ঢাকা, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

জমির খতিয়ান অনলাইনে বের করার নিয়ম, ঘরে বসেই দেখুন

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৪ ১১:৩২:৩৪
জমির খতিয়ান অনলাইনে বের করার নিয়ম, ঘরে বসেই দেখুন

নিজের জমির খতিয়ান দেখতে বা জমির রেকর্ডে কার নাম রয়েছে, তা জানতে এখন আর শুরুতেই ভূমি অফিসে ছুটতে হয় না। বাংলাদেশ সরকারের ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবা (DLRMS) পোর্টালে গিয়ে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, খতিয়ানের ধরন ও মৌজার তথ্য দিয়ে অনলাইনে খতিয়ান খোঁজা যায়। খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জমির দাগ নম্বর কিংবা মালিকের নাম দিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে।

তবে অনলাইনে খতিয়ানের তথ্য দেখা এবং সরকারি কাজে ব্যবহারের উপযোগী সত্যায়িত কপি সংগ্রহ করা এক বিষয় নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সেবা বেছে নেওয়া, জমির তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং সরকারি ফি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। অনলাইনে জমির খতিয়ান বের করার নিয়ম, প্রয়োজনীয় তথ্য, খরচ ও সতর্কতা জেনে নিন ধাপে ধাপে।

অনলাইনে জমির খতিয়ান কোথায় পাওয়া যাবে?

জমির খতিয়ান অনুসন্ধানের জন্য প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবা পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে।

- সরকারি ওয়েবসাইট: [dlrms.land.gov.bd](https://dlrms.land.gov.bd/)

- বিকল্প সরকারি প্রবেশপথ: [ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট](https://land.gov.bd/)

সরকারি পোর্টালে সার্ভে খতিয়ান, নামজারি খতিয়ান এবং মৌজা ম্যাপ-সংক্রান্ত সেবা রয়েছে। তবে সব এলাকার সব ধরনের রেকর্ড অনলাইনে পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

জমির খতিয়ান অনলাইনে বের করার নিয়ম

ধাপ ১: সরকারি পোর্টালে প্রবেশ করুন

মোবাইল বা কম্পিউটারের ব্রাউজার থেকে [dlrms.land.gov.bd](https://dlrms.land.gov.bd/) ওয়েবসাইট খুলুন। সেখানে সার্ভে খতিয়ান বা প্রাসঙ্গিক খতিয়ান অনুসন্ধানের বিভাগ নির্বাচন করুন।

ধাপ ২: জমির অবস্থান নির্বাচন করুন

জমিটি যে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা বা থানার অন্তর্গত, সেগুলো নির্বাচন করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট মৌজা বেছে নিন। মৌজার নাম বা জে এল নম্বর জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়।

ধাপ ৩: খতিয়ানের ধরন ও অনুসন্ধানের তথ্য দিন

জমির রেকর্ডটি সিএস (CS), এসএ (SA), আরএস (RS), বিএস/বিআরএস (BS/BRS) বা সংশ্লিষ্ট যে জরিপের, সেই ধরন নির্বাচন করুন। এরপর খতিয়ান নম্বর দিয়ে খুঁজুন। নম্বর জানা না থাকলে পোর্টালের ‘অধিকতর অনুসন্ধান’ অপশন থেকে দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করুন।

ধাপ ৪: পাওয়া রেকর্ড যাচাই করুন

অনুসন্ধানের ফলাফলে মালিকের নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণসহ যে তথ্য দেখানো হয়, তা আপনার কাছে থাকা দলিল বা অন্যান্য রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন, তাই শুধু নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না।

ধাপ ৫: প্রয়োজন হলে কপির জন্য আবেদন করুন

খতিয়ানের তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইন কপি বা সার্টিফাইড কপির আবেদন করুন। পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনকারীর তথ্য পূরণ, প্রযোজ্য ফি পরিশোধ এবং কপি গ্রহণের পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

আরও পড়ুন:

ওয়ারিশি জমির নামজারি: নিয়ম, কাগজপত্র ও খরচ

অনলাইনে জমির নামজারি করবেন যেভাবে, খরচ ১১৭০ টাকা

আপনার নামে কত জমি আছে? মোবাইলেই জানুন অনলাইনে

সরকারি পোর্টালে খতিয়ান অনুসন্ধান, কার্টে যোগ, আবেদন ফরম পূরণ, ফি পরিশোধ এবং কপি প্রস্তুতের পৃথক ধাপ দেখানো রয়েছে।

খতিয়ান বের করতে কী কী তথ্য লাগবে?

অনলাইনে জমির খতিয়ান খুঁজতে সব তথ্য একসঙ্গে জানা বাধ্যতামূলক নয়। তবে জমির অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়।

প্রয়োজনীয় তথ্যকেন প্রয়োজন
বিভাগ ও জেলা জমির অবস্থান নির্দিষ্ট করতে
উপজেলা বা থানা সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড খুঁজতে
মৌজার নাম বা জে এল নম্বর সঠিক মৌজা শনাক্ত করতে
খতিয়ানের ধরন কোন জরিপের রেকর্ড প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে
খতিয়ান নম্বর সরাসরি খতিয়ান খুঁজতে
দাগ নম্বর বা মালিকের নাম খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলে অনুসন্ধানে সহায়তা করতে

মনে রাখবেন, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও মৌজা একে অপরের বিকল্প নয়। একই মৌজায় অনেক দাগ ও খতিয়ান থাকতে পারে।

অনলাইন খতিয়ান দেখতে কত টাকা লাগে?

খতিয়ান অনুসন্ধান এবং খতিয়ানের কপি সংগ্রহের খরচ আলাদা বিষয়। সরকারি পোর্টালে রেকর্ড খোঁজার সুযোগ থাকলেও কপি পাওয়ার জন্য নির্ধারিত ফি প্রযোজ্য হতে পারে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ফি তালিকায় খতিয়ানের অনলাইন কপির জন্য ১০০ টাকা এবং ডাকযোগে সার্টিফাইড কপি নেওয়ার ক্ষেত্রে ১০০ টাকা আবেদন ফি ও ৪০ টাকা ডাক মাশুল উল্লেখ রয়েছে। তবে সরকারি পোর্টালে ফি পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার সময় প্রদর্শিত ফি ও পরিশোধের নির্দেশনাই যাচাই করে নিন।

অনলাইন কপি ও সার্টিফাইড খতিয়ানের পার্থক্য

জমির খতিয়ান সংগ্রহের আগে কোন ধরনের কপি প্রয়োজন, তা বুঝে নেওয়া জরুরি।

বিষয়অনলাইন কপিসার্টিফাইড কপি
মূল উদ্দেশ্য তথ্য দেখা ও নিজের প্রয়োজনে সংরক্ষণ আনুষ্ঠানিক প্রয়োজনে সত্যায়িত রেকর্ড সংগ্রহ
আবেদন পোর্টালে প্রযোজ্য সেবা নির্বাচন সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন
ফি প্রযোজ্য সরকারি ফি প্রযোজ্য সরকারি ফি ও সরবরাহ মাশুল
গ্রহণের পদ্ধতি পোর্টালে নির্ধারিত নিয়মে পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী

কোনো জমি কেনাবেচা, মামলা বা অন্য আনুষ্ঠানিক কাজে খতিয়ান ব্যবহার করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কোন ধরনের কপি গ্রহণযোগ্য, তা আগে নিশ্চিত করুন।

অনলাইনে খতিয়ান না পাওয়া গেলে কী করবেন?

সব তথ্য ঠিকভাবে দেওয়ার পরও খতিয়ান না পেলে কয়েকটি বিষয় যাচাই করতে পারেন।

- মৌজার নাম মিলিয়ে দেখুন: একই নামের বা কাছাকাছি নামের মৌজা হলে ভুল নির্বাচন হতে পারে।

- খতিয়ানের ধরন পরিবর্তন করে দেখুন: জমিটি কোন জরিপের অধীনে রেকর্ড করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করুন।

- দাগ নম্বর বা মালিকের নাম ব্যবহার করুন: খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলে অধিকতর অনুসন্ধান অপশন কাজে লাগতে পারে।

- পুরোনো ও নতুন রেকর্ড মিলিয়ে দেখুন: জমির রেকর্ডে পরিবর্তন বা জরিপের পার্থক্য থাকতে পারে।

- সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন: রেকর্ড অনলাইনে না থাকলে বা তথ্যের মধ্যে অমিল থাকলে প্রয়োজনীয় নথিসহ সহায়তা নিন।

চলমান জরিপের খসড়া খতিয়ান এবং চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত খতিয়ান এক নয়। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলমান জরিপের কিছু রেকর্ডে পরিবর্তন হতে পারে। তাই খসড়া রেকর্ডকে চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

খতিয়ান দেখলেই কি জমির মালিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়?

না। খতিয়ান জমির রেকর্ড-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি হলেও শুধু খতিয়ানে নাম থাকলেই সব পরিস্থিতিতে মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। জমির দলিল, উত্তরাধিকার, নামজারি, দখল, সংশ্লিষ্ট রেকর্ড এবং প্রযোজ্য আইনগত বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হতে পারে।

বিশেষ করে জমি কেনার আগে শুধু অনলাইনে খতিয়ান দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দলিলের ধারাবাহিকতা, দাগ ও জমির পরিমাণ যাচাই করুন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা আইনজীবীর সহায়তা নিন।

জমির খতিয়ান যাচাইয়ে জালিয়াতি এড়ানোর উপায়

সরকারি সেবার নামে নকল ওয়েবসাইট বা ভুয়া নথির মাধ্যমে প্রতারণার ঝুঁকি রয়েছে। নিরাপদ থাকতে—

- সরকারি `land.gov.bd` এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ভূমি রেকর্ড পোর্টাল ব্যবহার করুন।

- অচেনা ওয়েবসাইটে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যক্তিগত তথ্য বা অর্থ দেবেন না।

- কপিতে QR কোড থাকলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি ‘ভূমি (Bhumi)’ অ্যাপ দিয়ে যাচাই করুন।

- সরকারি ফি পরিশোধের আগে পোর্টালে প্রদর্শিত বিবরণ ও আবেদন নম্বর পরীক্ষা করুন।

- সন্দেহ হলে ভূমিসেবা সহায়তা নম্বর ১৬১২২-এ যোগাযোগ করুন।

জমির খতিয়ান অনলাইনে বের করার জন্য প্রথমে সরকারি ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে জমির অবস্থান, মৌজা ও খতিয়ানের ধরন নির্বাচন করতে হবে। এরপর খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে অনুসন্ধান করে পাওয়া তথ্য যাচাই করা যায়। আর আনুষ্ঠানিক কাজে প্রয়োজন হলে উপযুক্ত কপির জন্য আবেদন করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খতিয়ানে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে দলিল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি মিলিয়ে দেখা। এতে জমির রেকর্ড সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পাশাপাশি ভুল তথ্যের কারণে ভবিষ্যতে জটিলতায় পড়ার আশঙ্কাও কমে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. মোবাইল দিয়ে কি জমির খতিয়ান বের করা যায়?

হ্যাঁ। মোবাইলের ব্রাউজার থেকে সরকারি ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে খতিয়ান অনুসন্ধান করা যায়।

২. খতিয়ান নম্বর না জানলে কীভাবে খুঁজব?

জমির বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজা নির্বাচন করে পোর্টালের ‘অধিকতর অনুসন্ধান’ অপশনে দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে চেষ্টা করতে পারেন।

৩. অনলাইনে খতিয়ান বের করতে কি টাকা লাগে?

রেকর্ড অনুসন্ধান এবং কপি সংগ্রহের ফি এক নয়। কপি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকারি ফি প্রযোজ্য হতে পারে। আবেদন করার আগে পোর্টালে প্রদর্শিত ফি যাচাই করুন।

৪. অনলাইনে খতিয়ান পাওয়া না গেলে কী করব?

মৌজা, জরিপের ধরন ও অনুসন্ধানের তথ্য আবার যাচাই করুন। তবুও না পেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন।

৫. অনলাইন খতিয়ানের প্রিন্ট কি সরকারি কাজে ব্যবহার করা যায়?

কোন কাজে কোন ধরনের কপি গ্রহণযোগ্য, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। আনুষ্ঠানিক প্রয়োজনে সার্টিফাইড কপি লাগবে কি না, আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ