আইসিসির নতুন নিয়মে বাংলাদেশের ওয়ানডে সংকট কেন বাড়ছে?
ওয়ানডে ক্রিকেটে ইনিংসের শেষ ১৬ ওভারে বলের বাড়তি সুইংকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার সুযোগ পাচ্ছেন পেসাররা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা কাজে লাগছে না। মোস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ে সুইংয়ের পরিমাণ বাড়লেও ডেথ ওভারে রান দেওয়ার হার কমেনি; বরং পরিসংখ্যানে বোলিং গড় ও ইকোনমি রেট বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। ব্যাটিংয়েও একই সংকট—প্রতিপক্ষের পুরোনো বলের রিভার্স সুইং সামলাতে না পেরে নিয়মিত চাপে পড়ছেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা।
এই দ্বিমুখী সমস্যার স্পষ্ট নমুনা দেখা গেছে গত শনিবার আবুধাবিতে ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে। ২৭১ রানের লক্ষ্য পেয়েও বাংলাদেশ অলআউট হয়েছে ১৭২ রানে। ৯৯ রানের ব্যবধানে হারের পর পেসার তাসকিন আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে দলের ব্যাটিং বিপর্যয়কে প্রধান দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে ম্যাচটির হিসাব শুধু ব্যাটিং ব্যর্থতায় শেষ হয় না। বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ তিনটি উইকেট নেওয়া তাসকিনও ইনিংসের শেষ দিকে রান আটকাতে পারেননি। একই সময়ে মোস্তাফিজুর রহমানের বোলিংয়েও দেখা গেছে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি। কেন বাড়তি সুইং পেয়েও বাংলাদেশের পেসাররা প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দেখতে হবে আইসিসির বদলে দেওয়া বল ব্যবহারের নিয়ম এবং তার পরের পরিসংখ্যান।
নতুন নিয়মে শেষ ১৬ ওভারের গুরুত্ব কেন বেড়েছে
গত বছরের জুলাইয়ে সাদা বল ব্যবহারের নিয়মে পরিবর্তন আনে আইসিসি। নতুন বিধান অনুযায়ী, ওয়ানডে ইনিংসের প্রথম ৩৪ ওভার দুই প্রান্ত থেকে দুটি আলাদা বল দিয়ে খেলা হয়। এরপর অধিনায়ক ওই দুটি বলের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন। বাকি ১৬ ওভার চলে নির্বাচিত বলটি দিয়ে।
ইনিংসের শেষ পর্যায়ে বলটি পুরোনো ও খসখসে হয়ে যাওয়ায় রিভার্স সুইংয়ের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে পেসারদের পক্ষে বলের গতিপথে পরিবর্তন আনা সহজ হয়, আর ব্যাটারদের জন্য শট খেলা ও রান তোলা হয়ে ওঠে কঠিন।
ক্রিকেট বিশ্লেষণ সংস্থা ক্রিকভিজের তথ্য বলছে, এই নিয়ম চালুর পর ওয়ানডেতে রিভার্স সুইংয়ের পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দল সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খেলার ধরন মানিয়ে নিতে পারলেও বাংলাদেশ ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই সমস্যায় পড়েছে।
জিম্বাবুয়ে ম্যাচে শেষ দিকে ছন্দ হারান বাংলাদেশের পেসাররা
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তাসকিন আহমেদের পুরো ১০ ওভারের পরিসংখ্যান দেখলে তাঁর বোলিংয়ের দুই পর্যায়ের পার্থক্য স্পষ্ট হয়। তিনি ৪৪ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নেন। এর মধ্যে প্রথম ছয় ওভারেই মাত্র ১৮ রান খরচ করে তিন উইকেট তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ দুই ওভারে আর কোনো উইকেট না পেলেও দিয়েছেন ১৯ রান।
অর্থাৎ, শুরুতে প্রতিপক্ষকে আটকে রেখে উইকেট নেওয়ার পরও ইনিংসের শেষ পর্যায়ে একই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি তাসকিন। এই চিত্র বাংলাদেশের ডেথ ওভারের বোলিং নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মোস্তাফিজের ক্ষেত্রেও ফল খুব একটা আলাদা ছিল না। ‘কাটার মাস্টার’ নামে পরিচিত এই বাঁহাতি পেসার ডেথ ওভারে তিন ওভার বল করে কোনো উইকেট পাননি; খরচ করেছেন ২৪ রান। অথচ ইনিংসের এই পর্যায়েই তাঁর কাছ থেকে সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত বোলিং প্রত্যাশিত ছিল।
মোস্তাফিজ ও তাসকিনের পরিসংখ্যানে যে অসংগতি
নতুন নিয়মের পর ডেথ ওভারে সবচেয়ে বেশি বল সুইং করানো শীর্ষ চার পেসারের তালিকায় বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদের নাম রয়েছে। কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে সুইং বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে বোলিংয়ের ফলাফলে উন্নতি হয়নি।
মোস্তাফিজের বোলিংয়ে সুইংয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ বেড়েছে। তারপরও ডেথ ওভারে তাঁর বোলিং গড় ৫.৩ এবং ইকোনমি রেট প্রায় ০.৯ বেড়েছে। অর্থাৎ, বল বেশি সুইং করলেও সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে উইকেট নেওয়া বা রান আটকে রাখার ক্ষেত্রে তিনি আগের চেয়ে ভালো ফল পাচ্ছেন না।
তাসকিনের পরিসংখ্যানেও একই ধরনের প্রবণতা রয়েছে। তাঁর বোলিংয়ে সুইং বেড়েছে প্রায় ৪০.৮ শতাংশ। তবে বোলিং গড় বেড়েছে ১.৯ এবং ইকোনমি রেট বেড়েছে ১.৬। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, বলের বাড়তি নড়াচড়া থাকলেও তা কার্যকর বোলিংয়ে রূপান্তর করা বাংলাদেশের দুই পেসারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিদেশি পেসারদের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে উল্টো ছবি
একই নিয়মের অধীনে অন্য দলের পেসারদের পারফরম্যান্স বাংলাদেশের সমস্যাটি আরও স্পষ্ট করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের আলজারি জোসেফের বোলিংয়ে সুইংয়ের পরিমাণ ৮৩.৬ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি তাঁর বোলিং গড় কমেছে ৬.৭।
দক্ষিণ আফ্রিকার লুঙ্গি এনগিডির ক্ষেত্রেও সুইং বেড়েছে ৬৩.৩ শতাংশ। এই বৃদ্ধির সঙ্গে তাঁর বোলিং গড় কমেছে ১০.৬ এবং ইকোনমি রেট কমেছে ৩.৩।
অর্থাৎ, জোসেফ ও এনগিডির ক্ষেত্রে বাড়তি সুইংয়ের সঙ্গে বোলিংয়ের কার্যকারিতাও বেড়েছে। বাংলাদেশের মোস্তাফিজ ও তাসকিনের পরিসংখ্যান ঠিক বিপরীত চিত্র দেখাচ্ছে—সুইং বাড়লেও বোলিং গড় ও ইকোনমি রেট দুটিই বেড়েছে।
বাংলাদেশের সমস্যা শুধু সুইং পাওয়া নয়
প্রদত্ত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সংকটের দুটি দিক সামনে আসে। প্রথমত, প্রতিপক্ষের পেসাররা পুরোনো বলের রিভার্স সুইং কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটারদের চাপে ফেলছেন। দ্বিতীয়ত, নিজেদের বোলাররা একই ধরনের সুইং পেয়েও শেষ ওভারে রান নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৯৯ রানের হার এই দুর্বলতার বাস্তব উদাহরণ। তাসকিনের প্রথম ছয় ওভারের সাফল্য এবং শেষ দুই ওভারের ব্যয়বহুল বোলিংয়ের পার্থক্য দেখায়, ম্যাচের শুরুতে কার্যকর হওয়া বোলিং শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা যাচ্ছে না। মোস্তাফিজের তিন ওভারে ২৪ রান দেওয়ার ঘটনাও একই প্রশ্ন সামনে আনে।
আইসিসির নতুন নিয়মে রিভার্স সুইং বেড়ে যাওয়ায় ওয়ানডের শেষ পর্যায়ে বোলিং ও ব্যাটিং—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পেসাররা বল সুইং করানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই; কিন্তু সেই সুইংকে উইকেট ও নিয়ন্ত্রিত রান দেওয়ার ফলাফলে পরিণত করতে পারছেন না। পাশাপাশি ব্যাটারদেরও প্রতিপক্ষের রিভার্স সুইংয়ের বিরুদ্ধে টিকে থেকে রান তোলার সমস্যা কাটাতে হচ্ছে। এই দুই দিকের দুর্বলতাই বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটে নতুন নিয়মের প্রভাবকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আইসিসির নতুন ওয়ানডে নিয়মে কী পরিবর্তন হয়েছে?
প্রথম ৩৪ ওভার দুই প্রান্ত থেকে দুটি আলাদা বল দিয়ে খেলা হয়। এরপর অধিনায়ক যেকোনো একটি বল বেছে নেন, আর ইনিংসের শেষ ১৬ ওভার সেই বল দিয়ে খেলা হয়।
২. বাংলাদেশের পেসাররা বেশি সুইং পেয়েও সমস্যায় পড়ছেন কেন?
প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোস্তাফিজ ও তাসকিনের বোলিংয়ে সুইং বাড়লেও তাঁদের ডেথ ওভারের বোলিং গড় এবং ইকোনমি রেট বেড়েছে। অর্থাৎ, বাড়তি সুইং প্রত্যাশিত নিয়ন্ত্রণ বা সাফল্য এনে দিচ্ছে না।
৩. জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তাসকিন আহমেদ কত রান দিয়ে কয়টি উইকেট নিয়েছিলেন?
তিনি ১০ ওভারে ৪৪ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নেন। প্রথম ছয় ওভারে ১৮ রান দিয়ে তিন উইকেট নেওয়ার পর শেষ দুই ওভারে ১৯ রান দেন।
৪. মোস্তাফিজুর রহমানের বোলিংয়ে সুইং কত শতাংশ বেড়েছে?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, মোস্তাফিজের বোলিংয়ে সুইংয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে তাঁর ডেথ ওভারের বোলিং গড় ৫.৩ এবং ইকোনমি রেট প্রায় ০.৯ বেড়েছে।
৫. নতুন নিয়মে কোন বিদেশি পেসাররা ভালো ফল করেছেন?
ওয়েস্ট ইন্ডিজের আলজারি জোসেফ ও দক্ষিণ আফ্রিকার লুঙ্গি এনগিডির পরিসংখ্যানে উন্নতি দেখা গেছে। তাঁদের সুইং বাড়ার পাশাপাশি বোলিং গড় কমেছে; এনগিডির ইকোনমি রেটও কমেছে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- Honor Win RT2: ১২,০৭০mAh ব্যাটারির গেমিং ফোন
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ২০টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ৬টি দেশের টাকার মান
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ১টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- OnePlus Ace 7: ১৮৫Hz ডিসপ্লে ও ৯০০০mAh ব্যাটারি!
- সব ওয়ারিশের নাম খতিয়ানে নেই? জমির কী হবে জানুন
- Suzuki V-Strom SX 250: ইঞ্জিন, মাইলেজ ও দাম
- নতুন Pulsar N250: ৫টি রাইডিং মোড ও ৬-স্পিড গিয়ার
- iQOO Neo 12: ৯০০০mAh ব্যাটারি ও ১৮৫Hz ডিসপ্লে
- আজকের স্বর্ণের দাম: ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট প্রতি ভরি সোনা ও রুপার দাম
- আজকের স্বর্ণের দাম: ২২ ক্যারেট প্রতি ভরি সোনা ও রুপার দাম কত