ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

সিমেন্ট খাতে চাহিদার ধাক্কা, কমছে মুনাফা ও ডিভিডেন্ড

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৪ ১৯:২৫:০০
সিমেন্ট খাতে চাহিদার ধাক্কা, কমছে মুনাফা ও ডিভিডেন্ড

৮ থেকে ১০ কোটি টন উৎপাদনের সক্ষমতা, অথচ বাজারে চাহিদা সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৮ কোটি টন—সিমেন্ট খাতে এই ব্যবধানই এখন বড় চাপের কারণ। দেশের তালিকাভুক্ত সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর অনেকগুলোই উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগাতে পারছে না। এর প্রভাব পড়ছে মুনাফা, ইপিএস ও ডিভিডেন্ডে। কোনো কোম্পানি ডিভিডেন্ড কমিয়েছে, আবার কোনোটি টানা ডিভিডেন্ড দিতে না পেরে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে।

নির্মাণ খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশে সিমেন্টের প্রকৃত চাহিদা এখন ৩ দশমিক ১ থেকে ৩ দশমিক ৮ কোটি টনের মধ্যে। ফলে অধিকাংশ কারখানা তাদের সক্ষমতার ৩০ শতাংশেরও কম ব্যবহার করছে। অথচ বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য সক্ষমতা ব্যবহারের হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ।

এই পরিস্থিতিতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল একরকম নয়। কারও মুনাফা কমেছে, কারও ডিভিডেন্ডে কাটছাঁট এসেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল ও পরিচালন সুবিধার কারণে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছে।

একই খাতে ভিন্ন চিত্র

সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর মধ্যে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি কাঁচামাল সংগ্রহের বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। মেঘালয়ের নিজস্ব চুনাপাথরের খনি থেকে ছাতক কারখানায় কনভেয়র বেল্টের মাধ্যমে কাঁচামাল আনার সুযোগ থাকায় প্রতিযোগীদের তুলনায় ব্যয় সাশ্রয় করতে পারছে প্রতিষ্ঠানটি।

কোম্পানিটির ২০২৩ সালের নিট মুনাফা ছিল ৫৯৪ কোটি টাকা এবং সে বছর ক্যাশ ডিভিডেন্ড ছিল ৫০ শতাংশ। ২০২৫ সালে মুনাফা ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৫১১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ওই বছর ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়া হয় ১৮ শতাংশ। তবে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে নিট মুনাফা ১৯ শতাংশ কমে ১১২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

অন্যদিকে কনফিডেন্স সিমেন্ট পিএলসি ২০২৫ সালে ৯৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। কোম্পানিটি ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। নরসিংদীতে নতুন কারখানা স্থাপনে ৮১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং রাইট শেয়ার ইস্যুর উদ্যোগ রয়েছে।

তবে এই কোম্পানির ক্ষেত্রেও আর্থিক চাপের ঘটনা রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ডিভিডেন্ড পরিশোধে ব্যর্থতার ঘটনায় বিএসইসি প্রতিষ্ঠানটিকে তলব করেছিল। পরে আর্থিক দায় সামাল দিতে ঢাকা-ভিত্তিক সাবসিডিয়ারি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত এক বছরে কনফিডেন্স সিমেন্টের শেয়ারদর প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে ৬১ থেকে ৬৩ টাকার মধ্যে রয়েছে।

ডিভিডেন্ড কমার সঙ্গে কমেছে মুনাফাও

হাইডেলবার্গ মেটেরিয়ালস বাংলাদেশ পিএলসি-এর ক্ষেত্রে মুনাফার পতনের সঙ্গে ডিভিডেন্ডেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে কোম্পানিটি ২৫ শতাংশ করে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। ২০২৫ অর্থবছরে সেই হার কমে দাঁড়িয়েছে ১১ শতাংশে।

২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফা ৫০ শতাংশ কমেছে। অর্ধবার্ষিকে কমেছে ৪৭ শতাংশ। শেয়ারবাজারেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। গত ছয় মাসে শেয়ারটির দর প্রায় ১৯ শতাংশ কমে বর্তমানে ২০৬ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।

ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসি-এর ক্ষেত্রেও মুনাফা কমেছে, যদিও ডিভিডেন্ডের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ২০২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ৭৪ দশমিক ২৩ কোটি টাকা। ২০২৫ অর্থবছরে তা ৩৩ শতাংশ কমে ৬৭ দশমিক ১২ কোটি টাকায় নেমেছে। এরপরও ২১ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।

চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ক্রাউন সিমেন্টের ইপিএস হয়েছে ৯১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২ টাকা ৩ পয়সা।

লোকসান কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেও চাপ কাটেনি

প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি ২০২২ ও ২০২৩ অর্থবছরে লোকসানে ছিল। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৭৪ দশমিক ২৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে। সে বছর ২১ দশমিক ৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়।

কিন্তু ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মুনাফা ৭৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৪৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অবশ্য ইপিএস বেড়ে ১ টাকা ৮০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে; আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩১ পয়সা।

শেয়ারদরের ক্ষেত্রেও ঊর্ধ্বমুখী চিত্র নেই। গত এক বছরে প্রায় ১৩ শতাংশ কমে বর্তমানে ৪২ থেকে ৪৫ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে প্রিমিয়ার সিমেন্টের শেয়ার। ব্যাংক ঋণের চাপ কমাতে ১৬১ কোটি টাকার প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির।

ডিভিডেন্ড বন্ধ, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে দুই কোম্পানি

খাতের দুর্বলতার আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়েছে আরামিট সিমেন্ট পিএলসি ও মেঘনা সিমেন্ট মিলস পিএলসি-এর অবস্থানে।

আরামিট সিমেন্টের কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ডিভিডেন্ড না দেওয়ার কারণে শেয়ারটি বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে। ডিএসইতে এর দর ১১ দশমিক ১০ থেকে ১১ দশমিক ২০ টাকা। প্রায় ৩৪ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান ১০৬ কোটি টাকা।

মেঘনা সিমেন্টও টানা দুই বছর ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। এর ফলে ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে শেয়ারটি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমেছে। বর্তমানে ২৮ দশমিক ৩০ থেকে ২৯ দশমিক ৪০ টাকায় শেয়ারটি লেনদেন হচ্ছে।

গত এক বছরে মেঘনা সিমেন্টের শেয়ারের সর্বোচ্চ দর ছিল ৫২ টাকা এবং সর্বনিম্ন ২৬ দশমিক ১০ টাকা। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৩২ কোটি টাকা। পুঞ্জীভূত লোকসান ও রিজার্ভ ঋণাত্মক ৩৭ কোটি টাকা হওয়ায় বাজার মূলধন কমে প্রায় ৮৯ দশমিক ৭১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

খাতের সমস্যার কেন্দ্রে অতিরিক্ত সক্ষমতা

সিমেন্ট খাতের বর্তমান অবস্থাকে শুধু ডিভিডেন্ড কমার হিসাব দিয়ে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদনের অতিরিক্ত সক্ষমতা এবং তার বিপরীতে দুর্বল চাহিদা এখনো খাতটির ওপর চাপ তৈরি করছে।

তবে একই চাপ সব কোম্পানিকে একইভাবে প্রভাবিত করছে না। কারও কাঁচামালের উৎস সুবিধাজনক, কারও উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি; কোথাও ঋণের চাপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, আবার কোথাও মুনাফার ধারাবাহিকতা ও ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতায় পার্থক্য রয়েছে।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে কোন কোম্পানি কতটা বিনিয়োগ করবে, সেটিও তাদের অবস্থান আলাদা করে দিচ্ছে। ফলে সিমেন্ট খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতির পাশাপাশি প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির কাঁচামাল, উৎপাদন ব্যয়, ঋণ, মুনাফা, ডিভিডেন্ড এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনাও আলাদাভাবে বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: