৪ বছর পর খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, জানুন পুরো প্রক্রিয়া
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর দরজা আবার খুলতে শুরু করেছে, তবে এবারও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে নয়। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দেশটির সুপরিচিত সুপারমার্কেট চেইন এনএসকে ট্রেড সিটির জন্য ২৮ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সত্যায়ন করেছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। এর মধ্য দিয়ে চার বছর ধরে কার্যত বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় নতুন করে গতি এসেছে।
হাইকমিশনের পাশাপাশি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড (আরএল-২০৬৮) বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে ২৮ কর্মীর চাহিদাপত্র সত্যায়িত হলেও কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া, খরচ কিংবা পরবর্তী ধাপ নিয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে বাজার খুলে যাওয়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গে চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এবার মূল নজর কর্মী পাঠানোর পদ্ধতিতে
মালয়েশিয়ার বাজারে সুযোগ তৈরি হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নির্বাচন ও পাঠানোর পদ্ধতি। অতীতে কর্মী নিয়োগকে ঘিরে অনিয়ম, অতিরিক্ত খরচ এবং বিভিন্ন অভিযোগের কারণে একাধিকবার সংকট তৈরি হয়েছে। তাই এবার শুরু থেকেই প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ থাকে, সেটিই নজরে রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে মালয়েশিয়া সরকারের প্রকাশ করা নিয়োগপ্রক্রিয়ার তথ্য কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রায় এক মাস আগে বাংলাদেশসহ বিদেশি কর্মী নিয়োগের ধাপ ও প্রক্রিয়া প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়া সরকার। কিন্তু বাংলাদেশে সেই তথ্য যথেষ্টভাবে প্রচার না হওয়ায় অনেক চাকরিপ্রত্যাশী এখনো জানেন না, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আবেদন করতে হবে।
এই তথ্য ঘাটতির মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী চাকরির আশ্বাস এবং দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আগ্রহীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
সরকারি সতর্কবার্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ
সরকার ইতোমধ্যে চাকরিপ্রত্যাশীদের সতর্ক করেছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পাসপোর্ট জমা না দেওয়া, কোনো অর্থ পরিশোধ না করা এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কারণ, মালয়েশিয়ার বাজারে কর্মী পাঠানোর পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। ২৮ কর্মীর চাহিদাপত্র সত্যায়িত হওয়া প্রক্রিয়া শুরুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এর পর কর্মী নির্বাচন, অনুমোদন, ব্যয় ও পাঠানোর অন্যান্য ধাপ কীভাবে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি ঘোষণা এখনো নেই।
ফলে সরকারি নির্দেশনার পরিবর্তে যদি অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা চাকরিপ্রত্যাশীদের সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীদের সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
খরচ নিয়ে আবারও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যয়ের বিষয়টিও এবার বড় আলোচনার জায়গা তৈরি করেছে। অতীতে কর্মীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ ছিল। এবার বাজারে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার আলোচনা শোনা যাচ্ছে।
তবে কর্মী পাঠানোর পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য ব্যয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে সরকার নির্ধারিত ব্যয় এবং একজন কর্মীর কাছ থেকে বাস্তবে নেওয়া অর্থের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা।
তাদের আশঙ্কা, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগের মতোই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
১০ হাজার কর্মী বিনা খরচে পাঠানোর ঘোষণাও আলোচনায়
এর মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেটির বাস্তবায়নের দিকেও তাকিয়ে আছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা।
তাদের বক্তব্য, সরকারি ব্যবস্থায় কম খরচে এবং স্বচ্ছভাবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগও তৈরি হবে।
আইন অনুযায়ী কর্মী বাছাইয়ের পথ কী
কর্মী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সরকারি একটি কাঠামো রয়েছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনের ১৯ ধারায় প্রথমে বিএমইটির ডাটাবেজ থেকে উপযুক্ত কর্মী বাছাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
সেই ডাটাবেজে প্রয়োজনীয় কর্মী না পাওয়া গেলে সরকারের অনুমতি নিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কর্মী নির্বাচনের বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার এ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করার লক্ষ্যে ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম (ওইপি) চালু করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ডাটাবেজের মাধ্যমে কর্মী নির্বাচন করা গেলে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।
তবে অতীতের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, আগেও আইনে নির্ধারিত পদ্ধতি পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি নিয়োগদাতার চাহিদাপত্র হাতে পাওয়ার আগেই কর্মী সংগ্রহ ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল।
এ কারণেই এবার শুরু থেকেই আইন ও সরকারি ডাটাবেজভিত্তিক কর্মী নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন বন্ধ হয়েছিল মালয়েশিয়ার বাজার
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার দরজা বন্ধ হয় ২০২৪ সালের ৩১ মে। সে সময় কর্মী নিয়োগের অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় এবং বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসার পর নতুন কর্মী প্রবেশ বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া সরকার।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বাজারটি পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা চলে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিয়ে বিশেষ বৈঠকে বন্ধ ও সংকুচিত শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর ওপর গুরুত্ব দেন।
এর পর তার প্রথম বিদেশ সফর হয় মালয়েশিয়ায়। সফরের সময় বাংলাদেশ থেকে আবার কর্মী নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ওই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পথ আবার উন্মুক্ত হয়েছে। তবে এখনো দুই দেশের কোনো পক্ষই শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হলেও এবার মূল পরীক্ষা হবে পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হয়, তা নিয়ে। অতীতে অনিয়মের অভিযোগের কারণে শ্রমবাজার একাধিকবার বন্ধ হয়েছে এবং পরে কূটনৈতিক উদ্যোগে আবার চালু হয়েছে।
এবারও যদি পুরোনো অনিয়ম ফিরে আসে, তাহলে নতুন করে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কর্মী নির্বাচন থেকে শুরু করে অর্থ লেনদেন এবং বিদেশে পাঠানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চার বছর পর ২৮ বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদাপত্র সত্যায়নের মধ্য দিয়ে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, সেটি কতটা নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগোয়—তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের পরবর্তী পথ। চাকরিপ্রত্যাশীদের দালালচক্রের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অতীতের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
FAQ
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো কি শুরু হয়েছে?
২৮ সেপ্টেম্বর এনএসকে ট্রেড সিটির চাহিদার ভিত্তিতে ২৮ বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদাপত্র বাংলাদেশ হাইকমিশন সত্যায়ন করেছে। এর মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম আবার শুরু হওয়ার প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি।
মালয়েশিয়ায় যেতে এখনই কি টাকা দেওয়া যাবে?
সরকারের সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত টাকা পরিশোধ, পাসপোর্ট জমা এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় যেতে কত টাকা লাগবে?
এখনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি ব্যয় ঘোষণা করা হয়নি। অতীতে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ ছিল। এবার ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার আলোচনা রয়েছে।
১০ হাজার কর্মী কি বিনা খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন?
বিশেষ ব্যবস্থায় বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে বিনা খরচে পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সেটিই এখন চাকরিপ্রত্যাশীদের আগ্রহের বিষয়।
কর্মী নির্বাচন কীভাবে হওয়ার কথা?
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনের ১৯ ধারার বিধান অনুযায়ী প্রথমে বিএমইটির ডাটাবেজ থেকে উপযুক্ত কর্মী নির্বাচন করার কথা। সেখানে উপযুক্ত কর্মী পাওয়া না গেলে সরকারের অনুমতি নিয়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কর্মী বাছাই করা যাবে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- বাংলাদেশ বনাম সিঙ্গাপুর ম্যাচ: সরাসরি দেখুন Live
- বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ম্যাচ কবে, কখন ও কোথায়, লাইভ দেখবেন যেভাবে
- কলা খাওয়ার সঠিক সময় কখন? সকাল নাকি রাত, জানুন
- ৩৫–৪০ হাজারে ২০২৬ সালের সেরা ৫ গেমিং ফোন
- চলছে বাংলাদেশ বনাম সিঙ্গাপুর ম্যাচ: সরাসরি দেখুন Live
- HONOR X9e Pro: ১১,০০০mAh ব্যাটারি ও ১০,০০০ নিটস ডিসপ্লে
- বাংলাদেশ বনাম সিঙ্গাপুর: শেষ হাসি হাসল কোন দল?
- বাংলাদেশ বনাম সিঙ্গাপুর ম্যাচ আজ, সময় ও লাইভ দেখার উপায়
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ১৯টি দেশের টাকার মান