ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

সৌদি যুবরাজের তিন কৌশলগত বাজি এখন সংকটে, সামনে কঠিন পরীক্ষা

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২০ ২১:৫৯:৩৮
সৌদি যুবরাজের তিন কৌশলগত বাজি এখন সংকটে, সামনে কঠিন পরীক্ষা

সৌদি আরবকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা, তেলনির্ভর অর্থনীতির রূপান্তর এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে পাশে পাওয়া—এই তিন লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। কিন্তু একের পর এক পরিস্থিতির অবনতি তাঁর সেই কৌশলকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইয়েমেনে সামরিক সাফল্য না পাওয়া, অর্থনৈতিক সংস্কারে চাপ এবং ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে যুবরাজ এখন এমন এক সংকটে পড়েছেন, যার সমাধান পুরোপুরি তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ বিন সালমানের তিনটি বড় কৌশলগত বাজিই এখন টালমাটাল। এর প্রতীকী দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এসেছে ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সম্মেলন বাতিলের ঘটনা। একই সঙ্গে ইয়েমেন যুদ্ধ, অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং ট্রাম্পের ওপর ভরসার সীমাবদ্ধতা সৌদি নেতৃত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ কোনটি?

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পরাজিত করার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি সৌদি আরব। ২০২২ সালে যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটি টিকে থাকবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমান সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর ভঙ্গুর সেই যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এর জবাবে ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী সৌদি ভূখণ্ডে আরও জোরালো হামলা চালায়।

এখন রিয়াদের সামনে তিনটি কঠিন পথ রয়েছে। প্রথমত, রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে ইয়েমেনে স্থলসেনা পাঠানো। দ্বিতীয়ত, কার্যকর ফল না পাওয়া সত্ত্বেও বিমান হামলা চালিয়ে যাওয়া। তৃতীয়ত, এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছানো, যার মাধ্যমে হুতিদের শাসন মেনে নিতে হবে অথবা তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রতিটি বিকল্পেরই রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্য রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও আরও চাপে পড়বে। ফলে ইয়েমেন পরিস্থিতি শুধু সামরিক চ্যালেঞ্জ নয়, যুবরাজের বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার জন্যও বড় বাধা হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক স্বপ্নে বাড়ছে চাপ

সৌদি আরবের অর্থনীতি বদলে দেওয়ার পরিকল্পনাও প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। ২০২৬ সাল শুরু হওয়ার আগেই বড় বড় পরিকল্পনায় দুর্বলতার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। আর্থিক চাপের কারণে একাধিক মেগা প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি কর্মীদের বেতন।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে রয়েছে দেশটি। মোহাম্মদ বিন সালমান বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বিনিয়োগের পরিমাণ সেই লক্ষ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এক বছর আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালে সৌদি আরবের অর্থনীতি ৪ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। এখন সংস্থাটি একই বছরে দেশটির অর্থনীতিতে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকোচনের আশঙ্কা করছে।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ২০২৭ সালে কতটা সম্ভব হবে, তা অনেকাংশে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর নির্ভর করছে। আর সেই শান্তির সম্ভাবনাও জড়িয়ে রয়েছে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সঙ্গে।

ট্রাম্পকে পাশে রাখার কৌশল কতটা কার্যকর হলো?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে সৌদি আরবের কৌশলগত শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রিয়াদও মনে করেছিল, ট্রাম্পের সঙ্গে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করলে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখা সম্ভব হবে।

এ লক্ষ্য সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। ট্রাম্পের মালিকানাধীন গলফ কোর্সে সৌদি অর্থায়নে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি সৌদি-সংশ্লিষ্ট একটি তহবিল ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের তহবিলে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে।

তবে এসব উদ্যোগ ট্রাম্পকে এমন একটি যুদ্ধ শুরু করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি, যেটিকে বিশ্লেষণে বিপর্যয়কর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সৌদি আরবের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এক নাগরিক দ্য ইকোনমিস্টকে বলেছেন, ট্রাম্প দীর্ঘ সময় কারও প্রতি অনুগত থাকেন না।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি দেশটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন এমন এক নেতার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, যাঁর অবস্থান রিয়াদের পক্ষে সব সময় অনুকূল থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

প্রকাশ্যে কম যুবরাজ, বাড়ছে উদ্বেগ

গত ১০ অক্টোবর রিয়াদ বিমানবন্দরে ইয়েমেনিদের পাল্টা হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার পর থেকে মোহাম্মদ বিন সালমানকে জনসমক্ষে খুব কম দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, চলমান সংকট তাঁর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে কি না।

তবে রিয়াদের কূটনীতিকেরা এ ধরনের মূল্যায়নকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করছেন। একজন পশ্চিমা কূটনীতিকের ভাষ্য, সাত-আট বছর আগেও মোহাম্মদ বিন সালমান এর চেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন।

তবু এবারের সংকটের ধরন আগের চেয়ে আলাদা। দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অতীতে সৌদি যুবরাজের অনেক সমস্যাই তাঁর নিজের নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল ছিল। ফলে সিদ্ধান্ত বদলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগও তাঁর হাতে ছিল। কিন্তু বর্তমান সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো এমন কিছু শক্তির সঙ্গে জড়িত, যেগুলো তাঁর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই।

আগের সংকট থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন, এবার বাধা আরও জটিল

২০২১ সালের মধ্যে মোহাম্মদ বিন সালমান পররাষ্ট্রনীতিতে তুলনামূলক বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। কাতারের ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়া হয় এবং সানার সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর আগে তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বাইডেন প্রশাসনও এই পরিবর্তনের প্রশংসা করেছিল।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা কঠিন। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাতে আর বিস্তৃত না হয়, সে জন্য মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে সংঘাত বাড়াতে নিষেধ করেছিলেন। তারপরও সৌদি কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প যদি আবার বোমা হামলা শুরু করেন, তাহলে একাধিক দিক থেকে সৌদি আরবে হামলা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অর্থাৎ, রিয়াদ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারলেও আঞ্চলিক যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষমতা তার হাতে সীমিত।

সৌদি আরবের পুরোনো দুর্বলতাগুলো এখনো রয়ে গেছে

মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রথম দশকে সৌদি আরবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তবে রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু দুর্বলতা কাটেনি। অর্থনীতি এখনো তেলের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির সামরিক বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বা বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সৌদি আরবের অপরিহার্য মিত্র।

ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প অংশীদার খোঁজার উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ নামে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করার উদ্যোগ সেই প্রচেষ্টার অংশ। তবে নতুন মিত্র গড়ে তোলা এবং তাদের সঙ্গে কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে সময় লাগবে।

দ্বিতীয় দশকের বড় পরীক্ষা

মোহাম্মদ বিন সালমানের সামনে এখনকার চ্যালেঞ্জ শুধু কয়েকটি ব্যর্থ পরিকল্পনা সামাল দেওয়া নয়। বরং সৌদি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক কাঠামোর গভীরে থাকা সীমাবদ্ধতা দূর করা। তেলনির্ভরতা কমানো, সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং একক কোনো পরাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে।

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, সৌদি যুবরাজের প্রথম দশকে পরিবর্তনের অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো খুব বেশি বদলায়নি। তাঁর দ্বিতীয় দশকের সাফল্য নির্ভর করবে বাহ্যিক পরিবর্তনের পাশাপাশি এই ভিত্তিগত দুর্বলতাগুলো কতটা কাটিয়ে উঠতে পারেন, তার ওপর।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

১. সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের তিনটি বড় কৌশলগত লক্ষ্য কী?

সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানো, অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে পাশে রাখা।

২. ইয়েমেন যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য কেন বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে?

হুতি বিদ্রোহীদের পরাজিত করতে না পারা এবং যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার ফলে সৌদি আরবকে নতুন সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। দীর্ঘ সংঘাত অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকেও চাপে ফেলছে।

৩. ২০২৬ সালে সৌদি আরবের অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস কী?

আগে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হলেও আইএমএফের নতুন পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে সৌদি অর্থনীতিতে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকোচনের আশঙ্কা করা হয়েছে।

৪. ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কেন প্রশ্নের মুখে?

যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়ানোর পরও সৌদি আরব ট্রাম্পের যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঠেকাতে পারেনি। এতে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে এসেছে।

৫. সৌদি আরব বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে কেন?

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কার্যকর বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে সময় লাগবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: