ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

রাতে ঘুম আসছে না? বিছানায় শুয়ে থাকা বড় ভুল, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২২ ১২:২৭:৫৭
রাতে ঘুম আসছে না? বিছানায় শুয়ে থাকা বড় ভুল, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

রাত গভীর হচ্ছে, চোখ বন্ধ, অথচ ঘুম আসছে না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হিসাব কষা শুরু হয়, আর কত ঘণ্টা ঘুমানো যাবে, সকালে উঠতে হবে। এতে দুশ্চিন্তা বাড়ে, ঘুম আরও দূরে সরে যায়। ঘুম বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এমন সময় বিছানায় শুয়ে জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা না করে কিছু প্রমাণিত কৌশল কাজে লাগানো ভালো।

ঘুম না আসা কতটা সাধারণ সমস্যা

নির্দিষ্ট কোনো এক রাতে ঘুম না আসা প্রায় সবার জীবনেই ঘটে। তবে সপ্তাহে বেশ কয়েক দিন, টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুমাতে সমস্যা হলে এবং তার প্রভাব দিনের কাজকর্মে পড়লে তা ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা রোগের পর্যায়ে পড়তে পারে। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের (এএএসএম) তথ্য অনুযায়ী, মানসিক চাপ, ব্যথা, বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও অন্যান্য ঘুমজনিত রোগ এর সাধারণ কারণ। দিনে ঘুমানো, বিছানায় মোবাইল-ট্যাবলেট ব্যবহার, কিছু ওষুধ এবং ক্যাফেইন, অ্যালকোহল ও তামাকও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

রাতে ঘুম না এলে কী করবেন

১. ২০ মিনিটের নিয়ম মানুন

বিছানায় শুয়ে প্রায় ২০ মিনিটেও ঘুম না এলে উঠে পড়ুন। অন্য ঘরে বা শোয়ার জায়গার বাইরে বসে কম আলোতে শান্ত কোনো কাজ করুন, যেমন বই পড়া বা হালকা কিছু শোনা। চোখে ঘুম ঘুম ভাব এলে বিছানায় ফিরুন। আবার ২০ মিনিটের মধ্যে ঘুম না এলে একই কাজ করুন।

ঘুম বিশেষজ্ঞদের ভাষায় একে বলা হয় 'স্টিমুলাস কন্ট্রোল'। এর উদ্দেশ্য বিছানার সঙ্গে জেগে থাকা, দুশ্চিন্তা ও বিরক্তির সংযোগ ভেঙে দেওয়া, যাতে মস্তিষ্ক বিছানাকে শুধু ঘুমের জায়গা হিসেবে চিনতে শেখে। এখানে একটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। কত মিনিট কেটেছে, তা বারবার ঘড়ি দেখে মাপার প্রয়োজন নেই। ঘড়ি দেখলে উদ্বেগই বাড়ে। মোটামুটি আন্দাজে যখন মনে হবে অনেকক্ষণ জেগে আছেন, তখনই উঠে পড়বেন।

২. বিছানাকে শুধু ঘুমের জায়গা রাখুন

বিছানায় বসে কাজ করা, টিভি দেখা বা মোবাইল ঘাঁটার অভ্যাস থাকলে মস্তিষ্ক বিছানাকে সতর্ক থাকার জায়গা ভাবতে শুরু করে। এএএসএমের পরামর্শ, ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করে দিন।

৩. ঘুমের সময় ঠিক রাখুন

প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ঘড়িকে সাহায্য করে। ছুটির দিনেও খুব বেশি এদিক-ওদিক না করাই ভালো।

৪. মনের চাপ কমানোর চেষ্টা করুন

দুশ্চিন্তায় ঘুম না এলে ঘুমানোর আগে দুশ্চিন্তাগুলো কয়েক মিনিট ধরে খাতায় লিখে রাখা সাহায্য করতে পারে। এএএসএমও এ ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়া, পেশি শিথিল করার অনুশীলন বা মাইন্ডফুলনেসও কাজে আসতে পারে।

৫. দিনের অভ্যাসেও নজর দিন

দিনে ঘুমানো কমান। নিতান্ত প্রয়োজন হলে অল্প সময়ের জন্য।

দিনে নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, কারণ এটি ঘুমের মান বাড়াতে সহায়ক বলে গবেষণায় এসেছে।

বিকেলের পর চা-কফি বা অন্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন।

রাতে অতিরিক্ত ভারী খাবার বা একেবারে খালি পেটে ঘুমাতে যাওয়া এড়ান।

অ্যালকোহল ও ধূমপান ঘুমের জন্য ক্ষতিকর, এ কথা মনে রাখুন।

ঘুমের ঘর অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক রাখুন।

মনে রাখবেন, কেবল ঘুমের নিয়মকানুনই যথেষ্ট নাও হতে পারে

ঘুমের পরিবেশ ও অভ্যাস ঠিক রাখা, যাকে ঘুম-স্বাস্থ্যবিধি বা 'স্লিপ হাইজিন' বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ হলেও এএএসএমের চিকিৎসা-নির্দেশিকা অনুযায়ী দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার ক্ষেত্রে শুধু এটিকেই একক চিকিৎসা হিসেবে সুপারিশ করা হয় না। দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রায় সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত 'কগনিটিভ বিহেভিয়োরাল থেরাপি ফর ইনসমনিয়া' (সিবিটি-আই)। এতে স্টিমুলাস কন্ট্রোলের পাশাপাশি থাকে বিছানায় থাকার সময় নিয়ন্ত্রণ (স্লিপ রেস্ট্রিকশন), শিথিলায়ন কৌশল ও ঘুম নিয়ে ভুল ধারণা বদলানোর প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে এটি করা ভালো, কারণ এর কিছু ধাপ ভুলভাবে করলে সমস্যা বাড়তে পারে।

ঘুমের ওষুধ নিয়ে সতর্কতা

ঘুম না এলে নিজে নিজে ঘুমের ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত নয়। এগুলো কখন, কতটুকু ও কত দিন খাওয়া যাবে, তা চিকিৎসকই ঠিক করবেন। কিছু ওষুধ নিজেই ঘুমের সমস্যার কারণ হতে পারে, তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে সে কথা চিকিৎসককে জানান।

আরও পড়ুন:

ফ্রিজের দুর্গন্ধ দূর করার ৬টি সহজ ও কার্যকর উপায়

ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয় কেন? জেনে নিন সমাধান

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

ঘুমের সমস্যা সপ্তাহে কয়েক দিন, একাধারে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে

দিনের বেলা প্রচণ্ড ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব বা মেজাজের পরিবর্তন হচ্ছে

ঘুমের মধ্যে জোরে নাক ডাকা, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি বা পা নাড়ানোর তাগিদ আছে

দীর্ঘদিন মন খারাপ, উদ্বেগ বা ব্যথা থাকায় ঘুম ব্যাহত হচ্ছে

ঘুম না এলে বিছানায় শুয়ে জোর করা সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। ২০ মিনিটের নিয়ম, নিয়মিত ঘুমের সময়, বিছানায় ঘুম ছাড়া অন্য কাজ না করা এবং দিনের অভ্যাস ঠিক রাখা, এই ছোট ছোট পরিবর্তনই অনেকের ঘুম ফেরাতে পারে। তারপরও সমস্যা থেকে গেলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পথ।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদন সাধারণ সচেতনতার জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।)

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. রাতে ঘুম না এলে কতক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকা উচিত?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রায় ২০ মিনিটেও ঘুম না এলে বিছানা ছেড়ে উঠে কম আলোয় শান্ত কোনো কাজ করুন। ঘুম ঘুম ভাব এলে আবার বিছানায় যান।

২. ঘুম না এলে মোবাইল দেখা কি ঠিক?

না। ডিভাইসের আলো ও কনটেন্ট মস্তিষ্ককে সজাগ রাখে। এএএসএমের পরামর্শ, ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে থেকে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখা।

৩. দিনে ঘুমালে কি রাতের ঘুম নষ্ট হয়?

হ্যাঁ, দিনের বেলার ঘুম রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। নিতান্ত প্রয়োজন হলে ঘুম অল্প সময়ের জন্য রাখাই ভালো।

৪. অনিদ্রার জন্য কি ঘুমের ওষুধই একমাত্র সমাধান?

না। দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রায় সিবিটি-আই কার্যকর ও স্বীকৃত পদ্ধতি। ওষুধ খেতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে।

৫. কখন বুঝব যে ঘুমের সমস্যা ডাক্তার দেখানোর মতো?

সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চললে, দিনের কাজে ক্লান্তি বা মনোযোগের ঘাটতি হলে, কিংবা ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট বা জোরে নাক ডাকার লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ