ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

পুরুষদের চুল পড়ার কারণ কী? জানুন চিকিৎসা ও প্রতিকার

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৬ ১৯:৫৩:৫৮
পুরুষদের চুল পড়ার কারণ কী? জানুন চিকিৎসা ও প্রতিকার

পুরুষদের চুল পড়ার পেছনে বংশগত প্রবণতা, হরমোনের প্রভাব, মানসিক চাপ, পুষ্টির ঘাটতি ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দায়ী হতে পারে। কারও কপালের দুই পাশ থেকে চুল পাতলা হতে থাকে, আবার কারও মাথার ওপরের অংশে টাক দেখা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে অসুস্থতা বা মানসিক চাপের কয়েক মাস পর হঠাৎ চুল পড়ার পরিমাণ বেড়ে যায়।

তবে চুল পড়া মানেই শরীরে কোনো রোগ হয়েছে, এমন নয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ চুল ঝরে পড়া স্বাভাবিক। সমস্যা তখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন, যখন চুলের ঘনত্ব কমতে থাকে, মাথার নির্দিষ্ট অংশ ফাঁকা হয়ে যায় অথবা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি চুল ঝরতে থাকে। চুল পড়ার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা গেলে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া সহজ হয়।

পুরুষদের চুল পড়ার সাধারণ কারণ

পুরুষদের চুল পড়া একটি পরিচিত সমস্যা। এটি অল্প বয়সেও শুরু হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে চুল পড়ার ধরন ও কারণ এক নয়। নিচে পুরুষদের চুল পড়ার সাতটি সাধারণ কারণ তুলে ধরা হলো।

1. বংশগত কারণে চুল পড়া

পুরুষদের চুল পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বংশগত প্রবণতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়া বলা হয়। পরিবারের মা বা বাবা—উভয় দিকের আত্মীয়দের কাছ থেকেই চুল পড়ার বংশগত প্রবণতা আসতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সাধারণত কপালের দুই পাশের চুলের রেখা ধীরে ধীরে পেছাতে থাকে। অনেকের মাথার ওপরের অংশেও চুল পাতলা হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে চুলের গোড়া ছোট হতে থাকে এবং নতুন চুল আগের তুলনায় সরু হয়ে গজায়।

বংশগত টাক পড়ার ক্ষেত্রে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন বা DHT নামের হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চুলের ফলিকল এই হরমোনের প্রতি সংবেদনশীল হলে চুলের বৃদ্ধি ধীরে ধীরে ব্যাহত হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই বয়সে বা একই গতিতে চুল পড়ে না।

2. হরমোনের প্রভাব

পুরুষদের চুল পড়ার সঙ্গে হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বংশগত টাক পড়ার ক্ষেত্রে DHT গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব ধরনের চুল পড়াকে হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ফল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার কারণেও চুল পাতলা হতে পারে। এ ধরনের সমস্যায় চুল পড়ার পাশাপাশি ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন বা অন্য শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

চুল পড়ার সঙ্গে এ ধরনের লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করে সমস্যার কারণ নির্ণয় করা যায়।

3. অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও অসুস্থতা

দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, গুরুতর জ্বর, সংক্রমণ, অস্ত্রোপচার কিংবা বড় ধরনের শারীরিক ধকলের পর চুল পড়া বেড়ে যেতে পারে। এ সমস্যার একটি পরিচিত ধরন হলো টেলোজেন এফ্লুভিয়াম।

এ ক্ষেত্রে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিচক্রে পরিবর্তন ঘটে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চুল ঝরে পড়ে। অনেক সময় মানসিক চাপ বা অসুস্থতার দুই থেকে চার মাস পর চুল পড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ ধরনের চুল পড়া অনেক ক্ষেত্রেই সাময়িক। মূল কারণ দূর হলে ধীরে ধীরে চুল পড়া কমতে পারে। তবে আগের মতো চুলের ঘনত্ব ফিরে পেতে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

4. পুষ্টির ঘাটতি ও অপর্যাপ্ত খাবার

চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় রাখতে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান দরকার। দীর্ঘদিন খাবারে প্রোটিনের ঘাটতি থাকলে কিংবা শরীরে আয়রন, জিঙ্ক বা নির্দিষ্ট ভিটামিনের অভাব তৈরি হলে চুল পড়তে পারে।

দ্রুত ওজন কমানোর জন্য অতিরিক্ত কম খাবার খাওয়া, দীর্ঘদিন একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা কিংবা অপুষ্টিতে ভোগার কারণেও চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিচক্র ব্যাহত হতে পারে।

তবে চুল পড়ার সব সমস্যার কারণ পুষ্টির ঘাটতি নয়। তাই নিজের ইচ্ছায় ভিটামিন বা মিনারেল সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করে ঘাটতি শনাক্ত করা যেতে পারে।

5. মাথার ত্বকে সংক্রমণ ও চর্মরোগ

মাথার ত্বকে ছত্রাকের সংক্রমণ, প্রদাহ কিংবা কিছু চর্মরোগের কারণেও চুল ঝরে যেতে পারে। সংক্রমণের ক্ষেত্রে মাথার নির্দিষ্ট অংশে চুল ভেঙে যাওয়া, গোলাকার ফাঁকা জায়গা তৈরি হওয়া, চুলকানি ও খোসা ওঠার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

কিছু প্রদাহজনিত রোগে চুলের ফলিকল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই মাথার ত্বকে ব্যথা, ঘা, পুঁজ, তীব্র চুলকানি বা লালচে ভাবের সঙ্গে চুল পড়লে অবহেলা করা উচিত নয়।

এ ধরনের সমস্যায় শুধু তেল বা শ্যাম্পু ব্যবহার করে সময় নষ্ট না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

6. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও চুল পড়তে পারে। নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ওষুধ ছাড়াও অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিচক্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

কোনো ওষুধ শুরু করার পর চুল পড়া বেড়ে গেলে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো প্রয়োজন। তবে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।

7. চুলের ভুল পরিচর্যা ও অতিরিক্ত টান

চুলে নিয়মিত অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগ, ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার এবং চুলের গোড়ায় দীর্ঘদিন টান পড়ে এমন স্টাইল চুলের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী টানের কারণে ট্র্যাকশন অ্যালোপেশিয়া নামের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া চুলের গোড়া থেকে না ঝরে মাঝখান থেকে ভেঙে গেলেও চুল পাতলা দেখাতে পারে। তাই চুলের যত্নে অতিরিক্ত টান, ঘন ঘন রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট ও অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগ এড়িয়ে চলা ভালো।

প্রতিদিন কত চুল পড়া স্বাভাবিক?

সাধারণভাবে একজন মানুষের প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে পড়তে পারে। এটি চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিচক্রের অংশ। পুরোনো চুল ঝরে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন চুলও গজায়।

তবে প্রতিদিন কতগুলো চুল পড়ছে, শুধু তা গুনে চুল পড়ার সমস্যা নির্ণয় করা যায় না। চুলের ঘনত্ব কমছে কি না, মাথার নির্দিষ্ট অংশে টাক তৈরি হচ্ছে কি না এবং কত দিন ধরে সমস্যা চলছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

চুল পড়া কমাতে কী করবেন?

চুল পড়া কমানোর প্রথম পদক্ষেপ হলো সমস্যার কারণ শনাক্ত করা। বংশগত টাক পড়া, পুষ্টির ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা ও মাথার ত্বকের সংক্রমণের চিকিৎসা এক নয়।

প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাবার রাখুন। দ্রুত ওজন কমানোর জন্য কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলুন। চুলে অতিরিক্ত তাপ ও রাসায়নিক প্রয়োগ কমান। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকেও নজর দিন।

বংশগত কারণে চুল পড়লে মিনোক্সিডিলের মতো ওষুধ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। পুরুষদের জন্য ফিনাস্টেরাইডও একটি চিকিৎসার বিকল্প। তবে এসব ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ব্যক্তিভেদে কার্যকারিতা বিবেচনা করে চিকিৎসা বেছে নিতে হয়।

চুল পড়া বন্ধ করতে শুধু তেল বা শ্যাম্পুর ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। এসব পণ্য চুলের পরিচর্যায় সাহায্য করতে পারে, কিন্তু বংশগত টাক পড়া বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার মূল কারণ দূর করতে পারে না।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

হঠাৎ প্রচুর চুল পড়তে শুরু করলে, মাথার নির্দিষ্ট স্থানে গোলাকার টাক তৈরি হলে কিংবা দাড়ি ও ভ্রুর চুলও ঝরে পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মাথার ত্বকে ব্যথা, ঘা, পুঁজ বা তীব্র প্রদাহ দেখা দিলেও দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ চুল ও মাথার ত্বক পরীক্ষা করে এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ইতিহাস জেনে সম্ভাব্য কারণ নির্ণয় করতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা বা অন্য পরীক্ষার পরামর্শও দিতে পারেন। সবার জন্য একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না।

সবশেষে বলা যায়, পুরুষদের চুল পড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাই অন্যের পরামর্শে ওষুধ, তেল বা সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার না করে সমস্যার ধরন বুঝে চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।

সাধারণ জিজ্ঞাসা ও উত্তর

প্রশ্ন: পুরুষদের চুল পড়ার প্রধান কারণ কী?

উত্তর: বংশগত প্রবণতা পুরুষদের চুল পড়া ও টাকের অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া হরমোনের প্রভাব, মানসিক চাপ, পুষ্টির ঘাটতি ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও দায়ী হতে পারে।

প্রশ্ন: প্রতিদিন চুল পড়া কি স্বাভাবিক?

উত্তর: সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে পড়া স্বাভাবিক। তবে চুলের ঘনত্ব কমতে থাকলে বা অস্বাভাবিকভাবে চুল পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রশ্ন: মানসিক চাপের কারণে কি চুল পড়ে?

উত্তর: হ্যাঁ। তীব্র মানসিক চাপ বা অসুস্থতার কয়েক মাস পর অতিরিক্ত চুল ঝরতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মূল কারণ দূর হলে চুল পড়া কমে আসে।

প্রশ্ন: চুল পড়া বন্ধ করতে কোন তেল ব্যবহার করবেন?

উত্তর: সব ধরনের চুল পড়া বন্ধ করতে পারে, এমন কোনো নির্দিষ্ট তেলের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। সঠিক চিকিৎসার জন্য চুল পড়ার মূল কারণ শনাক্ত করা জরুরি।

প্রশ্ন: পুরুষদের চুল পড়লে কি আবার নতুন চুল গজায়?

উত্তর: কারণের ওপর নির্ভর করে নতুন চুল গজাতে পারে। সাময়িক চুল পড়ার অনেক ক্ষেত্রে চুল আবার গজায়। বংশগত টাক পড়ার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট চিকিৎসায় উপকার পাওয়া সম্ভব, তবে সবার ফলাফল এক রকম হয় না।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: