ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

বিসিএস ক্যাডারে এলজিইডি, আজ গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৭ ১৩:৫২:৪৩
বিসিএস ক্যাডারে এলজিইডি, আজ গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা

দেশের বড় প্রকৌশল সংস্থাগুলোর একটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবার বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) পেশাগত ক্যাডারের আওতায় আসার পথে। এলজিইডির প্রকৌশলীদের জন্য আলাদা ক্যাডার কাঠামো তৈরির প্রস্তাব নিয়ে আজ রোববার বিকেলে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ডেকেছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এই উদ্যোগ নতুন করে আনুষ্ঠানিক আলোচনার টেবিলে আসায় এলজিইডির প্রকৌশলীদের ক্যাডারভুক্তির বিষয়টি আবার সামনে এসেছে।

সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিতব্য সভায় ‘বিসিএস (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল) ক্যাডার’ গঠনের প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি) মোস্তফা জামান সভায় সভাপতিত্ব করবেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এবং আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

প্রস্তাবটি যাচাইয়ের সময় শুধু ক্যাডার গঠনের প্রয়োজনীয়তাই নয়, এলজিইডির বর্তমান জনবল, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং এর সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

যে কারণে আবার আলোচনায় এলজিইডি

এলজিইডির পক্ষ থেকে পৃথক ক্যাডার গঠনের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার পেছনে মূল যুক্তিগুলোর একটি হলো প্রকৌশলীদের কাজের ধরন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের দায়িত্বের সঙ্গে এলজিইডির প্রকৌশলীদের কাজের যথেষ্ট মিল রয়েছে। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৌশলীদের মতো এলজিইডির জন্য আলাদা ক্যাডার কাঠামো নেই।

এলজিইডি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারিগরি সহায়তা দেওয়াও প্রতিষ্ঠানটির কাজের অংশ।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নন-ক্যাডার কাঠামোর কারণে মেধাবী প্রকৌশলীদের আকৃষ্ট করা এবং দক্ষ কর্মকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নিয়োগ, পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার উন্নয়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। এলজিইডির আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

সহকারী প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত প্রায় ১,৬০০ পদ

এলজিইডির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান প্রকৌশলী পদগুলোকে ক্যাডার কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে সহকারী প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৬০০ পদ রয়েছে অধিদপ্তরটিতে।

ক্যাডার গঠন করলে সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে কি না, সেটিও প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়েছে। এলজিইডির অবস্থান হলো, বর্তমানে বিদ্যমান জনবল কাঠামো এবং দায়িত্বের মধ্যেই নতুন ক্যাডার ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব। এ কারণে অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক সংস্থানের প্রয়োজন হবে না বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের দিকে ইঙ্গিত করে এলজিইডি বলেছে, ক্যাডারভুক্ত অন্যান্য প্রকৌশল সংস্থার তুলনায় তাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিধি উল্লেখযোগ্য। ওই অর্থবছরের এডিপি বরাদ্দ বিশ্লেষণ করেও এলজিইডি দাবি করেছে, অন্যান্য ক্যাডারভুক্ত প্রকৌশল সংস্থার তুলনায় তাদের উন্নয়ন বরাদ্দ বেশি।

২০০৫ সালের উদ্যোগ থেমেছিল কোথায়

এলজিইডির প্রকৌশলীদের ক্যাডারভুক্তির আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। ২০০৫ সালে অধিদপ্তরটিকে পৃথক বিসিএস প্রকৌশল ক্যাডারে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। সেই সময় প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমও এগিয়েছিল এবং ২০০৬ সালে অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে প্রস্তাবটি বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুরলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এলজিইডি নন-ক্যাডার প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আবার সক্রিয় হয়। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন গত ১৯ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগে পৃথক ক্যাডার গঠনের প্রস্তাব পাঠান। পরে স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রস্তাবটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই আজকের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ক্যাডার গঠনের পক্ষে কর্মকর্তাদের যুক্তি

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন এবং শৃঙ্খলা ও তদন্ত ইউনিট) আবদুল বারেক হাওলাদার সমকালকে বলেন, গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ক্যাডারের সঙ্গে এলজিইডির কাজের যথেষ্ট মিল রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগে জনবলও অনেক বেশি।

তিনি বলেন, ২০০৫ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এলজিইডির কর্মকর্তাদের ক্যাডার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় আবারও বিষয়টি নিয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আজ প্রথম আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ডেকেছে।

এলজিইডির প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, প্রকৌশলীদের শিক্ষা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব এবং কাজের পরিধি বিবেচনায় পৃথক ক্যাডার কাঠামো থাকা প্রয়োজন। এটি করা হলে অন্যান্য প্রকৌশল ক্যাডারের সঙ্গে সমন্বয় বাড়বে এবং কর্মকর্তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে উৎসাহও বাড়বে।

নতুন ক্যাডার গঠনের সঙ্গে আরেক প্রশ্ন

এলজিইডির দাবির বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার সমকালকে বলেন, দাবিটি একেবারে অযৌক্তিক নয়। সরকার চাইলে এলজিইডির প্রকৌশলীদের ক্যাডারভুক্ত করতে পারে।

তবে একই সঙ্গে তিনি আরেকটি বিষয় বিবেচনার কথা জানিয়েছেন। বর্তমানে ক্যাডারের সংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগও রয়েছে। তাই এলজিইডির জন্য পৃথক ক্যাডার তৈরি হলে সামগ্রিকভাবে ক্যাডারের সংখ্যা বাড়ানো হবে কি না, সেটিও সরকারের বিবেচনায় থাকবে।

এলজিইডির দৃষ্টিতে বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা শুধু প্রকৌশলীদের চাকরির কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বৃহৎ প্রকৌশল সংস্থা হিসেবে তাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিধি এবং বিদ্যমান দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পৃথক বিসিএস ক্যাডার কাঠামো প্রয়োজন বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা, জনবল, প্রশাসনিক কাঠামো ও আর্থিক প্রভাবসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে।

FAQ

এলজিইডিকে বিসিএস ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়েছে?

এলজিইডির প্রকৌশলীদের কাজের ধরন অন্যান্য প্রকৌশল ক্যাডারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নন-ক্যাডার কাঠামোর কারণে মেধাবী প্রকৌশলী আকর্ষণ ও দক্ষ জনবল ধরে রাখায় সমস্যা হচ্ছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এলজিইডির ক্যাডার গঠন নিয়ে সভা কখন হবে?

আজ রোববার বিকেলে সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।

এলজিইডিতে কতটি প্রকৌশলী পদ রয়েছে?

সহকারী প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৬০০ পদ রয়েছে।

এলজিইডির ক্যাডার গঠনের উদ্যোগ প্রথম কবে নেওয়া হয়েছিল?

২০০৫ সালে পৃথক বিসিএস প্রকৌশল ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৬ সালে অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে সম্মতি দেয়।

ক্যাডার গঠন হলে অতিরিক্ত সরকারি অর্থ লাগবে কি?

এলজিইডির দাবি, বিদ্যমান জনবল কাঠামো ও দায়িত্বের মধ্যেই ক্যাডার কাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব। তাই অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক সংস্থানের প্রয়োজন হবে না বলে তারা মনে করছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ