ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

৪২ টাকা থেকে ১১ টাকায় শেয়ারের দর, জেড ক্যাটাগরিতে যাচ্ছে কোম্পানি

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২০ ১৯:৩৫:৩০
৪২ টাকা থেকে ১১ টাকায় শেয়ারের দর, জেড ক্যাটাগরিতে যাচ্ছে কোম্পানি

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শেয়ারের দাম ৪২ টাকা ১০ পয়সা থেকে নেমে এসেছে ১১ টাকা ২০ পয়সায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লভ্যাংশ না দেওয়ার ঘোষণা এবং শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শ্রেণি অবনমনের সিদ্ধান্ত। সব মিলিয়ে চাপের মুখে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। একদিকে শেয়ারের দরপতন, অন্যদিকে কোম্পানির দুর্বল আর্থিক ফলাফল—দুই দিক থেকেই হতাশার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর এক দিনেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম কমেছে ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ। ওই দিন শেয়ারটির দর নেমে দাঁড়ায় ১১ টাকা ২০ পয়সায়। অথচ এর মাত্র চার মাস আগে, ১৫ জুন, প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১৫ টাকা। মাঝের সময়ে দর বেড়ে ১২ আগস্ট ৪২ টাকা ১০ পয়সায় পৌঁছেছিল। অর্থাৎ, অল্প সময়ের মধ্যে বড় উত্থানের পর শেয়ারটি আগের দামের চেয়েও নিচে নেমে গেছে।

লভ্যাংশ না দেওয়ার ঘোষণায় বেড়েছে বিক্রির চাপ

শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালনা পর্ষদ ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডিএসইর মাধ্যমে প্রকাশিত এ ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সাধারণত লভ্যাংশসংক্রান্ত করপোরেট ঘোষণার কারণে কোনো শেয়ারের দামের ওঠানামায় সার্কিট ব্রেকার কার্যকর না থাকলে দর পরিবর্তনের নির্দিষ্ট সীমা থাকে না। ১৯ অক্টোবর শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের ক্ষেত্রেও সার্কিট ব্রেকার ছিল না। ফলে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপে দর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

ওই দিন কোম্পানিটির প্রায় ৯০ লাখ ৯০ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনের মোট আর্থিক মূল্য ছিল ১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

দুই বছরে লভ্যাংশ নেই, জেড ক্যাটাগরিতে যাচ্ছে কোম্পানি

টানা দুই বছর লভ্যাংশ না দেওয়ায় শার্প ইন্ডাস্ট্রিজকে ডিএসইর বি ক্যাটাগরি থেকে জেড ক্যাটাগরিতে নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আইন অনুযায়ী, আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে কোম্পানিটি আনুষ্ঠানিকভাবে জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হবে।

শ্রেণি পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেকটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেয়ারের দাম কমার পাশাপাশি কোম্পানির শ্রেণি অবনমন বাজারে এর অবস্থান ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ জন্য রেকর্ড তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ নভেম্বর।

মুনাফার বদলে লোকসান, কমেছে সম্পদমূল্যও

শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক প্রতিবেদনেও অবনতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ঋণাত্মক ২ টাকা ৩৯ পয়সা। আগের অর্থবছর, ২০২৫ সালে, শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ১১ পয়সা। অর্থাৎ, সামান্য মুনাফার অবস্থান থেকে কোম্পানিটি লোকসানে চলে গেছে।

একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও (এনএভি) কমেছে। আগের অর্থবছরে যেখানে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ১০ টাকা ৮ পয়সা, ২০২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৭ টাকা ৬৮ পয়সায়।

তবে পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আগের বছর এ পরিমাণ ঋণাত্মক ১ টাকা ৭৪ পয়সা থাকলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে ইতিবাচক ৫২ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। নগদ প্রবাহে উন্নতি হলেও আয় ও সম্পদমূল্যের অবনতি কোম্পানিটির সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি নিয়ে বিএসইসির তদন্ত

শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দাম ১৫ টাকা থেকে মাত্র দুই মাসে ৪২ টাকা ১০ পয়সায় ওঠার পেছনে কী কারণ ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে কোম্পানির মৌলিক অবস্থান বা ব্যবসায় বড় কোনো পরিবর্তনের উল্লেখ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে শেয়ারটির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো চক্রের কারসাজি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেয় বিএসইসি।

তদন্তের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শেয়ারটির দর কমতে শুরু করে। বাজারে এমন সন্দেহও তৈরি হয়েছে যে, দরবৃদ্ধির সময় কোনো পক্ষ সুবিধাজনক দামে শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে গেছে, আর পরে দাম পড়ে যাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লোকসানে পড়েছেন। তবে তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের সন্দেহকে প্রমাণিত কারসাজি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

২০১০ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকানায় উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের অংশ ৩৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৩১ দশমিক ৯৭ শতাংশ শেয়ার এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ।

বিনিয়োগকারীদের সামনে এখন কী পরিস্থিতি

শেয়ারের দ্রুত দরবৃদ্ধির পর বড় পতন, লভ্যাংশ না পাওয়া, আর্থিক সূচকের অবনতি এবং জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর—সব মিলিয়ে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দরবৃদ্ধির সময় কারা লাভ তুলে নিয়েছেন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পেছনে কী কারণ কাজ করেছে, তা বুঝতে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তবে কোম্পানিটির শেয়ারের দামের পতন বা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পেছনে কারসাজি দায়ী কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। আপাতত প্রকাশিত আর্থিক তথ্য ও লভ্যাংশের ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে রয়েছে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

১. শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দাম কত হয়েছে?

২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম কমে ১১ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়ায়।

২. ১৯ অক্টোবর শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দাম কত শতাংশ কমেছে?

ওই দিন শেয়ারটির দাম ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ কমেছে।

৩. কোম্পানিটি ২০২৬ অর্থবছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কি?

না। ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ।

৪. শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ কবে জেড ক্যাটাগরিতে যাচ্ছে?

বিএসইসির আইন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে কোম্পানিটি জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হবে।

৫. শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

দরবৃদ্ধির পেছনে কোনো চক্রের কারসাজি ছিল কি না, তা তদন্ত করতে বিএসইসি উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কারসাজির অভিযোগ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ