ঢাকা, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

১০০ জনে ৯৯ জনই শেয়ারবাজারে নেই, কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৪ ১৮:৫৫:৪২
১০০ জনে ৯৯ জনই শেয়ারবাজারে নেই, কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাব রয়েছে ১৯ কোটির বেশি, অথচ শেয়ারবাজারে প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ২ লাখও নয়। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৭ লাখের মতো হলেও একই ব্যক্তি একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করায় প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা নেমে এসেছে জনসংখ্যার ০.১ শতাংশেরও নিচে। অর্থাৎ দেশের ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনেরও বেশি মানুষ সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বাইরে।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর চিত্রের সঙ্গে তুলনা করলেও ব্যবধানটি স্পষ্ট। ভারতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ এবং নেপালে প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষ শেয়ারবাজারের সঙ্গে যুক্ত। উন্নত দেশগুলোতে এই অংশগ্রহণের হার আরও বেশি।

তাহলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কেন পুঁজিবাজার থেকে এতটা দূরে? এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া আস্থার সংকট, বাজারে অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা নিয়ে নানা প্রশ্ন।

২০১০ সালের ধস বদলে দেয় বিনিয়োগকারীদের মনোভাব

বাংলাদেশের মানুষের শেয়ারবাজারে আগ্রহ একেবারেই ছিল না—এমনটা বলা যায় না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১০ সালের আগের চিত্রে। সেই সময় দেশের বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৩৩ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু ওই বছরের রেকর্ড দরপতনের পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। বড় ধরনের লোকসানের অভিজ্ঞতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আঘাত করে। এরপর ধীরে ধীরে বাজারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কমতে থাকে।

বর্তমানে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ হলেও এই সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বোঝা যায় না। কারণ একই বিনিয়োগকারী শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড কিংবা বন্ড রাখার জন্য একাধিক বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। বাজার সংশ্লিষ্টদের হিসাবে প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ২ লাখের বেশি নয়।

আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

শেয়ারবাজার থেকে দূরে থাকার পেছনে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট একটি বড় বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। কিছু ব্রোকারেজ হাউস ও ফান্ড ম্যানেজারের তহবিল তছরুপের ঘটনায় বিনিয়োগকারীরা মূলধন হারিয়েছেন।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা শুধু সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসেও প্রভাব ফেলেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক তথ্য নিয়ে প্রশ্ন। কিছু দুর্বল কোম্পানি নিজেদের আর্থিক বিবরণীতে অনিয়ম আড়াল করে শেয়ারবাজারে এসেছে। পরে এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

টাকা থাকলেও লভ্যাংশ নিয়ে হতাশা

বাজারে বিনিয়োগকারীদের আরেকটি অভিযোগ ভালো কোম্পানির লভ্যাংশ নীতি নিয়ে। শত শত কোটি টাকা ব্যাংকে জমা থাকা সত্ত্বেও অনেক ভালো কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের উপযুক্ত ক্যাশ ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ দেয় না।

ফলে একটি কোম্পানির শেয়ারে অর্থ বিনিয়োগ করার পর তার বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন পাওয়ার বিষয়টি অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

দুর্বল শেয়ারে ঝুঁকি, বাড়ে কারসাজির সুযোগ

ভালো শেয়ারে প্রত্যাশিত রিটার্ন না পাওয়ার পর এক শ্রেণির বিনিয়োগকারী কম পরিশোধিত মূলধনের দুর্বল বা ‘জঙ্ক’ শেয়ারের দিকে ঝুঁকেছেন।

এই পরিস্থিতি বাজার কারসাজিকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। দুর্বল শেয়ারের দামে কারসাজির অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা নামমাত্র ছিল—এমন অভিযোগ রয়েছে।

ফলে বাজারে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার পরিবেশ ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

নিয়ন্ত্রকের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে

বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমার পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু সিদ্ধান্তও আলোচনায় এসেছে। অতীতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।

মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানো কিংবা দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানিকে আইপিও অনুমোদনের মাধ্যমে বাজারে আসার সুযোগ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তকে এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।

পরিবর্তনের চেষ্টাও শুরু হয়েছে

দীর্ঘদিনের এই আস্থার সংকটের মধ্যেও বাজারে পরিবর্তনের কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) জালিয়াতির শিকার বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করেছে।

এদিকে ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর গঠিত বিএসইসির নতুন কমিশন বাজার সংস্কারে বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।

বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

নতুন বিনিয়োগকারী আনতে সামনে যেসব কাজ জরুরি

শেয়ারবাজারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে বাজারের আস্থা পুনর্গঠনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রথমত, বাজারে ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শুধু ইক্যুইটি বাজারের ওপর নির্ভর না করে একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ারের দর কারসাজি এবং মধ্যস্থতাকারীদের অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সূচক বা লেনদেনের আকার কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণের বদলে ভালো শাসন ও স্বচ্ছতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আস্থার ওপর

বাংলাদেশে শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণের বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, বিপুল জনসংখ্যা ও বড় ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। একসময় বিও অ্যাকাউন্ট ৩৩ লাখ ছাড়ালেও ২০১০ সালের বড় ধসের পর সেই আস্থা ধরে রাখা যায়নি।

এখন বাজার সংস্কারের উদ্যোগের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অনিয়ম ও কারসাজি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপরই গুরুত্ব দিতে হবে।

নিয়ামক সংস্থা যদি বিনিয়োগকারীদের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহে সেটিই বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ