ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

শেয়ারবাজারে এখন বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ, কী বলছে হিসাব?

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২১ ১৭:৫২:০৩
শেয়ারবাজারে এখন বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ, কী বলছে হিসাব?

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ২০২৬ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও অস্থিরতা বেড়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৭৬২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু অর্থবছরের পরবর্তী সময়ে বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরে রাখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই মাসের পরিসংখ্যান এবং অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ের বাজার প্রতিবেদনে সূচকের ওঠানামা ও লেনদেনের দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। ফলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও ঝুঁকি বিবেচনা না করে অর্থ বিনিয়োগ করা এখনো সমীচীন নয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের প্রধান প্রশ্ন—বাংলাদেশের শেয়ারবাজার কি আবার ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি সামনে আরও দরপতন হতে পারে? গত বছরের বাজার পরিস্থিতি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উত্থান, চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ের সূচক এবং সাম্প্রতিক লেনদেন বিশ্লেষণ করলে বাজারের অবস্থান সম্পর্কে একটি তুলনামূলক ধারণা পাওয়া যায়। তবে বাজারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবে অনুমান করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা মুনাফা অর্জনের সুযোগ পান। তবে শেয়ারের দাম ওঠানামা করায় লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে।

ডিএসইর প্রকাশিত বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৫ হাজার ২১৬ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট। ২০২৫ সালের শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৬৫ দশমিক ৩৪ পয়েন্টে। অর্থাৎ ২০২৫ সালে সূচক কমেছিল ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এর আগে ২০২৪ সালেও সূচক ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছিল।

পরপর দুই বছরে সূচকের পতন বিনিয়োগকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজারে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার দেখা যায়।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএসইএক্স প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ৫ হাজার ৭৬২ পয়েন্টে দাঁড়ায়। একই সময়ে ডিএসইর প্রধান ৩০টি কোম্পানির সূচক ডিএস-৩০ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৭৮ পয়েন্টে পৌঁছায়।

অর্থবছরের শেষ দিকে বাজারের মোট মূলধনও বেড়েছিল। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজারের মোট মূলধন প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে মোট লেনদেনের পরিমাণ আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজারে লেনদেন ও সূচক—দুই ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছিল। তবে অর্থবছরের এই সাফল্যকে বর্তমান বাজারের নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ পরবর্তী সময়ে সূচক ও লেনদেনে আবারও দুর্বলতা দেখা গেছে।

গত এক বছরে শেয়ারবাজারের উত্থান-পতন

গত এক বছরের বাজার পরিস্থিতি বুঝতে ২০২৫ সালের দরপতন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুনরুদ্ধার আলাদাভাবে দেখা জরুরি। কারণ ক্যালেন্ডার বছর ও অর্থবছরের সময়সীমা এক নয়।

২০২৫ সালের শেষে ডিএসইএক্স ছিল ৪ হাজার ৮৬৫ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ কার্যদিবসে, অর্থাৎ ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে সূচক দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৬২ পয়েন্টে। এতে অর্থবছরজুড়ে সূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা যায়।

তবে জুলাই মাসে সূচক আরও বেড়ে ৫ হাজার ৮৯৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে পৌঁছায় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই ২০২৬-এর পুঁজিবাজার পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। একই মাসে ডিএসইতে লেনদেনের মোট মূল্য আগের মাসের তুলনায় ০ দশমিক ৭০ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ সূচক বাড়লেও লেনদেনের গতিতে একই ধরনের উন্নতি দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন:৪২ টাকা থেকে ১১ টাকায় শেয়ারের দর, জেড ক্যাটাগরিতে যাচ্ছে কোম্পানি

পরবর্তী মাসগুলোতে বাজারের পরিস্থিতি আরও ওঠানামাপূর্ণ হয়ে ওঠে। অক্টোবরের ১৭ তারিখে ডিএসইএক্স ১৮ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪৩৩ দশমিক ১৭ পয়েন্টে নেমে আসে। ওই দিন ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩১৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা সাড়ে নয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অক্টোবরের ১৯ তারিখে সূচক কিছুটা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৪৫১ পয়েন্টে পৌঁছায়। তবে এই এক দিনের উত্থানকে বাজারের স্থায়ী পুনরুদ্ধারের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।

গত ছয় মাসে বাজারের পরিস্থিতি কেমন ছিল?

গত ছয় মাসের বাজার বিশ্লেষণে সূচকের উত্থান, লেনদেনের পরিবর্তন এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের মে মাসের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই মাসে ডিএসইএক্স আগের মাসের তুলনায় ০ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু একই সময়ে মোট লেনদেনের মূল্য আগের মাসের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমে যায়। লেনদেনের পরিমাণও ২৩ দশমিক ০৪ শতাংশ কমেছিল।

এতে বোঝা যায়, সূচক বাড়লেই বাজারে সব সময় লেনদেনের গতি বাড়ে না। বাজারের স্থায়িত্ব মূল্যায়ন করতে সূচকের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও দেখা জরুরি।

জুন মাসের শেষ দিকে ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৭৬২ পয়েন্টে পৌঁছায়। জুলাই মাসে সূচক আরও বেড়ে ৫ হাজার ৮৯৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। কিন্তু অক্টোবরের ১৭ তারিখে তা নেমে আসে ৫ হাজার ৪৩৩ দশমিক ১৭ পয়েন্টে।

অর্থাৎ জুলাইয়ের শেষের সূচকের তুলনায় অক্টোবরের ১৭ তারিখে ডিএসইএক্স প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ কম ছিল। এই তুলনা বাজারে সাম্প্রতিক দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।

তবে সূচকের পতন মানেই সব কোম্পানির শেয়ারের দাম একই হারে কমেছে, এমন নয়। কোনো কোনো কোম্পানির শেয়ার বেড়েছে, আবার অন্যগুলোর দাম কমেছে। তাই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সামগ্রিক সূচকের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কোম্পানির আর্থিক অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।

গত তিন মাসে শেয়ারবাজারে কী পরিবর্তন এসেছে?

গত তিন মাসে বাজারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, সূচকের উত্থানের তুলনায় পরবর্তী সময়ে পতনের চাপ বেড়েছে।

জুলাই মাসে ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৮৯৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে পৌঁছেছিল। এরপর অক্টোবরের ১৭ তারিখে সূচক নেমে আসে ৫ হাজার ৪৩৩ দশমিক ১৭ পয়েন্টে। এই দুই সময়ের তুলনায় সূচক প্রায় ৪৬২ পয়েন্ট বা ৭ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ১৭ অক্টোবর মাত্র ৩১৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। এর দুই দিন পর সূচক কিছুটা বাড়লেও সামগ্রিক বাজারে স্থায়ী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ফিরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নতুন বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, শেয়ারের মূল্যায়ন এবং বাজারের সামগ্রিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করেন। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি লেনদেনে অভ্যস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারের অস্থিরতা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

শেয়ারবাজারে দরপতনের পেছনে কী কী বিষয় গুরুত্বপূর্ণ?

শেয়ারবাজারে সূচক কমার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। তবে কোনো একটি কারণকে সব দরপতনের জন্য দায়ী করা ঠিক নয়। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

কোম্পানির মুনাফা ও আর্থিক ফলাফল

তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয়, মুনাফা, ঋণ এবং নগদ অর্থের প্রবাহ শেয়ারের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো কোম্পানির মুনাফা কমে গেলে বা আর্থিক অবস্থার অবনতি হলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা

বাজারে স্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম এবং কোম্পানির সঠিক তথ্য প্রকাশ বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা নতুন অর্থ বিনিয়োগে সতর্ক হতে পারেন।

সুদের হার ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি

সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, ঋণের ব্যয় এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ শেয়ারবাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। সুদের হার বেশি থাকলে কিছু বিনিয়োগকারী শেয়ারের পরিবর্তে তুলনামূলক নির্দিষ্ট আয়ের বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তবে এর প্রভাব সব সময় একই রকম হয় না।

লেনদেনের পরিমাণ ও বিক্রির চাপ

সূচক কমার সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও কমে গেলে বাজারে অংশগ্রহণ দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। আবার বেশি লেনদেনের সঙ্গে সূচক কমলে তা সক্রিয় বিক্রির চাপ নির্দেশ করতে পারে। তাই লেনদেনের পরিমাণকে সূচকের পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা কতটা নিরাপদ?

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখানে মূলধন হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে। তাই শেয়ারবাজারকে পুরোপুরি নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম বলা যায় না।

বিনিয়োগের ঝুঁকি নির্ভর করে কোন কোম্পানির শেয়ার কেনা হচ্ছে, কী দামে কেনা হচ্ছে, কত দিন বিনিয়োগ ধরে রাখা হবে এবং বিনিয়োগকারী কতটা লোকসান সহ্য করতে পারবেন—এসব বিষয়ের ওপর।

যে কোম্পানির ব্যবসা স্থিতিশীল, আর্থিক প্রতিবেদন স্বচ্ছ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক ভালো, সেই কোম্পানির শেয়ার বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে ভালো কোম্পানির শেয়ারও অতিরিক্ত দামে কেনা হলে লোকসানের ঝুঁকি থাকে।

নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

১. কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই করুন। শেয়ার কেনার আগে কোম্পানির আয়, মুনাফা, ঋণ, নগদ প্রবাহ এবং লভ্যাংশের ইতিহাস দেখুন।

২. সব অর্থ এক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবেন না। বিভিন্ন কোম্পানি ও উপযুক্ত সম্পদশ্রেণিতে বিনিয়োগ ভাগ করে রাখলে নির্দিষ্ট একটি বিনিয়োগের ঝুঁকি কিছুটা কমানো যেতে পারে। তবে এতে বাজারের সামগ্রিক ঝুঁকি দূর হয় না।

৩. গুজবের ভিত্তিতে শেয়ার কিনবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অযাচাইকৃত তথ্য বা দ্রুত লাভের প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে কোম্পানির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর নির্ভর করুন।

৪. ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে সতর্ক থাকুন। ধার করা অর্থ বা মার্জিন সুবিধা ব্যবহার করে শেয়ার কিনলে বাজার পড়ে যাওয়ার সময় ক্ষতি আরও বেড়ে যেতে পারে।

৫. জরুরি প্রয়োজনের টাকা বিনিয়োগ করবেন না। চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসাভাড়া বা দৈনন্দিন ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ শেয়ারবাজারে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করুন।

এখন কি শেয়ার কেনার উপযুক্ত সময়?

বর্তমান পরিসংখ্যান থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে এখনই শেয়ার কেনা উচিত, অথবা বাজার আরও কমবে বলে সব বিনিয়োগ স্থগিত রাখা উচিত। বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের কয়েকটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করা দরকার।

প্রথমত, ডিএসইএক্স ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে কি না, তা দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, সূচক বৃদ্ধির সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে কি না, সেটি বিবেচনা করা জরুরি। তৃতীয়ত, যে কোম্পানির শেয়ার কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, তার সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন ও শেয়ারের মূল্যায়ন যাচাই করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা আর্থিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানি ও যুক্তিসংগত মূল্যায়নের শেয়ার খুঁজে দেখতে পারেন। একবারে পুরো অর্থ বিনিয়োগ না করে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করার কৌশলও বিবেচনা করা যায়। তবে এই পদ্ধতিতেও লোকসানের ঝুঁকি থাকে।

অন্যদিকে, স্বল্পমেয়াদে দ্রুত লাভের আশায় ঘন ঘন শেয়ার কেনাবেচা করলে বাজারের অস্থিরতার কারণে ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

সামনে শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ কী?

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল, বিনিয়োগকারীদের আস্থা, বাজারে লেনদেনের ধারাবাহিকতা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

কোম্পানির মুনাফা বাড়লে, আর্থিক প্রতিবেদন স্বচ্ছ হলে এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে উন্নত হলে বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হতে পারে। বিপরীতে, দুর্বল আর্থিক ফলাফল, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা বিক্রির চাপ বাড়লে আবারও সূচকের পতন ঘটতে পারে।

তবে বাজারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। সূচকের সাম্প্রতিক উত্থান বা পতনকে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় না ধরে কোম্পানির মৌলিক অবস্থা ও নিজের ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই যুক্তিসংগত।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ২০২৫ সালের দরপতনের পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ওই অর্থবছরে ডিএসইএক্স প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছিল এবং লেনদেনের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরে রাখা যায়নি। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সূচকের পতন ও লেনদেনের দুর্বলতা বাজারের অনিশ্চয়তা আবারও সামনে এনেছে।

তাই বর্তমানে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা, কোম্পানির মৌলিক বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। শুধু সূচক বেড়েছে বা কমেছে—এই একটি তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। শেয়ারবাজারে লাভের নিশ্চয়তা নেই এবং বিনিয়োগ করা অর্থের একটি অংশ বা সম্পূর্ণ অর্থ হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের অবস্থা কী?

২০২৫-২৬ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য উত্থানের পর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা গেছে। ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৪৩৩ দশমিক ১৭ পয়েন্ট। ১৯ অক্টোবর সূচক কিছুটা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৪৫১ পয়েন্টে পৌঁছায়।

২. বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এখন বিনিয়োগ করা কি নিরাপদ?

বিনিয়োগ করা সম্ভব, তবে মূলধন হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, শেয়ারের মূল্যায়ন এবং নিজের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

৩. ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার কতটা বেড়েছিল?

প্রকাশিত বাজার পর্যালোচনা অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ডিএসইএক্স প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ৫ হাজার ৭৬২ পয়েন্টে দাঁড়ায়।

৪. শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে কি নিশ্চিতভাবে লাভ করা যায়?

না। শেয়ারবাজারে লাভের নিশ্চয়তা নেই। কোম্পানির ব্যবসায়িক ফলাফল, বাজারের পরিস্থিতি এবং শেয়ার কেনার দামের ওপর বিনিয়োগের ফল নির্ভর করে।

৫. নতুন বিনিয়োগকারীদের কীভাবে শুরু করা উচিত?

প্রথমে শেয়ারবাজার সম্পর্কে শেখা, নিয়ন্ত্রিত ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে হিসাব খোলা, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই করা এবং নিজের ক্ষতি সহ্য করার সামর্থ্য অনুযায়ী বিনিয়োগ করা উচিত। গুজব বা দ্রুত লাভের আশায় সিদ্ধান্ত নেওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: