ঢাকা, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

“পরনে লুঙ্গিটা আর নেই”: বিএনপিকে সতর্ক করলেন হাসনাত

রাজনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৮ ২১:১১:৪৮
“পরনে লুঙ্গিটা আর নেই”: বিএনপিকে সতর্ক করলেন হাসনাত

জুলাই সনদ এখন আর কার্যকরী নেই, এটি কেবলই একটি অলঙ্কার। এনসিপির নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর মূল্যায়ন এটাই। তাঁর অভিযোগ, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১৭ বার জাতির সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করেছে বিএনপি। রোববার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে এক মুক্ত আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। হাসনাত এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠকও।

“অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন” নিয়ে প্রশ্ন

হাসনাতের দাবি, বিএনপি প্রতিটি অধিবেশনে জুলাই সনদের কোনো না কোনো প্রতিশ্রুতি ভাঙছে। ভাঙার পরও দম্ভভরে ঘোষণা দিচ্ছে, সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বাস্তবায়ন করা হবে। এই ঘোষণার আড়ালে ইতিমধ্যে ১৭টি ধারায় জাতির সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি জানান, চাইলে প্রতিটি তিনি একটি একটি করে বলে যেতে পারবেন।

সংসদে বিএনপির সবার একই কথা বলাকে তিনি তুলনা করেন টিয়া পাখিকে শেখানো বুলির সঙ্গে। তাঁর দাবি, খোঁজ নিলে দেখা যাবে ছেলের ঠিকাদারি আর ভাইয়ের কাজ ছাড়া কিছুই পালিত হচ্ছে না।

বিচার বিভাগ ও আইনি প্রতিশ্রুতি

১৭টির মধ্যে যেসব অভিযোগ হাসনাত বিশদে তুলে ধরেন, তার একটি অংশ বিচার বিভাগ ও আইন সংক্রান্ত।

জুলাই সনদের ৬৪ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী সচিবালয়ে যারা ‘ভোটচুরি’ ও ‘গণহত্যার’ সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচারের ব্যবস্থা হয়নি। একে তিনি চার নম্বর ‘প্রতারণা’ বলেন।

৬১ নম্বর প্রস্তাবে বিচারকদের ‘রাজনৈতিক আনুগত্যকে’ অসদাচরণ গণ্য করার কথা থাকলেও বিএনপি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এটি ছয় নম্বর।

বিচারক ও কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের কথা থাকলেও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এটি সাত নম্বর।৫২ নম্বর প্রস্তাবে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, যাতে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হয়। হাসনাতের ভাষ্য, বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেটিও বিলুপ্ত করেছে। এটি আট নম্বর।২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের অধ্যাদেশও বাতিল হয়েছে। এটি পাঁচ নম্বর।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রশাসনে ঘুষের অভিযোগ

প্রথম প্রতারণার জন্য হাসনাত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে দায়ী করেন। তাঁর বক্তব্য, পাবলিক গ্রিভেন্স রিড্রেস সেল গঠনের কথা ছিল, কিন্তু সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশটিই বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রতারণা হিসেবে তিনি তোলেন পুলিশ বাহিনীর চাকরির নিরাপত্তার প্রসঙ্গ। হাসনাত বলেন, ক্যান্টনমেন্ট থানার এক ওসির বরাতে তিনি জেনেছেন, থানায় পোস্টিং নিতে এক-দুই কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়। তাঁর অভিযোগ, এই ঘুষ বাণিজ্য আগে চালাতেন সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে, এখন চালাচ্ছেন তাঁর ভাগিনারা। মন্ত্রী সচিবালয়ে বসে মন্ত্রিত্ব করেন, আর ভাগিনারা ঘুষ বাণিজ্য সামলান বলেও দাবি তাঁর। তাঁর প্রশ্ন, ওসি বা এসপি হতে ভাগিনাকে ঘুষ দিতে হবে, এমন বাংলাদেশ কি তাঁরা চেয়েছিলেন, কিংবা এমন জুলাই সনদ?

তিন নম্বর প্রতারণা হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগ নিয়ে। স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিভাগটিকে আলাদা করার কথা ছিল। হাসনাতের দাবি, নির্বাহী আদেশেই তা সম্ভব ছিল, তবু আট মাসেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা

তারেক রহমানকে নিয়েও মন্তব্য করেন হাসনাত। তাঁর ভাষায়, প্রধানমন্ত্রীকে একটি ফিটনেসবিহীন গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে, আর তিনি আপাতত ফটোশুট বা পিআর স্টান্ট করে খুশি আছেন। প্রধানমন্ত্রীকে নিজে হাসপাতালের বাথরুম বা ফুটপাত পরিষ্কারের তদারকি করতে হলে বুঝতে হবে মধ্যবর্তী প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে বলে মত দেন তিনি।

তুলনা টেনে হাসনাত বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ও সবকিছুর জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হতো, কারণ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল অকার্যকর। তাঁর অভিযোগ, এখনো একই পথে হাঁটা হচ্ছে। কিছু নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী ও ‘নতুন বিএনপি সেজে বসা ফায়দালোভীদের’ স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

বিএনপিকে সতর্ক করে তিনি একটি উপমাও দেন। তাঁর কথায়, দলটি ভাবছে এক পা ডাঙায় আর এক পা জলে রেখে পুকুর পার হবে। পার ঠিকই হবে, কিন্তু ওপারে গিয়ে দেখবে পরনের লুঙ্গিটা আর নেই।

সংবিধান সংশোধনের ‘বিপদ’

সংবিধান সংশোধনের বিপদ নিয়েও কথা বলেন হাসনাত। তাঁর বক্তব্য, আগেও সংবিধান সংশোধন হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে তা বাতিল হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের কথা তোলেন। বিএনপির এমপিরা গণপরিষদের শপথ নেননি, এ নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি।

আলোচনার আয়োজন

‘জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার ১ বছর: সালতামামি’ শীর্ষক এই মুক্ত আলোচনার আয়োজক এবি পার্টি। সভাপতিত্ব করেন দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। আরও অংশ নেন এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকসহ জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অন্য নেতারা।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. হাসনাত আব্দুল্লাহ বিএনপির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ করেছেন?

তাঁর অভিযোগ, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বিএনপি জুলাই সনদ নিয়ে জাতির সঙ্গে ১৭ বার ‘প্রতারণা’ করেছে।

২. জুলাই সনদ নিয়ে তাঁর সার্বিক মূল্যায়ন কী?

তাঁর মতে, জুলাই সনদ এখন আর কার্যকরী নেই, এটি একটি অলঙ্কারমাত্র।

৩. আলোচনাটি কোথায় ও কখন হয়েছে?

রোববার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে।

৪. আলোচনার আয়োজক কারা?

এবি পার্টি। বিষয় ছিল ‘জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার ১ বছর: সালতামামি’।

৫. আলোচনায় আর কারা অংশ নেন?

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু (সভাপতি), এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ, খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকসহ জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নেতারা।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: