ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

অনলাইনে জমির দাগ নম্বর ও খতিয়ান বের করার নিয়ম

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৬ ১২:১৯:০৯
অনলাইনে জমির দাগ নম্বর ও খতিয়ান বের করার নিয়ম

নিজের জমির দাগ নম্বর জানা না থাকলে জমির দলিল, খতিয়ান কিংবা সরকারি ভূমি রেকর্ডের সাহায্যে তা খুঁজে বের করা যায়। বাংলাদেশে অনলাইনে খতিয়ান অনুসন্ধান ও মৌজা ম্যাপ দেখার সুবিধা থাকায় প্রয়োজনীয় তথ্য জানা থাকলে ঘরে বসেই জমির দাগ নম্বর শনাক্ত করার চেষ্টা করা সম্ভব। তবে অনলাইনে তথ্য না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সহায়তা নিতে হতে পারে।

জমি কেনাবেচা, নামজারি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি শনাক্ত করা কিংবা জমির সীমানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দাগ নম্বর গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু দাগ নম্বর জানলেই জমির মালিকানা নিশ্চিত হয় না। সঠিক তথ্য পেতে জমির দলিল, খতিয়ান, মৌজা, জমির পরিমাণ এবং জরিপের রেকর্ড মিলিয়ে দেখা জরুরি।

দাগ নম্বর কী?

দাগ নম্বর হলো ভূমি জরিপের সময় একটি মৌজার মধ্যে নির্দিষ্ট জমির খণ্ড শনাক্ত করার জন্য দেওয়া নম্বর। জমির অবস্থান ও পরিচয় খুঁজে পেতে সরকারি ভূমি রেকর্ড এবং মৌজা ম্যাপে এই নম্বর ব্যবহার করা হয়।

একটি খতিয়ানে একাধিক দাগের জমি থাকতে পারে। আবার একটি দাগের জমিতে একাধিক ব্যক্তির মালিকানা বা হিস্যা থাকতে পারে। এ কারণে নিজের জমি শনাক্ত করতে শুধু দাগ নম্বর নয়, সংশ্লিষ্ট খতিয়ান ও দলিলের তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।

অনলাইনে নিজের জমির দাগ নম্বর বের করার উপায়

সরকারি ভূমি রেকর্ডের ওয়েবসাইট ব্যবহার করে জমির দাগ নম্বর খুঁজে দেখার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

১. সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

প্রথমে [ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ব্যবস্থাপনা ওয়েবসাইট](https://dlrms.land.gov.bd/) অথবা [ভূমি মন্ত্রণালয়ের পোর্টাল](https://land.gov.bd/) খুলুন।

২. জমির অবস্থানের তথ্য দিন

জমিটি যে জেলা, উপজেলা ও মৌজায় অবস্থিত, সেই অনুযায়ী তথ্য নির্বাচন করুন। মৌজার নাম সঠিকভাবে জানা থাকলে নির্দিষ্ট জমির রেকর্ড খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।

৩. জরিপের ধরন নির্বাচন করুন

জমির রেকর্ড সিএস (CS), এসএ (SA), আরএস (RS), বিএস বা অন্য কোনো জরিপের অধীনে থাকতে পারে। আপনার দলিল বা পুরোনো খতিয়ানের তথ্য অনুযায়ী প্রযোজ্য জরিপ নির্বাচন করুন।

৪. খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করুন

খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সেটি দিয়ে অনুসন্ধান করুন। নম্বরটি জানা না থাকলে সংশ্লিষ্ট সেবায় মালিকের নাম বা দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধানের সুবিধা থাকলে তা ব্যবহার করুন। ফলাফলে পাওয়া মৌজা, মালিকের নাম ও জমির পরিমাণ নিজের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।

৫. মৌজা ম্যাপে জমির অবস্থান যাচাই করুন

দাগ নম্বর পাওয়ার পর জমিটির অবস্থান ম্যাপে দেখতে [সরকারি মৌজা ম্যাপ অনুসন্ধান সেবা](https://settlement.gov.bd/map/mapsearch) ব্যবহার করতে পারেন। সেখানে উপলভ্য তথ্য অনুযায়ী জরিপ, জেলা, উপজেলা, মৌজা, শিট ও দাগ নম্বর নির্বাচন করে অনুসন্ধান করতে হয়।

মনে রাখবেন, সব এলাকার সব জরিপের রেকর্ড অনলাইনে পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ওয়েবসাইটের সেবা ও তথ্যের প্রাপ্যতা অনুযায়ী অনুসন্ধানের ধাপেও পার্থক্য থাকতে পারে।

দলিল থেকে কীভাবে দাগ নম্বর বের করবেন?

জমির দলিলের তফসিল অংশে সাধারণত জমির পরিচয়সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ থাকে। সেখানে মৌজার নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও সীমানার বিবরণ পাওয়া যেতে পারে।

দলিল থেকে দাগ নম্বর বের করতে প্রথমে তফসিল অংশটি দেখুন। এরপর সেখানে উল্লেখ করা তথ্যগুলো আলাদা করে মিলিয়ে নিন।

- মৌজার নাম: জমিটি কোন মৌজায় অবস্থিত।

- খতিয়ান নম্বর: দলিলে উল্লেখ থাকলে সংশ্লিষ্ট নম্বর।

- দাগ নম্বর: জমির খণ্ড শনাক্ত করার নম্বর।

- জমির পরিমাণ: দলিলে উল্লেখ করা জমির পরিমাণ।

- সীমানা: জমির চারপাশের অবস্থান ও বিবরণ।

পুরোনো দলিলে উল্লেখ করা দাগ নম্বর পরবর্তী জরিপে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পুরোনো নম্বরের সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের নম্বর মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলে কী করবেন?

খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলেও জমির দাগ নম্বর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা যায়। এ ক্ষেত্রে জমির মালিকের নাম, মৌজার নাম, জমির অবস্থান এবং দলিলে থাকা অন্যান্য তথ্য কাজে লাগতে পারে।

প্রথমে সরকারি ভূমি রেকর্ডের ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট মৌজার তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান করুন। সেখানে মালিকের নাম বা দাগ নম্বর দিয়ে খোঁজার সুবিধা থাকলে সেটি ব্যবহার করুন।

আরও পড়ুন:CS, SA, RS ও BS খতিয়ানের পার্থক্য জানুন সহজ ভাষায়

অনলাইনে তথ্য না পেলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন। আপনার কাছে পুরোনো দলিল, পর্চা, খাজনার রসিদ বা অন্য কোনো জমিসংক্রান্ত কাগজপত্র থাকলে সেগুলো সঙ্গে নিন।

তবে শুধু মালিকের নামের ওপর ভিত্তি করে কোনো রেকর্ডকে নিজের জমির বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। জমির অবস্থান, পরিমাণ, দাগ নম্বর ও দলিলের তথ্য মিলিয়ে নিশ্চিত হতে হবে।

মোবাইল দিয়ে কি জমির দাগ নম্বর বের করা যায়?

হ্যাঁ, স্মার্টফোনের ব্রাউজার ব্যবহার করেই সরকারি ভূমি রেকর্ড ও মৌজা ম্যাপ অনুসন্ধান করা যায়। এ জন্য আলাদা কম্পিউটার থাকা বাধ্যতামূলক নয়।

মোবাইল থেকে [সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ব্যবস্থাপনা পোর্টাল](https://settlement.gov.bd/) খুলে প্রয়োজনীয় সেবা নির্বাচন করুন। এরপর জমির অবস্থান ও জরিপের তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান করুন।

তবে অনলাইনে দাগ নম্বর দেখা, খতিয়ানের কপি সংগ্রহ এবং জমির প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ আলাদা বিষয়। জমির অবস্থান বা সীমানা নিয়ে সন্দেহ থাকলে শুধু অনলাইন ম্যাপের ওপর নির্ভর না করে সরকারি নথি ও সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন।

অনলাইনে দাগ নম্বর পাওয়া না গেলে করণীয়

কিছু জমির পুরোনো রেকর্ড অনলাইনে নাও থাকতে পারে। আবার ভুল মৌজা বা জরিপ নির্বাচন করলেও অনুসন্ধানে ফল পাওয়া যায় না।

এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে দলিলের তথ্য অনুযায়ী মৌজা ও জরিপের ধরন যাচাই করুন। এরপর পুরোনো খতিয়ান, পর্চা এবং জমির অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা করুন।

তাতেও তথ্য না পেলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের কাছ থেকেও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড বা মৌজা ম্যাপ সংগ্রহের নিয়ম জেনে নিতে পারেন।

দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও মৌজা নম্বরের পার্থক্য

জমির রেকর্ড খুঁজতে এই তিনটি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি।

- দাগ নম্বর: মৌজার মধ্যে নির্দিষ্ট জমির খণ্ড শনাক্ত করে।

- খতিয়ান নম্বর: ভূমি রেকর্ডে কোনো ব্যক্তি বা একাধিক ব্যক্তির নামে লিপিবদ্ধ জমির হিসাব শনাক্ত করে।

- মৌজা বা জেএল নম্বর: ভূমি জরিপ ও রাজস্ব ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মৌজাকে শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।

একটি খতিয়ানে একাধিক দাগের জমি থাকতে পারে। আবার একটি দাগের জমিতে একাধিক ব্যক্তির মালিকানা বা হিস্যা থাকতে পারে। তাই জমি শনাক্ত করার সময় এসব নম্বরের পার্থক্য জানা গুরুত্বপূর্ণ।

দাগ নম্বর জানলেই কি জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়?

না। দাগ নম্বর জমি শনাক্ত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একাই জমির মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

জমির মালিকানা যাচাই করতে দলিল, খতিয়ান, নামজারি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জমির পরিমাণ ও বাস্তব সীমানার সঙ্গে রেকর্ডের তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত।

জমি কেনার আগে কিংবা জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে শুধু অনলাইন অনুসন্ধানের ফলের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনীয় সরকারি নথি যাচাই করুন। প্রয়োজনে ভূমি বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবী বা উপযুক্ত জরিপ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

নিজের জমির দাগ নম্বর বের করার জন্য প্রথমে দলিল বা পুরোনো খতিয়ান থেকে মৌজার নাম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করুন। এরপর সরকারি ভূমি রেকর্ডের ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান করুন। অনলাইনে তথ্য না পেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সহায়তা নিন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দাগ নম্বরের সঙ্গে খতিয়ান, দলিল, জমির পরিমাণ ও প্রযোজ্য জরিপের তথ্য মিলিয়ে দেখা। এতে নিজের জমি সঠিকভাবে শনাক্ত করা সহজ হবে এবং জমিসংক্রান্ত ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকিও কমবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. নিজের জমির দাগ নম্বর কোথায় পাওয়া যায়?

জমির দলিলের তফসিল, খতিয়ান, পর্চা এবং সরকারি ভূমি রেকর্ডে দাগ নম্বর পাওয়া যেতে পারে। অনলাইনে না পেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা যায়।

২. খতিয়ান নম্বর ছাড়া কি দাগ নম্বর বের করা সম্ভব?

হ্যাঁ। সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবায় মালিকের নাম বা অন্যান্য তথ্য দিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ থাকলে খতিয়ান নম্বর ছাড়াও জমির রেকর্ড খোঁজা সম্ভব।

৩. মোবাইল দিয়ে কি জমির দাগ নম্বর দেখা যায়?

হ্যাঁ। মোবাইলের ব্রাউজার থেকে সরকারি ভূমি রেকর্ড ও মৌজা ম্যাপের ওয়েবসাইট ব্যবহার করে অনুসন্ধান করা যায়।

৪. পুরোনো দলিলের দাগ নম্বর কি পরিবর্তিত হতে পারে?

হ্যাঁ। পরবর্তী জরিপে জমির দাগ নম্বর আলাদা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন জরিপের রেকর্ড মিলিয়ে দেখতে হবে।

৫. দাগ নম্বর জানলেই কি জমির মালিকানা প্রমাণ হয়?

না। দাগ নম্বর জমি শনাক্ত করতে সাহায্য করে, কিন্তু একাই মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। দলিল, খতিয়ান, নামজারি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: