কয়েল-স্প্রে নয়, মশা তাড়াতে এই কাজটিই সবচেয়ে বেশি কার্যকর
সন্ধ্যা নামতেই কানের কাছে গুনগুন, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কামড়ের জ্বালা। মশা শুধু বিরক্তির কারণ নয়; ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া ও ফাইলেরিয়ার মতো রোগের বাহকও। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, মশা তাড়ানোর চেয়ে মশার জন্মস্থান ধ্বংস করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ। ঘর ও আশপাশে কয়েকটি সহজ অভ্যাস বদলালেই মশার উপদ্রব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
আগে জানুন, মশা বংশবিস্তার করে কোথায়
মশা ডিম পাড়ে জমে থাকা পানিতে। তাই বাসার ভেতরে-বাইরে পানি জমার প্রতিটি জায়গাই সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্র। বিশেষ করে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। এর ডিম শুকনো অবস্থায়ও কয়েক মাস টিকে থাকতে পারে এবং পানি পেলেই আবার ফুটে বের হয়। আর কিউলেক্স মশা সাধারণত নোংরা পানি, নর্দমা ও ডোবায় বংশবিস্তার করে।
প্রথম কাজ: উৎস নির্মূল
সপ্তাহে অন্তত একবার এসব জায়গা পরীক্ষা করুন:
ফুলের টব ও টবের নিচের পানির ট্রে
ছাদ ও বারান্দায় পড়ে থাকা পুরোনো টায়ার, বালতি, ড্রাম, ভাঙা পাত্র
এয়ার কন্ডিশনার ও রেফ্রিজারেটরের নিচে জমা পানির ট্রে
নারকেলের খোসা, ডাবের খোলস, প্লাস্টিকের কৌটা ও বোতল
ছাদের কার্নিশ ও পানি নিষ্কাশনের নালা
গাছের গোড়ায় বা পাতার ভাঁজে জমা পানি
ব্যবহারের পানি জমিয়ে রাখলে পাত্র ঢাকনা দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে রাখুন। পাত্র বারবার ধুয়ে পানি পাল্টানো ভালো। এডিসের ডিম পাত্রের গায়ে লেগে থাকতে পারে, তাই শুধু পানি ফেললেই চলে না। পাত্রের গা ঘষে পরিষ্কার করা দরকার।
ঘরের ভেতরে সুরক্ষার ব্যবস্থা
জানালা-দরজায় নেট: মশা ঠেকানোর সবচেয়ে স্থায়ী উপায়গুলোর একটি হলো জানালা, দরজা ও ভেন্টিলেটরে সূক্ষ্ম তারের জালি লাগানো। জালি ছিঁড়ে গেলে দ্রুত মেরামত করুন।
মশারি: ঘুমের সময় মশারি এখনো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ সুরক্ষা। কীটনাশক-মিশ্রিত মশারি আরও কার্যকর, তবে ব্যবহারের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। মনে রাখতে হবে, এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় কামড়ায়, বিশেষ করে ভোরে ও বিকেলে। তাই শিশু ও অসুস্থদের দিনের ঘুমেও মশারি ব্যবহার করা ভালো।
ঘর গোছানো রাখুন: মশা অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে জায়গায় লুকিয়ে থাকে। খাটের নিচ, পর্দার আড়াল, আলমারির পেছন ও ঝুলিয়ে রাখা কাপড়ের ভাঁজে এরা বিশ্রাম নেয়। এসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন এবং ব্যবহৃত কাপড় ঝুলিয়ে না রাখুন।
আরও পড়ুন:
বাথরুম পরিষ্কারের পরও দুর্গন্ধ? জেনে নিন করণীয়
জুতার দুর্গন্ধে বিব্রত? সহজ ৫ উপায়ে মিলবে মুক্তি
ফ্যান ও বাতাস চলাচল: মশা দুর্বল উড়ন্ত পতঙ্গ। ঘরে ফ্যান চললে বাতাসের প্রবাহে মশার পক্ষে মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
শরীরের সুরক্ষা
হালকা রঙের ঢিলেঢালা, পুরো হাতা ও পুরো পায়ের পোশাক পরুন
ত্বকে মশা প্রতিরোধী লোশন বা স্প্রে ব্যবহার করুন। ডব্লিউএইচও ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও
প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) ডিইইটি, পিকারিডিন বা লেমন ইউক্যালিপটাস অয়েলের মতো উপাদানযুক্ত
রিপেলেন্টকে কার্যকর বলে উল্লেখ করেছে
শিশুদের ক্ষেত্রে রিপেলেন্ট ব্যবহারের আগে লেবেলের নির্দেশনা দেখুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের
পরামর্শ নিন
কয়েল, স্প্রে ও ঘরোয়া উপায়: কতটা ভরসা
মশার কয়েল ও স্প্রে: তাৎক্ষণিকভাবে মশা তাড়াতে বা মারতে সহায়ক হলেও এগুলোর ধোঁয়া ও রাসায়নিক শ্বাসতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বদ্ধ ঘরে, বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও হাঁপানির রোগীর কাছে কয়েল জ্বালানো ঝুঁকিপূর্ণ। স্প্রে ব্যবহারের পর কিছুক্ষণ ঘর খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
ঘরোয়া টোটকা: কর্পূর, নিমপাতার ধোঁয়া, লেবু-লবঙ্গ বা তুলসী গাছের মতো ঘরোয়া উপায় নিয়ে প্রচলিত ধারণা অনেক। তবে এসবের বেশির ভাগই সীমিত সময়ের জন্য কিছুটা মশা দূরে রাখতে পারে বলে মনে করা হয়। গবেষণায় এগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত ও দীর্ঘস্থায়ী প্রমাণিত নয়। তাই এগুলোকে মশারি বা জালির বিকল্প ভাবা ঠিক হবে না। কর্পূর বদ্ধ ঘরে ব্যবহারে বিষক্রিয়ার ঝুঁকিও থাকে, বিশেষত শিশুদের জন্য।
গাছ লাগিয়ে মশা তাড়ানো: শুধু গাছ রাখলেই ঘর মশামুক্ত হয়ে যায় না। উল্টো টবে পানি জমলে সেখানেই মশা জন্মাতে পারে।
বাড়ির বাইরে ও পাড়ায় করণীয়
বাড়ির চারপাশের ঝোপঝাড় ও আগাছা পরিষ্কার রাখুন
নর্দমা ও ড্রেনে যেন পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করুন
নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমতে দেবেন না
স্থানীয় সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করুন
প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালান, কারণ একটি বাসা পরিষ্কার
রাখলেও পাশের বাসায় মশা
জন্মালে ঝুঁকি থেকেই যায়
ডেঙ্গুর লক্ষণ চিনে রাখুন
হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গাঁটে ব্যথা, ত্বকে র্যাশ ও বমি বমি ভাব ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গ। জ্বরের সঙ্গে নিচের লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে:
তীব্র পেটব্যথা বা বারবার বমি
মাড়ি বা নাক থেকে রক্তপাত
বমি বা মলের সঙ্গে রক্ত
অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
শ্বাসকষ্ট
জ্বর হলে নিজে নিজে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে কিছু ব্যথানাশক রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বর কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শমতো প্যারাসিটামল গ্রহণ ও প্রচুর তরল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
(বি.দ্র.: এই প্রতিবেদন সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।)
প্রাসঙ্গিক FAQ
প্রশ্ন ১: ঘরে মশা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?
উত্তর: মশার বংশবিস্তারের উৎস নির্মূল করাই সবচেয়ে কার্যকর। ফুলের টব, বালতি, এসির ট্রে ও অন্যান্য পাত্রে জমা পানি নিয়মিত ফেলে পাত্র পরিষ্কার করতে হবে। এর সঙ্গে জানালায় জালি ও ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করলে সুরক্ষা আরও বাড়ে।
প্রশ্ন ২: এডিস মশা কখন কামড়ায়?
উত্তর: এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় কামড়ায়। ভোরে ও সূর্যাস্তের আগে এদের তৎপরতা বেশি থাকে। তাই দিনের বেলাতেও সুরক্ষা নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন ৩: মশার কয়েল কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?
উত্তর: বদ্ধ ঘরে কয়েল জ্বালালে এর ধোঁয়া শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। শিশু, বয়স্ক ও হাঁপানির রোগীদের জন্য ঝুঁকি বেশি। কয়েল ব্যবহার করলে ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা ভালো।
প্রশ্ন ৪: ঘরোয়া টোটকায় কি মশা পুরোপুরি তাড়ানো যায়?
উত্তর: না। নিমপাতার ধোঁয়া বা লেবু-লবঙ্গের মতো উপায় সীমিত সময়ের জন্য কিছুটা কাজ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য সুরক্ষার জন্য প্রজননক্ষেত্র নির্মূল, জালি ও মশারিই মূল ভরসা।
প্রশ্ন ৫: ডেঙ্গু সন্দেহ হলে প্রথমে কী করা উচিত?
উত্তর: দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হবে। নিজে নিজে ব্যথানাশক ওষুধ না খেয়ে প্রচুর তরল পান ও বিশ্রামে থাকা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মানা জরুরি। রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- Honor Win RT2: ১২,০৭০mAh ব্যাটারির গেমিং ফোন
- সব ওয়ারিশের নাম খতিয়ানে নেই? জমির কী হবে জানুন
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ১টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- নতুন Pulsar N250: ৫টি রাইডিং মোড ও ৬-স্পিড গিয়ার
- OnePlus Ace 7: ১৮৫Hz ডিসপ্লে ও ৯০০০mAh ব্যাটারি!
- Suzuki V-Strom SX 250: ইঞ্জিন, মাইলেজ ও দাম
- iQOO Neo 12: ৯০০০mAh ব্যাটারি ও ১৮৫Hz ডিসপ্লে
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ১৫টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- পুরনো জমির মালিক কে ছিলেন? জানুন তথ্য বের করার উপায়
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ৪টি দেশের টাকার বিনিময় হার