ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্রোকারেজ হাউজে অর্থের অনিয়ম ঠেকাতে রিয়েল-টাইম নজরদারি

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৮ ১৭:২৯:৪১
ব্রোকারেজ হাউজে অর্থের অনিয়ম ঠেকাতে রিয়েল-টাইম নজরদারি

ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্রোকারেজ হাউজে অর্থের অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করতে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দেশের সব ব্রোকারেজ হাউজকে একটি অভিন্ন ও অত্যন্ত সুরক্ষিত ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

তার পরিকল্পনায় রয়েছে ব্যাংক হিসাব ও সিসিএ (কাস্টমার ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্ট)-এর অর্থের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়ার ব্যবস্থা। এর ফলে প্রতিদিনের অর্থের রিকনসিলিয়েশন করা যাবে এবং কোনো হিসাবে ঘাটতি দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করার সুযোগ থাকবে।

প্রথম ধাপে ফেরত যাবে ৫ লাখ টাকার নিচের পাওনা

ব্রোকারেজ হাউজ কর্তৃপক্ষের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ইনভেস্টরস প্রটেকশন ফান্ড (আইপিএফ) ব্যবহার করে ধাপে ধাপে অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মাসুদ খান।

প্রথম পর্যায়ে যেসব বিনিয়োগকারীর পাওনা ৫ লাখ টাকার নিচে, তাদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিএসইসি চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৯৬ শতাংশের পাওনা এই সীমার মধ্যে।

এরপর ৫ লাখ টাকার বেশি পাওনা থাকা বিনিয়োগকারীদেরও পর্যায়ক্রমে অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে ৫ লাখ টাকার নিচে পাওনাদারদের পুরো অর্থ দেওয়া হবে এবং পরবর্তী ধাপে সবাইকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনার চেষ্টা থাকবে।

পাঁচ সিকিউরিটিজ হাউজে ৪৯২ কোটি টাকার অস্বচ্ছতা

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আয়োজিত ‘আইপিএফ তহবিল বিতরণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে’ বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব তথ্য জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।

অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয় ব্রোকারেজ হাউজ কর্তৃপক্ষের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অর্থ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন উপলক্ষে।

মাসুদ খান জানান, পাঁচটি সিকিউরিটিজ হাউজে ৪৯২ কোটি টাকার আর্থিক অস্বচ্ছতার ঘটনায় ১৭ হাজার ৯৬৭ জন বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই সংখ্যাকে তিনি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেন।

তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এই সমস্যার সমাধান প্রয়োজন ছিল। বর্তমান উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সেই সমাধানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

অর্থের গতিপথ সরাসরি দেখার ব্যবস্থা

ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে শুধু ক্ষতিপূরণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়—প্রযুক্তির মাধ্যমে আগে থেকেই অনিয়ম শনাক্ত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।

এ জন্য ডিএসইর সঙ্গে একটি শক্তিশালী ব্যাক অফিস সফটওয়্যার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রস্তাবিত সফটওয়্যারটি হবে ইউনিফাইড এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত। এর মাধ্যমে ব্রোকারদের কাছ থেকে রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়া যাবে।

একই সঙ্গে প্রতিদিনের সম্পূর্ণ রিকনসিলিয়েশন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। একটি ব্রোকারেজ হাউজের ব্যাংক হিসাবে কত অর্থ রয়েছে এবং সিসিএ অ্যাকাউন্টে কত অর্থ রয়েছে, সেটিও নিয়মিত যাচাই করা যাবে।

এ ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সরাসরি তদারকির ওপর চাপ কমবে বলে জানান মাসুদ খান।

ওএমএস নিয়েও এগোনোর কথা

ব্রোকারেজ হাউজের ব্যাক অফিস ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস) নিয়েও কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই ডিজিটাল যুগে আমাদের এটাকে অবশ্যই করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’

আইপিএফের ব্যবহার বদলে দিয়েছে বাস্তবতা

মাসুদ খান জানান, আইপিএফ মূলত সেটেলমেন্ট ঝুঁকি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় রাখা অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সামনে আসার পর তহবিলটির ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা অন্যভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।

যারা আস্থা রেখে বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের কষ্টার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন—অন্য কোনো দেশে এত বড় পরিসরে এ ধরনের ঘটনা ঘটে কি না।

উদ্যোগ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়

ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বর্তমান উদ্যোগকে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক সাফল্য হিসেবে দেখেন না মাসুদ খান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ডিএসই, বিএসইসি ও ইনভেস্টরস ফোরাম—কোনো পক্ষই একা এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই কাজটি এগিয়েছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, এই টিমওয়ার্ক না থাকলে আজকের অনুষ্ঠান আয়োজন করাও সম্ভব হতো না।

ডিএসইর পক্ষ থেকে কমিশনের কাছে যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বিএসইসি সেটি পূরণ করেছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি আইপিএফ নিয়ে দ্রুত কাজ করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ দেন।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর লক্ষ্য

অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক বিনিয়োগকারী কঠিন জীবনযাপন করছেন বলে উল্লেখ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তার মতে, এ ধরনের ঘটনা পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা তৈরির অন্যতম কারণ।

বিনিয়োগকারীরা যাতে আবার পুঁজিবাজারের ওপর আস্থা রাখতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই বিএসইসি কাজ করবে বলে জানান মাসুদ খান।

একদিকে আইপিএফের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে অর্থের অনিয়ম ঠেকাতে রিয়েল-টাইম তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: