ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

কম বেতনেও মাস চলবে স্বস্তিতে, জেনে নিন বাজেটের এই কৌশল

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২২ ১২:৩৬:০০
কম বেতনেও মাস চলবে স্বস্তিতে, জেনে নিন বাজেটের এই কৌশল

মাসের প্রথম সপ্তাহে বেতন ঢোকে, আর দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বাড়িভাড়া, বাজার, যাতায়াত, চিকিৎসা, সন্তানের খরচ, সব মিলিয়ে অনেক পরিবারের জন্যই কম আয়ে মাস পার করা প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ। অর্থ ও ব্যক্তিগত বাজেট বিষয়ক পরামর্শদাতারা বলছেন, আয় সীমিত হলেও কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে এই চাপ অনেকটা কমানো সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, আগে জানতে হবে টাকা আসলে কোথায় যাচ্ছে।

প্রথম ধাপ: আয় ও খরচের পুরো ছবিটা দেখুন

বাজেটের শুরুতে প্রথম কাজ হলো মাসে হাতে আসা মোট আয় নির্ধারণ করা। বেতন ছাড়া অন্য কোনো আয় থাকলে তা-ও যোগ করতে হবে। এরপর খরচের তালিকা করুন। অন্তত এক মাস প্রতিটি খরচ লিখে রাখুন, চায়ের দোকানের ছোট খরচ থেকে বিদ্যুৎ বিল পর্যন্ত। অর্থ বিষয়ক পরামর্শদাতারা বলছেন, খরচ লিখে রাখলে কোথায় অপ্রয়োজনীয় টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে, তা দ্রুত ধরা পড়ে। এর জন্য খাতা, মোবাইলের নোট বা স্প্রেডশিট, যেকোনোটিই চলে।

খরচকে দুই ভাগে ভাগ করা সুবিধাজনক:

নির্দিষ্ট খরচ: বাড়িভাড়া, কিস্তি, স্কুলের বেতনের মতো যা প্রতি মাসে প্রায় একই থাকে

পরিবর্তনশীল খরচ: বাজার, যাতায়াত, মোবাইল রিচার্জ, চিকিৎসার মতো যা মাসে মাসে বদলায়

দ্বিতীয় ধাপ: আগে প্রয়োজন, পরে চাহিদা

বাজেটের একটি বহুল প্রচলিত কাঠামো হলো ৫০/৩০/২০ নিয়ম। এতে আয়ের ৫০ শতাংশ যায় প্রয়োজনীয় খরচে (থাকা, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা), ৩০ শতাংশ শখ ও বিনোদনের মতো অপ্রয়োজনীয় খরচে এবং ২০ শতাংশ সঞ্চয় বা ঋণ পরিশোধে।

কম আয়ের ক্ষেত্রে এই অনুপাত মেলানো অনেক সময় বাস্তবসম্মত হয় না, কারণ আয়ের বড় অংশ প্রয়োজনীয় খরচেই চলে যায়। এ কারণে অর্থ বিষয়ক পরামর্শদাতারা ৬০/৩০/১০ বা ৭০/২০/১০-এর মতো ভিন্ন অনুপাতেরও কথা বলেন, যেখানে প্রয়োজনীয় খরচের ভাগ বেশি ও সঞ্চয়ের ভাগ কম। মূল কথা হলো, নিয়মটি আপনার পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়া। ২০ শতাংশ সঞ্চয় সম্ভব না হলে ৫ শতাংশ দিয়েও শুরু করা যায়। একেবারে না রাখার চেয়ে অল্প রাখাও ভালো।

তৃতীয় ধাপ: অপ্রয়োজনীয় খরচ ছাঁটুন

ছোট ছোট খরচ জমে বড় অঙ্ক হয়ে যায়। যেসব বিষয়ে নজর দেওয়া যেতে পারে:

অব্যবহৃত সাবস্ক্রিপশন বা প্যাকেজ: গত এক মাসে যা ব্যবহার করেননি, তা বাতিল করুন

বাইরে খাওয়া ও বারবার অনলাইন অর্ডার: বাড়িতে রান্না সাধারণত সাশ্রয়ী

হঠাৎ কেনাকাটা: অপ্রয়োজনীয় কিছু কেনার আগে ৩০ দিন অপেক্ষার নিয়ম অনেকে কাজে লাগান। এতে আবেগে কেনাকাটা কমে

ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ফি: বারবার লেনদেনে ছোট চার্জ নীরবে জমে যায়

তবে বিশেষজ্ঞরা এ-ও বলছেন, শুধু একটি সাবস্ক্রিপশন বা এক বেলা বাইরের খাবার বন্ধ করে বড় পরিবর্তন আসে না। সবচেয়ে বড় খরচগুলো, যেমন বাসাভাড়া ও ঋণের কিস্তির দিকে নজর দিলে প্রভাব বেশি পড়ে।

চতুর্থ ধাপ: ছোট একটি জরুরি তহবিল গড়ুন

হঠাৎ অসুস্থতা, বাড়ির কোনো জরুরি মেরামত বা চাকরি হারানোর মতো ঘটনায় হাতে টাকা না থাকলে ধার বা ঋণের ঝুঁকি বাড়ে। কম আয়ের মানুষের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। সাধারণ পরামর্শ হলো তিন থেকে ছয় মাসের মূল খরচের সমান জরুরি তহবিল গড়ে তোলা। তবে কম আয়ে এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। তাই ছোট অঙ্ক দিয়ে শুরু করাই বাস্তবসম্মত। কিছু আর্থিক পরামর্শদাতা প্রথম লক্ষ্য হিসেবে এমন একটি অঙ্ক বেছে নিতে বলেন, যা অল্পস্বল্প জরুরি খরচ সামলাতে পারে। এই টাকা আলাদা অ্যাকাউন্টে রাখলে খরচ করে ফেলার প্রবণতা কমে।

পঞ্চম ধাপ: বেতন পাওয়ার দিনই সঞ্চয় আলাদা করুন

মাসের শেষে যা বাঁচে, তা সঞ্চয় করব, এই ভাবনায় সঞ্চয় প্রায়ই হয়ে ওঠে না। উল্টো পদ্ধতিটি বেশি কার্যকর বলে মনে করা হয়: বেতন হাতে আসামাত্র নির্দিষ্ট একটি অঙ্ক আলাদা করে ফেলা, বাকি টাকায় মাস চালানো। সম্ভব হলে স্বয়ংক্রিয় স্থানান্তরের সুবিধা কাজে লাগানো যায়। বাজেট মেনে চলতে অনেকে 'খামের পদ্ধতি'ও ব্যবহার করেন, যেখানে মাসের শুরুতে টাকা বিভিন্ন খরচের খাতে আলাদা করে রাখা হয়।

ষষ্ঠ ধাপ: ঋণ থাকলে আগে সামাল দিন

ঋণ থাকলে এর সুদ বা কিস্তির চাপ বাজেটের বড় অংশ খেয়ে ফেলে। অর্থ বিষয়ক পরামর্শদাতারা বলছেন, বাজেটে ঋণ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া ও সুদের হার বেশি এমন ঋণ আগে মেটানোর চেষ্টা করা উচিত। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে ভালো করে হিসাব কষে নিন, নইলে ঋণের চক্রে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

সপ্তম ধাপ: আয়ের পথ বাড়ানোর কথা ভাবুন

বাজেট ও খরচ কমানো একটি সীমা পর্যন্ত কাজ করে। আয় বাড়াতে পারলে সমস্যা অনেকটা হালকা হয়। নিজের দক্ষতাকে অতিরিক্ত আয়ে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা যায়, যেমন পড়ানো, লেখালেখি, অনুবাদ, ডিজাইন বা অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ালে ভবিষ্যতে ভালো বেতনের সুযোগও তৈরি হয়। কোনো আয়ের উৎসে টাকা দেওয়ার আগে তা নির্ভরযোগ্য কি না যাচাই করা জরুরি, কারণ 'সহজে বেশি আয়ের' প্রলোভনে প্রতারণার ঘটনাও ঘটে।

মাসে একবার হিসাব মিলিয়ে নিন

আয় ও খরচ সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই বাজেটও স্থির থাকে না। প্রতি মাসের শেষে কত খরচ হলো, কোথায় বেশি গেল ও কোন পরিকল্পনা কাজ করল, তা মিলিয়ে নিলে পরের মাসের পরিকল্পনা আরও বাস্তবসম্মত হয়।

আরও পড়ুন:

রাতে ঘুম আসছে না? বিছানায় শুয়ে থাকা বড় ভুল, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয় কেন? জেনে নিন সমাধান

কম বেতনে মাস চালানোর কোনো জাদুকরী সূত্র নেই। তবে খরচ লিখে রাখা, প্রয়োজনকে আগে রাখা, ছোট হলেও সঞ্চয় নিয়মিত করা এবং আয়ের নতুন পথ খোঁজা, এই কয়েকটি অভ্যাস ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদন সাধারণ তথ্যের জন্য। বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ বা ঋণ নেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য আর্থিক পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলুন।)

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. কম আয়ে প্রথমে কোন কাজটি করা উচিত?

প্রথমে মাসে হাতে আসা মোট আয় ও সব খরচের হিসাব লিখে ফেলুন। অন্তত এক মাস খরচ লিখে রাখলে কোথায় টাকা যাচ্ছে, তা পরিষ্কার হবে।

২. ৫০/৩০/২০ নিয়ম কী?

এটি একটি বাজেট কাঠামো, যেখানে আয়ের ৫০ শতাংশ প্রয়োজনীয় খরচে, ৩০ শতাংশ অপ্রয়োজনীয় খরচে ও ২০ শতাংশ সঞ্চয় বা ঋণ পরিশোধে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কম আয়ে প্রয়োজনীয় খরচের ভাগ বেশি রেখে অনুপাত মানিয়ে নেওয়া যায়।

৩. কম বেতনে কি সত্যিই সঞ্চয় সম্ভব?

সম্ভব, তবে ছোট থেকে শুরু করতে হবে। ২০ শতাংশ সম্ভব না হলে ৫ শতাংশ দিয়েই শুরু করুন। বেতন পাওয়ার পরপরই সঞ্চয়ের অংশ আলাদা করে ফেলা বেশি কার্যকর।

৪. জরুরি তহবিল কতটা থাকা উচিত?

সাধারণ পরামর্শ তিন থেকে ছয় মাসের মূল খরচের সমান। কম আয়ে এটি গড়তে সময় লাগে, তাই ছোট অঙ্ক দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বাড়ানো যায়।

৫. ঋণ থাকলে বাজেট কীভাবে করব?

ঋণের কিস্তি বাজেটে অগ্রাধিকার দিন এবং সুদের হার বেশি এমন ঋণ আগে মেটানোর চেষ্টা করুন। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে পরিশোধের সামর্থ্য ভালো করে হিসাব করে নিন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ