মোহাম্মদ বিন সালমান কি ক্ষমতাচ্যুত হবেন? যা জানা যাচ্ছে
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে ঘিরে এখন বড় প্রশ্ন—এক দশক ধরে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা এই শাসক কি একাধিক সংকট সামলে নিজের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে পারবেন? ইয়েমেনের হুথিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরতা তাঁর সামনে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তবে সংকটের ব্যাপকতা সত্ত্বেও তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো সংগঠিত শক্তি রয়েছে, এমন প্রমাণ নেই বলে মনে করছেন রিয়াদে কর্মরত কূটনীতিকেরা।
বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে হলে শুধু সামরিক সংঘাতের দিকে তাকালে চলবে না। সৌদি আরবের বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ, অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা এবং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কৌশল—সবকিছুর ওপরই সংকটের প্রভাব পড়ছে। যুবরাজের জন্য সমস্যাটি তাই শুধু হুথিদের মোকাবিলা করা নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নিরাপত্তার ভিত্তি কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হচ্ছে তাঁকে।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত হওয়া। ২৬ অক্টোবর রিয়াদে শুরু হওয়ার কথা ছিল ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (এফআইআই)। ‘মরুভূমির দাভোস’ নামে পরিচিত এই সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, অর্থনীতিবিদ ও বড় বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন। সৌদি আরবে বিনিয়োগ টানতে যুবরাজ সাধারণত এই আয়োজনকে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন।
কিন্তু নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এবার সেই আয়োজন পিছিয়ে দিতে হয়েছে। ১৯ অক্টোবর আয়োজকেরা সম্মেলনটি আগামী বছর পর্যন্ত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথিরা রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। প্রাণঘাতী হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রমও কার্যত বন্ধ রয়েছে। কয়েকটি পশ্চিমা সরকার নিজেদের নাগরিকদের সৌদি আরব সফর না করার পরামর্শ দিয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও হোটেল ও সম্মেলনস্থল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন।
বিনিয়োগকারীদের সামনে সৌদি আরবকে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার যে প্রচেষ্টা, এই পরিস্থিতি তার জন্যও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হুথিদের সঙ্গে সংঘাত: সামনে তিনটি কঠিন পথ
সৌদি আরবের জন্য ইয়েমেনের যুদ্ধ নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান চালিয়েও হুথিদের পরাজিত করতে পারেনি দেশটি। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর রিয়াদের প্রত্যাশা ছিল, অন্তত হুথিদের হামলার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর যুদ্ধের প্রভাবে চলতি গ্রীষ্মে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়তে শুরু করে। একই সময়ে ইয়েমেনে হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড বেড়েছে এবং সৌদি আরবের ওপর আক্রমণও তীব্র হয়েছে।
এখন রিয়াদের সামনে এমন কয়েকটি বিকল্প রয়েছে, যার প্রতিটির সঙ্গেই বড় ঝুঁকি জড়িয়ে আছে। স্থলবাহিনী পাঠালে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে সৌদি আরব। বিমান হামলা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তাতে প্রত্যাশিত ফল মিলবে কি না, তা অনিশ্চিত। অন্যদিকে, হুথিদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছালে ইয়েমেনে তাদের শাসন আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুবরাজের ঘনিষ্ঠদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই তিন পথের কোনোটিই সহজ সমাধান দিচ্ছে না। ফলে সামরিক চাপ বাড়ানো কিংবা আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত—দুটির ক্ষেত্রেই সৌদি নেতৃত্বকে সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করতে হচ্ছে।
১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ লক্ষ্য, বাস্তবতা ভিন্ন
নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচিও চাপে রয়েছে। যুবরাজের পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তোলা এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু ২০২৬ সালের আগেই উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির কয়েকটি অংশে গতি কমে আসে। সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়ায় বড় কয়েকটি প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের বেতনও বাড়েনি।
বিদেশি বিনিয়োগের হিসাবও প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না। বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন যুবরাজ। কিন্তু প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ সেই লক্ষ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এক বছর আগে সংস্থাটি ২০২৬ সালে সৌদি অর্থনীতিতে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করেছিল। এখন তাদের পূর্বাভাসে একই বছরের জন্য ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকোচনের আশঙ্কা উঠে এসেছে।
এই পরিবর্তন যুবরাজের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়ায় না, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৭ সালে সৌদি অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরার ওপর। আর সেই প্রক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও নিশ্চয়তা কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে সৌদি আরব নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে দেখে। ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কও তৈরি হয়েছে।
সৌদি অর্থায়নে আয়োজিত গলফ প্রতিযোগিতার জন্য ট্রাম্পের মালিকানাধীন গলফ কোর্স ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের প্রতিষ্ঠানে সৌদি-সংশ্লিষ্ট একটি তহবিল ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সৌদি আরবের প্রত্যাশিত প্রভাব দেখা যায়নি। দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এমন এক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দীর্ঘ সময় ধরে কারও প্রতি অনুগত থাকেন না।
যুবরাজ তাঁকে ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প যদি আবার ইরানে বোমা হামলা শুরু করেন, তাহলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
তাদের উদ্বেগের কারণ, সম্ভাব্য হামলা একাধিক দিক থেকে আসতে পারে। দক্ষিণে ইয়েমেনের হুথি, উত্তরে ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং পূর্বে ইরান থেকে আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফ্রান্সের প্রায় চার গুণ আয়তনের সৌদি আরবের এত বড় ভূখণ্ড রক্ষায় পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী সরঞ্জাম থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা আর যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা যে এক বিষয় নয়, তা সৌদি নেতৃত্বের সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিমানবন্দরে প্রাণহানি, জনমনে উদ্বেগ
১০ অক্টোবর রিয়াদের বিমানবন্দরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত হন। এই ঘটনার পর যুবরাজকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি। ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে দেখা করা এবং জনগণকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব পালন করেছেন মন্ত্রীরা।
সৌদি আরবে নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ না থাকায় সরকারের প্রতি নাগরিকদের সমর্থনের সুনির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া কঠিন। তবে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, অধিকাংশ নাগরিক সরকারের ওপর আস্থা রাখেন। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবশ্য অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ অবস্থায় কয়েকজন পশ্চিমা বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, একের পর এক সংকট যুবরাজের শাসনের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হয়ে উঠতে পারে কি না। তবে রিয়াদে কর্মরত কূটনীতিকেরা মনে করেন, এমন আশঙ্কা অতিরঞ্জিত।
এক পশ্চিমা কূটনীতিকের মূল্যায়ন, সাত-আট বছর আগে মোহাম্মদ বিন সালমান আরও কঠিন পরিস্থিতিতে ছিলেন। তখন তিনি সদ্য মনোনীত উত্তরাধিকারী এবং নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করছিলেন। ইয়েমেন যুদ্ধ তখনও দীর্ঘ অচলাবস্থায় আটকে ছিল। কাতারের ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও অস্বস্তি তৈরি করেছিল।
এরপর ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সেই সময় আন্তর্জাতিক চাপও যুবরাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল।
ক্ষমতা কি আগের চেয়ে বেশি সুসংহত?
বর্তমান সংকটের মধ্যেও যুবরাজের রাজনৈতিক অবস্থানকে আগের সময়ের সঙ্গে এক করে দেখছেন না রিয়াদে কর্মরত কূটনীতিকেরা। তাঁদের মতে, এখন তাঁর ক্ষমতা অনেক বেশি সুসংহত। তিনি সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোণঠাসা করেছেন এবং সৌদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের পর দেশটির অন্য শাসকদের তুলনায় ক্ষমতা আরও বেশি কেন্দ্রীভূত করেছেন।
তাঁর বিরোধী থাকলেও সংগঠিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো শক্তি কারও রয়েছে বলে মনে করা হয় না। অর্থাৎ, সামরিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হলেও তা সরাসরি ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই।
পশ্চিমা মিত্রদের অবস্থানও আগের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সমালোচনা করা মিত্রদের মধ্যেও এখন প্রকাশ্য সমালোচনা তুলনামূলক কম। চলতি মাসে রিয়াদে যুবরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি ২০১৮ বা ২০২০ সালের মতো নয়। হুথিদের অগ্রগতি এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে সৌদি আরব যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তা স্বীকার করা প্রয়োজন।
আগের সংকট থেকে শিক্ষা, এবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে সিদ্ধান্ত
যুবরাজের শাসনামলের শুরুর দিকে তৈরি হওয়া অনেক সমস্যার পেছনে তাঁর নিজের সিদ্ধান্তের ভূমিকা ছিল। ফলে নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে সেসব সমস্যার সমাধান করার সুযোগও তাঁর সামনে ছিল।
২০২১ সালের মধ্যে সৌদি পররাষ্ট্রনীতিতে তুলনামূলক বাস্তববাদী অবস্থান নিতে শুরু করেন তিনি। কাতারের ওপর অবরোধ প্রত্যাহার করা হয় এবং হুথিদের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এমনকি জো বাইডেন প্রশাসনও পরে তাঁর পরিবর্তিত নীতির প্রশংসা করে। অথচ ক্ষমতায় আসার আগে বাইডেন প্রশাসন যুবরাজকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
এবারের পরিস্থিতি আলাদা হওয়ার কারণ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের একটি অংশ এখন তাঁর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই। ট্রাম্প যদি যুবরাজের পরামর্শ উপেক্ষা করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাড়ান, তাহলে সৌদি আরবকে এমন নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে, যা শুধু রিয়াদের নিজস্ব নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
আধুনিক সৌদি আরব, কিন্তু পুরোনো নির্ভরতা
গত এক দশকে সৌদি সমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একসময় বিনোদনের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ থাকা দেশটিতে এখন কনসার্ট ও সিনেমা হলের বিস্তার ঘটেছে। কিছু সচ্ছল বিদেশি নাগরিকের জন্য আইনসম্মতভাবে মদ্যপানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
তবে সামাজিক পরিবর্তনের তুলনায় অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা ও পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন সীমিত। দেশটির আয় এখনো তেলের ওপর নির্ভরশীল। সৌদি সেনাবাহিনী মূলত শাসনব্যবস্থা সুরক্ষার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নয়। অন্যদিকে, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অপরিহার্য অংশীদার।
এই নির্ভরতা কমাতে সৌদি আরব নতুন মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ তারই অংশ। তবে নতুন নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তার মাধ্যমে বিদ্যমান ঝুঁকি কমাতে সময় লাগবে।
শেষ পর্যন্ত যুবরাজের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কী?
মোহাম্মদ বিন সালমানের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব—তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে সৌদি আরবের কাঠামোগত দুর্বলতা কমানো। হুথিদের হামলা ঠেকানো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা সামাল দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যও তাঁর সামনে রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুবরাজ ক্ষমতাচ্যুত হবেন—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। বরং কূটনীতিকদের মূল্যায়নে তাঁর ক্ষমতা আগের তুলনায় বেশি সুসংহত। তবে রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়া আর দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সমাধান করা এক বিষয় নয়।
ক্ষমতার দ্বিতীয় দশকে তাঁর সাফল্য নির্ভর করবে শুধু সৌদি আরবের সামাজিক ও আধুনিক অবকাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর নয়; একই সঙ্গে দেশটির অর্থনীতি, সামরিক প্রস্তুতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি কতটা শক্তিশালী করা যায়, তার ওপরও। বর্তমান সংকট সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১. মোহাম্মদ বিন সালমান কি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন?
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো সংগঠিত শক্তি রয়েছে বলে মনে করা হয় না। রিয়াদে কর্মরত কূটনীতিকেরা তাঁর ক্ষমতাকে আগের তুলনায় বেশি সুসংহত বলে বর্ণনা করেছেন।
২. সৌদি যুবরাজের সামনে প্রধান সংকটগুলো কী?
ইয়েমেনের হুথিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাব, বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তানির্ভরতা তাঁর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
৩. সৌদি আরবের বিনিয়োগ সম্মেলন কেন স্থগিত করা হয়েছে?
২৬ অক্টোবর রিয়াদে শুরু হওয়ার কথা থাকা ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সম্মেলনটি নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও অংশগ্রহণকারীদের উদ্বেগের কারণে ১৯ অক্টোবর আগামী বছর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।
৪. ২০২৬ সালে সৌদি অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস কী?
আইএমএফের আগের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী পূর্বাভাসে সংস্থাটি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকোচনের আশঙ্কা জানিয়েছে।
৫. সৌদি আরব কেন পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তানির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে চাইছে। তবে এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- সব ওয়ারিশের নাম খতিয়ানে নেই? জমির কী হবে জানুন
- আজকের স্বর্ণের দাম: ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনা ও রুপার দাম কত
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ১টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- নতুন Pulsar N250: ৫টি রাইডিং মোড ও ৬-স্পিড গিয়ার
- জমির খতিয়ান অনলাইনে দেখার নিয়ম ও কপি পাওয়ার পদ্ধতি
- iQOO Neo 12: ৯০০০mAh ব্যাটারি ও ১৮৫Hz ডিসপ্লে
- দলিল ও খতিয়ানে জমির পরিমাণ আলাদা? জেনে নিন করণীয়
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ১৭টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ৪টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- পুরনো জমির মালিক কে ছিলেন? জানুন তথ্য বের করার উপায়
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ১৫টি দেশের টাকার বিনিময় হার