শেয়ারবাজারে উৎপাদন বন্ধ ৩৭ কোম্পানির, বাড়ছে শঙ্কা
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন ৩৭। বিভিন্ন শিল্পখাতের এসব কোম্পানির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বাস্তব ব্যবসায়িক অবস্থান নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। সর্বশেষ এই তালিকায় জায়গা হয়েছে সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের। ডিএসইর পরিদর্শনে কোম্পানিটির কারখানায় উৎপাদন কিংবা স্বাভাবিক কোনো কার্যক্রমের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু কোম্পানি তাদের সমস্যার কারণ জানিয়েছে। আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণ স্পষ্ট নয়। এমনকি ডিএসইর পরিদর্শন দল সরেজমিনে গিয়ে কয়েকটি কোম্পানির কারখানা বন্ধ অবস্থায় পাওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
৩৭ কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ
সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলকে সর্বশেষ তালিকায় যুক্ত করার পর উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির সংখ্যা ৩৭টিতে পৌঁছেছে। এই তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট খাতের নয়। স্টিল, টেক্সটাইল, বিদ্যুৎ, সিমেন্ট, প্রকৌশল, সিরামিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রাসায়নিক—বিভিন্ন খাতের কোম্পানি রয়েছে এখানে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত এসব কোম্পানির অধিকাংশের উৎপাদন ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে বন্ধ হয়েছে। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এরও অনেক আগে উৎপাদন বন্ধ করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির উদাহরণ হিসেবে রয়েছে মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ২০০২ সাল থেকে। বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডসের উৎপাদনও ২০১৬ সাল থেকে বন্ধ।
নতুন করে আলোচনায় সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল
৩৭ কোম্পানির এই তালিকায় সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের নাম যুক্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে ডিএসইর সাম্প্রতিক পরিদর্শন। ডিএসইর একটি দল কোম্পানিটির কারখানায় গিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালু থাকার কোনো চিহ্ন দেখতে পায়নি। সেখানে স্বাভাবিক কার্যক্রমও চলছিল না।
পরিদর্শনের তথ্য সোমবার ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এর আগেই কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধ থাকার বিষয়ে শেয়ারনিউজে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে উৎপাদন কেন বন্ধ রয়েছে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোম্পানিটির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়নি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য না দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
কোম্পানিটির সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যও বেশ পুরোনো। ২০২৪ সালের মার্চে সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
আর্থিক অবস্থাতেও দুর্বলতার চিত্র
শুধু উৎপাদন বন্ধ থাকা নয়, কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার চিত্রও দুর্বল। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভি ঋণাত্মক ৩ টাকা ৮১ পয়সা।
এদিকে নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন করতে না পারায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কোম্পানিটিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে নামিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি এই শ্রেণিতেই রয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিটির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে ঋণসুবিধা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
আগেও বন্ধ পাওয়া গিয়েছিল কারখানা
সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের কারখানা বন্ধ থাকার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০১৯ সালেও ডিএসইর একটি পরিদর্শন দল কোম্পানিটির কারখানা ও প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে সেগুলো বন্ধ অবস্থায় পেয়েছিল।
সেই পরিদর্শনের সময়ও দলটি কারখানা ও প্রধান কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি।
অর্থাৎ, কোম্পানিটির কার্যক্রম নিয়ে এর আগেও ডিএসইর পরিদর্শনে বন্ধ থাকার চিত্র সামনে এসেছিল। এবার নতুন করে কারখানিতে উৎপাদন না চলার বিষয়টি ডিএসইর পরিদর্শনে উঠে এসেছে।
২০১৫ সালে তালিকাভুক্ত, মূলধন ২৩৯ কোটি টাকা
সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০১৫ সালে। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ২৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। মোট শেয়ারের সংখ্যা ২৩ কোটি ৯৩ লাখ ১৬ হাজার।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ‘জেড’ শ্রেণিতে।
এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের ক্ষেত্রেও উৎপাদন থেমেছিল
উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের বিষয়টিও আগে আলোচনায় এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, গত ১ আগস্ট থেকে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ।
কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ব্যাংক হিসাব স্থগিত হয়ে যায়। এর পাশাপাশি ঋণপত্র (এলসি) খোলায় জটিলতা, কাঁচামাল ও রাসায়নিক আমদানিতে বাধা, দক্ষ শ্রমিকদের চলে যাওয়া এবং জনবল সংকট তৈরি হয়। এসব কারণে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
পরিস্থিতির উন্নতি হলে পুনরায় উৎপাদনে ফেরার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও কোম্পানিটি জানিয়েছিল। তবে উৎপাদন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিল তারা।
ডিএসইতে ‘জেড’ শ্রেণির কোম্পানি ১২৬টি
বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকায় মোট কোম্পানি রয়েছে ৩৬০টি। এর মধ্যে ‘এ’ শ্রেণির কোম্পানি ১৬০টি এবং ‘বি’ শ্রেণির কোম্পানি ৭৪টি। অন্যদিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে রয়েছে ১২৬টি কোম্পানি।
উৎপাদন বন্ধ থাকা ৩৭টি কোম্পানির মধ্যে কোন প্রতিষ্ঠান কতদিন ধরে বন্ধ, কী কারণে বন্ধ এবং তাদের কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা কী—এসব তথ্যের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর অবস্থান এক নয়। ডিএসইর তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধের কারণ জানিয়েছে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে তালিকাভুক্ত এসব কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বাস্তব অবস্থা বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
FAQ
১. শেয়ারবাজারে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানি এখন কতটি?
সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলকে সর্বশেষ তালিকায় যুক্ত করার পর উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানির সংখ্যা ৩৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
২. সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের কারখানায় কী পাওয়া গেছে?
ডিএসইর পরিদর্শন দল কারখানায় গিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চলার কোনো চিহ্ন পায়নি। সেখানে স্বাভাবিক কোনো কার্যক্রমও চলছিল না।
৩. সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল কেন ‘জেড’ শ্রেণিতে?
নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কোম্পানিটিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে নামিয়ে দেওয়া হয়।
৪. সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের এনএভি কত?
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভি ঋণাত্মক ৩ টাকা ৮১ পয়সা।
৫. ডিএসইতে বর্তমানে মোট কতটি কোম্পানি রয়েছে?
ডিএসইর তালিকায় বর্তমানে ৩৬০টি কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ শ্রেণির ১৬০টি, ‘বি’ শ্রেণির ৭৪টি এবং ‘জেড’ শ্রেণির ১২৬টি কোম্পানি।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- এনসিসি ব্যাংকের শেয়ার বিক্রি, বাজারমূল্য ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা
- ব্রাজিল বনাম ভারত: শেষ পর্যন্ত কী হলো ম্যাচে, জানুন ফলাফল
- আজকের টাকার রেট কত: বাড়লো ২০টি দেশের টাকার মান
- আজ ১০/০৪/২০২৬ তারিখ: ১৮ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট সোনার দাম
- আয়-সম্পদে বড় উত্থান অ্যাপেক্স ফুডসের, ডিভিডেন্ড কেন একই?
- ডোমিনেজ স্টিলে মালিকানা বদল, এবার পর্ষদেও বড় রদবদল
- সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য সুখবর