্ষতির পরিমাণ বুঝতে পেরে তিনি ইঁদুর শিকারে অনুপ্রাণিত হন।

উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, প্রতিবছর অক্টোবর থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মাসব্যাপী ফসল রক্ষায় ইঁদুর নিধন অভিযান পরিচালিত হয়। এতে উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায় থেকে দেশ সেরা ইঁদুর শিকারিদের পুরস্কৃত করা হয়। সোনাগাজী উপজেলার মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের দশপাইয়া এলাকার মো. হোসেন আহম্মদ চলতি বছর ১২ হাজার ৫৮৯টি ইঁদুর মেরে জেলা ও উপজেলায় প্রথম এবং চট্টগ্রাম বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছেন। এভাবে বিগত ৬০ বছর ধরে তিনি প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ইঁদুর মেরেছেন।

হোসেন আহম্মদ বলেন, ৭ থেকে ৮ বছর বয়স থেকে ইঁদুর মেরে আসছি। এরশাদের আমল থেকে ইঁদুর নিধনে নিয়মিত পুরস্কার পাচ্ছি। তখন লেজ জমা দিয়ে ১২০ কেজি করে দুবার গম পেয়েছিলাম। তবে এখন আর লেজ জমা দেওয়া হয় না। তারপর থেকে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছি।

তিনি বলেন, প্রথমে বাঁশের কঞ্চি ও তার দিয়ে ফাঁদ তৈরি করি। ফাঁদে টোপ হিসেবে ধান, গম, ডাল আবার অনেক সময় শামুক ও নারকেল ব্যবহার করি। এসব খেতে এসে ইঁদুর ফাঁদে আটকা পড়ে। পরে বাঁশের ভেতর থেকে বের করে বস্তায় ভরে ওই ইঁদুর মেরে ফেলি। আর খাঁচা বসিয়ে যেগুলো ধরি সেগুলো পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলি। এভাবে ৬০ বছর ধরে এ কাজ করে আসছি। এটা এখন আমার কাছে নেশার মতোই।

হোসেন আহম্মদ বলেন, ইঁদুর নিধনের বিষয়টি অনেকেই স্বাভাবিক ভাবে নেয় না। তখনই আমি ইঁদুরের ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝিয়ে বলি। এই বিষয়গুলো যখন মানুষ শুনে এবং প্রয়জন হলে আমাকে ডাকে। পরে আমি আমার জিনিসপত্র নিয়ে গিয়ে ফাঁদ পেতে ইঁদুর ধরি। তবে বিনিময়ে কোনো টাকা-পয়সা গ্রহণ করি না। অনেকে খুশি হয়ে মাঝেমাঝে চা-নাস্তা খাওয়ায়। যেখান থেকে ডাক আসে সেখানে গিয়ে ইঁদুর ধরি। আবার তাদের ইঁদুর নিধন পদ্ধতিও শিখিয়ে দিয়ে আসি।

মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি অফিসার মো. আজিজ উল্যাহ বলেন, এলাকায় হোসেন আহম্মদকে সবাই এক নামে চেনেন। ইঁদুর নিধনে অসংখ্য পুরস্কার পেয়ে আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। অথচ ইঁদুর নিধনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে এলাকাবাসীর উপহাসের পাত্র হয়ে গেছেন তিনি। হোসেন আহম্মদ নিয়মিত ইঁদুর নিধন করার কারণে আমি এই অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে উপসহকারী কৃষি অফিসার ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থানের পুরস্কার লাভ করি।

সোনাগাজী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আল আমিন বলেন, দেশে প্রতিবছরই ৫০ থেকে ৫৪ লাখ মানুষের খাবার নষ্ট করে। সারাদেশের মতো সোনাগাজীতেও আমরা সারাবছর ইঁদুর নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমরা প্রায় ৮৩ হাজার ইঁদুর নিধন করতে সক্ষম হয়েছি।

তিনি আরও বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ইঁদুর নিধনে ব্লক ভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ কাজ করে। তারই ধারাবাহিকতায় সোনাগাজীর কৃষক হোসেন আহম্মদ এ অর্থবছরে একাই ১০ হাজার ইঁদুর নিধন করেছেন। উপজেলায় তার মতো আরও হোসেন আহম্মদ তৈরিতে আমরা কাজ করছি, যারা আগামীতে মানুষের ফসলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এলাকার বৃদ্ধ হোসেন আহম্মদ দীর্ঘদিন ধরে ইঁদুর নিধনে কাজ করছেন। এতে এলাকার ফসল ও কৃষকের অনেক উপকার হচ্ছে। এ কাজের জন্য এখন পুরো সোনাগাজী উপজেলার মানুষ তাকে লেজওয়ালা দাদা নামেই চেনে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুল হাসান জানান, ইঁদুর নিধনে হোসেন আহম্মদ একটি উদাহরণ। ইঁদুর নিধনে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। ভবিষ্যতে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে সব সহযোগিতা আমরা করব।

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ



রে