ঢাকা, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন বিদেশি বিনিয়োগে ধস, নিট এফডিআই বাড়ল ১২%

অর্থনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১২ ১১:৫২:০৩
নতুন বিদেশি বিনিয়োগে ধস, নিট এফডিআই বাড়ল ১২%

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সামগ্রিক হিসাব বাড়লেও নতুন করে আসা মূলধনের প্রবাহে দুর্বলতা কাটেনি। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমেছে। অথচ একই সময়ে নতুন মূলধন, মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ মিলিয়ে নিট এফডিআই বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। এই দুই বিপরীত চিত্রের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশে আগে থেকেই ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা আবার বিনিয়োগ করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল-জুনে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত বছরের একই প্রান্তিকে এই অঙ্ক ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। এর আগে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকেও নতুন বিনিয়োগে বড় পতন দেখা গিয়েছিল। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নতুন এফডিআই কমেছিল ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, টানা দুই প্রান্তিক ধরে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ নিম্নমুখী।

নিট এফডিআই বাড়ার পেছনে মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ

নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ কমলেও নিট এফডিআইয়ের হিসাবে প্রবৃদ্ধি এসেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।

এই প্রবৃদ্ধির অর্থ এই নয় যে একই হারে নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারী বা নতুন প্রকল্প বাংলাদেশে এসেছে। নিট এফডিআইয়ের হিসাবে নতুন মূলধনের পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ এবং আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের প্রবাহও যুক্ত হয়। এপ্রিল-জুন সময়ে আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় নিট এফডিআই আবার ২২ শতাংশ কমেছে। ফলে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও কাছাকাছি দুই প্রান্তিকের তুলনায় বিনিয়োগের গতি দুর্বল হয়েছে।

বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের হিসাবেই সবচেয়ে বড় অঙ্ক দেখা গেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট বিনিয়োগ ছিল ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলারের চেয়ে বেশি।

আলোচ্য সময়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা থেকে ৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার বাংলাদেশে পুনর্বিনিয়োগের জন্য এসেছে। বিপরীতে, একই খাতে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৪০ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। দুই প্রবাহের পার্থক্য থেকে নিট পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ৯ লাখ ডলার।

বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানো বিদেশি প্রতিষ্ঠান মুনাফার যে অংশ দেশে রেখে আবার ব্যবসায় লাগায়, সেটিই মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ। এই অর্থ মোট এফডিআই বাড়ালেও নতুন বিনিয়োগকারী বা নতুন প্রকল্পের আগমনের সমান অর্থ বহন করে না।

আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণে এক বছরে কমেছে ৮৫.১৭ শতাংশ

বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রেও প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের নিট পরিমাণ ছিল ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। এর আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এই অঙ্ক ছিল ২ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এক প্রান্তিকের ব্যবধানে কমেছে ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ।

গত বছরের একই প্রান্তিকে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ থেকে নিট ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ডলার এসেছিল। সে হিসাবে চলতি বছরের এপ্রিল-জুনে এই প্রবাহ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

আলোচ্য তিন মাসে ঋণ বাবদ বাংলাদেশে এসেছে ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। একই সময়ে দেশ থেকে বাইরে গেছে ৩২ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, দুই দিকের লেনদেনের অঙ্ক বড় হলেও নিট হিসাবে বিনিয়োগে যোগ হয়েছে তুলনামূলকভাবে সামান্য অর্থ।

ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে

নতুন বিদেশি মূলধনের প্রবাহ কেন দুর্বল, তা বুঝতে দেশের আর্থিক খাতের পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে যায় ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম হার যেখানে ১০ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মূলধন ঘাটতি ও আর্থিক খাতের অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, এসব দুর্বলতা দূর করা না গেলে নতুন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হতে পারে।

ঋণমানের পূর্বাভাসেও পুরোপুরি মিল নেই

ব্যাংক খাতের সংকটের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণমান নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস স্থিতিশীল করেছে। অন্যদিকে, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ ঋণমান ‘বি+’ অপরিবর্তিত রাখলেও পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে।

কোনো দেশের ঋণমান সেই দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তাই ঋণমানের পূর্বাভাস, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, নিট এফডিআইয়ের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে আগে থেকে দেশে থাকা বিদেশি কোম্পানির মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ থেকে। একই সময়ে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ টানা দুই প্রান্তিকে কমেছে এবং আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের প্রবাহেও বড় পতন দেখা গেছে। এই ব্যবধান বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি মূল্যায়নে মোট এফডিআইয়ের পাশাপাশি নতুন মূলধনের প্রবাহ আলাদাভাবে দেখার গুরুত্ব তুলে ধরে।

FAQ

১. ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কত ছিল?

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার।

২. নতুন এফডিআই কমলেও নিট এফডিআই কেন বেড়েছে?

বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ নিট এফডিআই বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। নিট এফডিআইয়ের হিসাবে নতুন মূলধনের পাশাপাশি পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণও অন্তর্ভুক্ত হয়।

৩. নিট এফডিআই কত বেড়েছে?

২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট এফডিআই ছিল ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ১২ শতাংশ বেশি।

৪. আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের নিট প্রবাহ কত কমেছে?

২০২৫ সালের একই প্রান্তিকের তুলনায় ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুনে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের নিট প্রবাহ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

৫. বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণমান সম্পর্কে সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন কী?

গত সেপ্টেম্বরে মুডিস ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখে পূর্বাভাস স্থিতিশীল করেছে। এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ ঋণমান ‘বি+’ অপরিবর্তিত রাখলেও পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ