ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

হাসিনা দেশে ফিরলে বদলে যেতে পারে যে ৫ বড় হিসাব

রাজনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৮ ১২:৩৩:২১
হাসিনা দেশে ফিরলে বদলে যেতে পারে যে ৫ বড় হিসাব

ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এই ঘোষণার বাস্তবায়ন হলে বিষয়টি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের আদালত, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড, বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। এরপর আগস্টেও তিনি ডিসেম্বরকে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সময় হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে ঘোষণার পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক আলোচনা এবং বাস্তবে কী ঘটবে—দুটি বিষয় এক নয়। তিনি কবে, কীভাবে দেশে ফিরবেন, ফেরার পর সরকার ও আদালতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কী পদক্ষেপ নেবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।

এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাস্তবায়িত হলে পাঁচটি ক্ষেত্রে বিশেষ পরিবর্তনের প্রশ্ন সামনে আসছে।

আদালতের সিদ্ধান্তই হতে পারে প্রথম বড় বিষয়

দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হবে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর আইনি অবস্থান।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ২০২৫ সালের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এরপর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল না করায় তার আপিলের সুযোগ নিয়ে আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ফলে দেশে ফিরলে আদালতের রায় ও নির্দেশনার আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটি সামনে আসবে। তবে সেই পদক্ষেপ আগে থেকেই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়; সংশ্লিষ্ট আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াই এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হবে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা অন্যান্য মামলাও। ২০২৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারা দেশে ৬৬৩টি মামলা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায় হলেও এসব মামলার কার্যক্রম নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়ায় চলবে।

অর্থাৎ দেশে ফেরার ঘটনা ঘটলে আদালতে আত্মসমর্পণ, গ্রেপ্তার, বিচার এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ—সবগুলো বিষয়ই নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।

আওয়ামী লীগের সামনে উঠবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের জন্যও নতুন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বর্তমানে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। একই সময়ে দলটির অনেক নেতা-কর্মী বিভিন্ন মামলায় রয়েছেন এবং অনেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতারও ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।

এই অবস্থায় তার দেশে ফেরার বাস্তবতা দলটির নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে। তবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো বা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে এগোবে, সেটি এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

এখানে আইনগত পরিস্থিতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দলের রাজনৈতিক অবস্থানও বড় ভূমিকা রাখবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলেও আসতে পারে নতুন হিসাব

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রভাব আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকেও পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হতে পারে।

বিশেষ করে নির্বাচন, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের ভূমিকা—এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও কৌশল নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।

তবে কোনো দল কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়। কারণ এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বাস্তব পরিস্থিতি, সরকারের সিদ্ধান্ত এবং আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম।

সুতরাং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকটি এখনো অনুমাননির্ভর।

দিল্লির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের কাছে আইনি প্রক্রিয়ার অধীন।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসংক্রান্ত বিষয়টি আইনগত এবং প্রযোজ্য আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসারে তা বিবেচনা করা হবে।

এ কারণে শেখ হাসিনা যদি নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন, তাহলে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে তার প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা কী হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তব পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।

অর্থাৎ এখানে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, ভারতকে ঘিরে কূটনৈতিক প্রশ্নও সামনে থাকবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও পাবে আলাদা গুরুত্ব

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার আরেকটি দিক হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলা, আদালতের রায় এবং সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে দেশে ফেরার ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম কীভাবে এগোয় এবং আদালতের নির্দেশনা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।

তবে এখানেও আগাম কোনো নির্দিষ্ট পরিণতি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ শেখ হাসিনা বাস্তবে দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেবে এবং আদালতের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে—এসব বিষয় তখনই স্পষ্ট হবে।

পাসপোর্ট ও ভিসার বিষয়েও রয়েছে আলাদা প্রেক্ষাপট

শেখ হাসিনার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালেই। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সরকার শেখ হাসিনাসহ মোট ৯৭ জনের পাসপোর্ট বাতিলের কথা জানায়।

ভারতের ভিসা নিয়ে এর পরের সময়ে সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভারত শেখ হাসিনার ভিসা বাড়িয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

তবে শেখ হাসিনার বর্তমান নির্দিষ্ট ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস সম্পর্কে ভারতের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। তাই ২০২৫ সালের জানুয়ারির ভিসা-সংক্রান্ত তথ্যকে বর্তমান ভিসার মেয়াদ হিসেবে উল্লেখ করা সঠিক হবে না।

পাঁচটি ক্ষেত্রেই এখন মূল প্রশ্ন একটাই

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাধিক সম্ভাব্য পরিবর্তনের দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু কোনটি বাস্তবে ঘটবে, সেটি এখনই নিশ্চিত নয়।

তার দেশে ফেরার পর একদিকে আদালতের রায় ও অন্যান্য মামলার আইনি প্রক্রিয়া সামনে আসবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিএনপিসহ অন্য দলগুলোর কৌশল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত পুরো পরিস্থিতি নির্ভর করবে শেখ হাসিনা বাস্তবে দেশে ফেরেন কি না এবং ফেরার পর সরকার, আদালত, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। তাই ডিসেম্বরের ঘোষণাকে ঘিরে তৈরি হওয়া পাঁচটি সম্ভাব্য পরিবর্তন আপাতত আলোচনার বিষয় হলেও এর চূড়ান্ত রূপ সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।

FAQ

শেখ হাসিনা কবে বাংলাদেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন?

২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানান। পরে আগস্টেও তিনি ডিসেম্বরকে দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কতটি মামলা রয়েছে?

২০২৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারা দেশে ৬৬৩টি মামলা রয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় কী?

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ২০২৫ সালের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের অবস্থান কী?

বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বিষয়টি প্রযোজ্য আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে কী কী বিষয়ে প্রভাব পড়তে পারে?

আইনি প্রক্রিয়া, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিএনপিসহ অন্যান্য দলের কৌশল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক—এই পাঁচটি ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

আল-সাদ/

পাঠকের মতামত: