ঢাকা, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ হাসিনার ফাঁসি কার্যকরের সক্ষমতা সরকারের নেই: রুমিন ফারহানা

রাজনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১২ ২১:৪২:২১
শেখ হাসিনার ফাঁসি কার্যকরের সক্ষমতা সরকারের নেই: রুমিন ফারহানা

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মতো সক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই বলে মন্তব্য করেছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তাঁর মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং শেখ হাসিনার পরিবারের ঐতিহাসিক ভূমিকা বিবেচনায় নিলে তাঁর দেশে ফিরে আসা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে কী ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা-ও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

সম্প্রতি চ্যানেল ২৪-এর একটি সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা, তাঁর বিচার, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। সেখানে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর বিচার হতে পারে, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে—তবে বর্তমান সরকারের সেই সক্ষমতা রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।

কেন শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রয়োজন বলে মনে করেন রুমিন

সাক্ষাৎকারে রুমিন ফারহানা বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার পক্ষে তাঁর বিবেচনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং শেখ হাসিনার পরিবারের ওপর ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অভ্যুদয়, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দলটির ছয় দফা থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সংগ্রামের ডাক পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

রুমিন ফারহানা বলেন, ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর মতে, এই পারিবারিক ইতিহাস এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিবেচনায় নিয়েই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি দেখা উচিত।

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই সময়ে শেখ হাসিনা ফিরে না এলে তাঁর বাবা-মায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ভিন্ন হতে পারত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন দলটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পর দলটি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে শুধু তাঁর পরিবারের সদস্যদের নয়, দলটির নেতাকর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের ভবিষ্যতের কথাও বলেন রুমিন ফারহানা।

তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কারাগারে বন্দীর সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে কারাগারের বাথরুমেও মানুষকে থাকতে হচ্ছে। অন্য একটি মামলায় জামিন করানোর সূত্রে এমন তথ্য পেয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাটি রাজনৈতিক নয়, চুরির মামলা ছিল।

রুমিনের মতে, শেখ হাসিনা দেশে না ফিরলে তাঁর অনুসারী ও সমর্থকদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট এসব মানুষের পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

বিদেশে মৃত্যু নয়, দেশের মাটিতে বিচার চান—রুমিনের যুক্তি

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আরেকটি কারণ হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরিণতি ও ইতিহাসে অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যদি বিদেশের মাটিতে মারা যান, তাহলে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিস্ট শাসক হিসেবে তাঁর পরিচয়ই হয়তো শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পাবে। কোনো রাজনীতিক এভাবে নিজের রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি চাইবেন কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও দেশের ইতিহাসে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ভূমিকা মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে বলে মনে করেন রুমিন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দীর্ঘদিন সরকার পরিচালনা এবং বিরোধী দলে থাকার সময়কার ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিক মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসও আলোচনায় আসবে।

খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টেনে রাজনৈতিক বিচারের ব্যাখ্যা

শেখ হাসিনার বিচার করার সক্ষমতা সরকারের রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রুমিন ফারহানা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টানেন।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট রয়েছে। এরপর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এতিমের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি।

রুমিনের মতে, রাজনীতিবিদদের বিষয়ে মানুষের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্যে, কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও সমর্থকেরা অনেক সময় নিজেদের মতো করে তার ব্যাখ্যা দাঁড় করান। শেখ হাসিনাকে নিয়েও এমন পরিস্থিতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

একই সঙ্গে রুমিন স্পষ্ট করেন, তিনি কখনো শেখ হাসিনার দলে ছিলেন না এবং বর্তমানে তাঁর দলেও নেই। তাই শেখ হাসিনাকে সমর্থন বা তাঁর পক্ষে সাফাই দেওয়ার কোনো কারণ তাঁর নেই বলে জানান। নিজের পর্যবেক্ষণ থেকেই রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরছেন বলে দাবি করেন তিনি।

বিরোধী দলে আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়ে কী বললেন রুমিন

সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে দেশের রাজনীতিতে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সে বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা।

তিনি জানান, নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু বুদ্ধিজীবীর একটি সংগঠন ব্রেইনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময়ও আওয়ামী লীগের বিরোধী রাজনীতির ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছিলেন। তখনো মনোনয়নপ্রক্রিয়া শুরু হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রুমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের বিরোধী দলের ভূমিকা কেমন ছিল, তা বিএনপি উপলব্ধি করেছিল। পরবর্তী সময়েও আওয়ামী লীগের আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের জন্মের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার কারণে দলটি সরকারে থাকার তুলনায় বিরোধী দলে থেকে বেশি কার্যকর রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে পারে—এমন ধারণাও তুলে ধরেন তিনি।

সবশেষে রুমিন ফারহানা প্রশ্ন তোলেন, যে রাজনৈতিক নেত্রীকে একসময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শরীরে স্প্লিন্টার থাকা অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখার প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়, সেই নেত্রীকে দলটি শেষ পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলতে দেবে কি না। তাঁর বক্তব্যে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বিরোধী দলে থাকার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বর্তমান সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

১. শেখ হাসিনার বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে রুমিন ফারহানা কী বলেছেন?

রুমিন ফারহানা বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর বিচার বা মৃত্যুদণ্ড হতে পারে বলে ধরে নিলেও বর্তমান সরকারের তা কার্যকর করার সক্ষমতা রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।

২. শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রয়োজন বলে কেন মনে করেন রুমিন?

তাঁর মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাস, শেখ হাসিনার পরিবারের ওপর ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড এবং তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

৩. শেখ হাসিনা দেশে না ফিরলে কী হতে পারে বলে মনে করেন রুমিন?

রুমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশে তাঁর মৃত্যু হলে কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে তাঁর পরিচয়ই প্রাধান্য পেতে পারে। দেশে ফিরলে তাঁর বিচার এবং রাজনৈতিক জীবনের ঐতিহাসিক মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে।

৪. রুমিন ফারহানা কি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দলের সদস্য?

না। সাক্ষাৎকারে রুমিন ফারহানা স্পষ্ট করেছেন, তিনি কখনো শেখ হাসিনার দলে ছিলেন না এবং বর্তমানে তাঁর দলেও নেই।

৫. আওয়ামী লীগের বিরোধী রাজনীতি নিয়ে রুমিন ফারহানার বক্তব্য কী?

তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে এবং বিরোধী দলে থাকলে দলটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সময়ের কথাও উল্লেখ করেছেন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ