ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করার ৭টি সহজ উপায়, জানুন করণীয়

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৬ ২১:০৩:২৯
শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করার ৭টি সহজ উপায়, জানুন করণীয়

শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ঠোঁট ফেটে যাওয়া, চামড়া ওঠা কিংবা ঠোঁটের কোণে ফাটল দেখা দেওয়া খুবই সাধারণ সমস্যা। ঠান্ডা বাতাস, বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়া, বারবার ঠোঁট জিভ দিয়ে ভেজানো এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া বাইরে থাকার কারণে ঠোঁটের আর্দ্রতা দ্রুত কমে যেতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে ঠোঁট এতটাই শুষ্ক হয়ে যায় যে হাসতে, কথা বলতে কিংবা খাবার খেতেও অস্বস্তি হয়।

শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করতে নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি বা সুগন্ধিবিহীন ঘন লিপ বাম ব্যবহার করা, ঠোঁট চাটা বন্ধ করা এবং ঠান্ডা বাতাস থেকে ঠোঁটকে সুরক্ষিত রাখা কার্যকর উপায়। তবে ঠোঁট বারবার ফাটলে, রক্ত পড়লে বা দীর্ঘদিনেও না সারলে এর পেছনে অন্য কারণ আছে কি না, সেটিও খেয়াল করা প্রয়োজন।

শীতে ঠোঁট ফাটে কেন?

ঠোঁটের ত্বক মুখের অন্যান্য অংশের ত্বকের তুলনায় পাতলা এবং এতে তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থি নেই। ফলে ঠোঁট আর্দ্রতা হারালে দ্রুত শুষ্ক হয়ে যায়। শীতকালে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

ঠোঁট ফাটার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে।

প্রথমত, ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাস ঠোঁটের আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালে লালা শুকিয়ে যাওয়ার সময় ঠোঁট আরও শুষ্ক হতে পারে। তৃতীয়ত, ঠোঁট কামড়ানো, চামড়া টেনে তোলা এবং সুগন্ধি বা জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন প্রসাধনী ব্যবহার করলেও সমস্যা বাড়তে পারে।

এ ছাড়া মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট কিছু ত্বকের সমস্যাও ঠোঁট ফাটার কারণ হতে পারে।

শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করার ৭টি কার্যকর উপায়

1. নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন

শীতে ঠোঁট ফাটা প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো নিয়মিত ঠোঁটে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগানো। এটি ঠোঁটের ওপর সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

দিনে কয়েকবার, বিশেষ করে খাওয়ার পর, মুখ ধোয়ার পর এবং ঘুমানোর আগে ঠোঁটে জেলি লাগাতে পারেন। ঠোঁট খুব শুষ্ক হলে আরও ঘন ঘন ব্যবহার করা যায়।

পণ্য বেছে নেওয়ার সময় সুগন্ধি ও স্বাদযুক্ত উপাদানবিহীন সাধারণ পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা ভালো। এতে সংবেদনশীল ঠোঁটে জ্বালাপোড়ার ঝুঁকি কম থাকে।

2. ঠোঁট বারবার জিভ দিয়ে ভেজাবেন না

ঠোঁট শুকিয়ে গেলে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নেন। কিন্তু এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও পরে ঠোঁট আরও শুষ্ক হতে পারে। লালার মধ্যে থাকা উপাদান এবং লালা শুকিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ঠোঁটের ওপরের সুরক্ষামূলক স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই ঠোঁট শুকিয়ে গেলে জিভ দিয়ে ভেজানোর পরিবর্তে লিপ বাম বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন। ঠোঁট কামড়ানো এবং শুকনো চামড়া টেনে তোলার অভ্যাসও পরিহার করা জরুরি।

3. ঠান্ডা বাতাস থেকে ঠোঁটকে সুরক্ষিত রাখুন

শীতের সকালে বা রাতে বাইরে বের হলে ঠোঁট সরাসরি ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে। এতে ঠোঁটের শুষ্কতা ও ফাটার সমস্যা বাড়তে পারে।

বাইরে যাওয়ার আগে ঠোঁটে সুরক্ষামূলক লিপ বাম লাগান। প্রয়োজন হলে স্কার্ফ দিয়ে মুখের নিচের অংশ ঢেকে রাখতে পারেন। এতে ঠোঁট সরাসরি ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শ থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাবে।

রোদেলা শীতের দিনেও ঠোঁটের যত্ন নেওয়া জরুরি। বাইরে দীর্ঘ সময় থাকলে সূর্যরশ্মি থেকেও ঠোঁট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সূর্যরশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয় এমন এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার লিপ বাম ব্যবহার করা ভালো।

4. পর্যাপ্ত পানি পান করুন

শরীরে পানির ঘাটতি হলে ঠোঁটসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে শুষ্কতা দেখা দিতে পারে। তাই শীতকালেও নিয়মিত পানি পান করা প্রয়োজন।

তবে ঠোঁট ফাটার সব সমস্যার কারণ পানিশূন্যতা নয়। শরীরে পানির ঘাটতি না থাকলেও ঠান্ডা বাতাস, কম আর্দ্রতা কিংবা ঠোঁটের সুরক্ষামূলক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ঠোঁট ফাটতে পারে।

তাই শুধু বেশি পানি পান করলেই ঠোঁট ফাটা বন্ধ হবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পর্যাপ্ত পানি পান করার পাশাপাশি ঠোঁটের ওপর সুরক্ষামূলক লিপ বাম ব্যবহার করুন।

5. ঠোঁটে জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন পণ্য এড়িয়ে চলুন

সব লিপ বাম ঠোঁটের জন্য সমান উপযোগী নয়। কিছু পণ্যে থাকা সুগন্ধি, স্বাদযুক্ত উপাদান বা নির্দিষ্ট রাসায়নিক ঠোঁটে জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ঠোঁট আগে থেকেই ফেটে থাকলে এসব উপাদান সমস্যা বাড়াতে পারে।

লিপ বাম ব্যবহারের পর ঠোঁটে জ্বালা, চুলকানি বা অস্বস্তি হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করুন। মেনথল, কর্পূর, ইউক্যালিপটাস, সুগন্ধি এবং পুদিনা বা দারুচিনির স্বাদযুক্ত পণ্য সংবেদনশীল ঠোঁটে সমস্যা বাড়াতে পারে।

ঠোঁটের শুষ্কতা কমাতে সুগন্ধিবিহীন ও জ্বালাপোড়া তৈরি করে না এমন পণ্য বেছে নেওয়াই ভালো।

6. ঘরের বাতাস অতিরিক্ত শুষ্ক হতে দেবেন না

শীতকালে ঘরের বাতাসের আর্দ্রতা কমে গেলে ঠোঁটের শুষ্কতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে শুষ্ক পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকা বা রাতে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস থাকলে ঠোঁট বেশি ফাটতে পারে।

ঘরের বাতাস খুব শুষ্ক হলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যন্ত্রটি নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে এতে জীবাণু বা ছত্রাক জমে না যায়।

রাতে ঘুমানোর আগে ঠোঁটে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগানোও উপকারী হতে পারে। এতে ঘুমের সময় ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য হয়।

7. ঠোঁটের শুকনো চামড়া টেনে তুলবেন না

ঠোঁট ফাটলে অনেকেরই শুকনো চামড়া হাত দিয়ে তুলে ফেলার অভ্যাস থাকে। কিন্তু এতে নতুন করে ক্ষত তৈরি হতে পারে, রক্ত পড়তে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

ঠোঁটের চামড়া ওঠা শুরু হলে সেটি টেনে না তুলে নিয়মিত লিপ বাম লাগান। ঠোঁট খুব শুষ্ক থাকলে স্ক্রাব দিয়ে ঘষাঘষি করাও এড়িয়ে চলুন। এতে ঠোঁটের ওপরের ত্বক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কয়েক দিন নিয়মিত যত্ন নেওয়ার পরও যদি ঠোঁটের অবস্থা খারাপ হতে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ঠোঁট ফাটা দ্রুত সারাতে কোন লিপ বাম ব্যবহার করবেন?

ঠোঁট ফাটা কমানোর জন্য এমন লিপ বাম বেছে নেওয়া ভালো, যা আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং ঠোঁটে জ্বালাপোড়া তৈরি করে না।

সাধারণ পেট্রোলিয়াম জেলি, সিরামাইড বা ডাইমেথিকোনযুক্ত সুগন্ধিবিহীন পণ্য উপকারী হতে পারে। তবে পণ্য ব্যবহারের পর জ্বালা বা অস্বস্তি হলে সেটি বন্ধ করা উচিত।

ঠোঁট ফাটা অবস্থায় লেবুর রস, টুথপেস্ট, লবণ বা চিনি দিয়ে ঘষা কিংবা অন্যান্য ঘরোয়া উপাদান সরাসরি লাগানো থেকে বিরত থাকুন। এসব উপাদান ঠোঁটের সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালাপোড়া বাড়াতে পারে।

ঠোঁট ফাটা কত দিনে ভালো হয়?

সাধারণ শুষ্কতার কারণে ঠোঁট ফাটলে নিয়মিত যত্ন নেওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যে উন্নতি দেখা যেতে পারে। তবে ঠোঁটের ফাটল গভীর হলে বা বারবার ঠোঁট চাটা, ঠান্ডা বাতাস কিংবা জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন পণ্যের সংস্পর্শ অব্যাহত থাকলে সারতে বেশি সময় লাগতে পারে।

ঠোঁটের সমস্যা দুই থেকে তিন সপ্তাহেও না সারলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা ঠোঁটের কোনো নির্দিষ্ট অংশে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

ঠোঁট অতিরিক্ত ফুলে গেলে, গভীর ফাটল থেকে রক্ত পড়লে, পুঁজ বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ঠোঁটের কোণে বারবার ফাটল তৈরি হলেও এর কারণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

দীর্ঘস্থায়ী ঠোঁটের প্রদাহ, অ্যালার্জি, কিছু পুষ্টির ঘাটতি কিংবা অন্য ত্বকের সমস্যার কারণেও ঠোঁট ফাটতে পারে। তাই সব ক্ষেত্রে শীতের শুষ্কতাকে একমাত্র কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

বিশেষ করে ঠোঁটের নিচের বা ওপরের অংশে দীর্ঘদিন ধরে খসখসে দাগ, ক্ষত বা পরিবর্তন থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করতে দামি প্রসাধনী ব্যবহার করা সব সময় প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি লাগানো, ঠোঁট চাটা বন্ধ করা, ঠান্ডা বাতাস থেকে সুরক্ষা নেওয়া এবং জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন পণ্য এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘদিন ঠোঁট না সারলে বা সমস্যা বারবার ফিরে এলে সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সাধারণ জিজ্ঞাসা ও উত্তর

প্রশ্ন: শীতে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করার সবচেয়ে সহজ উপায় কী?

উত্তর: নিয়মিত সুগন্ধিবিহীন পেট্রোলিয়াম জেলি বা উপযোগী লিপ বাম ব্যবহার করা, ঠোঁট চাটা বন্ধ করা এবং ঠান্ডা বাতাস থেকে ঠোঁটকে সুরক্ষিত রাখা সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে।

প্রশ্ন: ঠোঁট ফাটলে পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ। সাধারণ পেট্রোলিয়াম জেলি ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করে। দিনে কয়েকবার ও ঘুমানোর আগে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: পানি কম পান করলে কি ঠোঁট ফাটে?

উত্তর: শরীরে পানির ঘাটতি ঠোঁটের শুষ্কতায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঠান্ডা বাতাস, কম আর্দ্রতা ও ঠোঁট চাটার অভ্যাসও সাধারণ কারণ। তাই শুধু পানি পান বাড়ালেই সব ক্ষেত্রে সমস্যা দূর হয় না।

প্রশ্ন: ঠোঁট ফাটা ভালো হতে কত দিন লাগে?

উত্তর: সাধারণ শুষ্কতার কারণে ঠোঁট ফাটলে নিয়মিত যত্নে কয়েক দিনের মধ্যে উন্নতি হতে পারে। তবে দুই থেকে তিন সপ্তাহেও না সারলে বা সমস্যা বাড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রশ্ন: ঠোঁট ফাটলে কোন কাজগুলো করা উচিত নয়?

উত্তর: ঠোঁট চাটা, শুকনো চামড়া টেনে তোলা, স্ক্রাব দিয়ে ঘষা এবং জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন লিপ বাম ব্যবহার করা এড়িয়ে চলা উচিত।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: