‘ফাঁসি হলেও আওয়ামী লীগ করব’, প্রিজনভ্যান থেকে তুহিন
আদালতে শুনানি শেষ। চার নারী আসামিকে নিয়ে প্রিজনভ্যান তখন আদালত প্রাঙ্গণ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক সেই সময় ভেতর থেকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে কথা বলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করাকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এই দলের রাজনীতি করার কারণে ফাঁসির সাজা হলেও তিনি আওয়ামী লীগ করেই যাবেন।
তুহিনসহ চার নারী আসামিকে এদিন আদালতে হাজির করা হয়েছিল শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনের বিরুদ্ধে চলমান রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য। জয় বাংলা ব্রিগেডের একটি জুম মিটিংয়ে অংশ নেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘উৎখাত ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়েছে।
তবে বুধবার নির্ধারিত শুনানি শেষ পর্যন্ত হয়নি। ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মঈন উদ্দিন চৌধুরী ছুটিতে থাকায় ভারপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোসাদ্দেক মিনহাজ। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ১৫ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান বেঞ্চ সহকারী গোলাম নবী।
‘রাজনীতি করেছি, হত্যার সঙ্গে জড়িত নই’
প্রিজনভ্যানে ওঠার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করেন সাবিনা আক্তার তুহিন। তার বক্তব্যের মূল কথা ছিল—তারা কোনো হত্যাকাণ্ড বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন; তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে কেবল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততাকে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এলাকার মানুষ জানেন তারা কোনো অন্যায় করেননি। কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা হত্যার সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক নেই। তারা রাজনৈতিক দল করেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিলেন—এটাই তাদের পরিচয়।
তুহিন আরও বলেন, আওয়ামী লীগ করার কারণে যদি তাদের ফাঁসির সাজাও দেওয়া হয়, তবু তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করবেন। কতদিন তাদের কারাগারে রাখা হবে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, তারা রাজনীতি করেছেন এবং আওয়ামী লীগ করেছেন। তার দাবি, কোনো হত্যার ঘটনায় তারা জড়িত নন এবং কোনো অন্যায়ও করেননি।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়ার কথা বলেছেন। নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তুহিন জানান, তারা রাজনীতি করেছেন এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; এটিকে তিনি তার গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে দেখছেন।
এ সময় তুহিনের সঙ্গে থাকা অন্য তিন নারী আসামিও নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করেন। পরে চার নারীকে বহনকারী প্রিজনভ্যানটি আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে।
অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়েছিল জানুয়ারিতে
মামলাটিতে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদালতে শুনানি শুরু হয় গত ২১ জানুয়ারি। ওই শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে অংশ নেন ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী। তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পক্ষে বক্তব্য দেন।
মামলার ২৮৬ আসামির মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ২৪৬ জন পলাতক রয়েছেন।
এই মামলার আসামিদের তালিকায় আরও রয়েছেন খুলনার যুবলীগ নেতা পারভেজ খান ইমন, চট্টগ্রাম জয় বাংলা ব্রিগেডের প্রধান কবিরুল ইসলাম আকাশ এবং সংগঠনটির বরিশাল বিভাগের কামরুল ইসলাম। এছাড়া সোহানা পারভীন রুনা, হাফিজুর রহমান ইকবাল, মাহবুবুর রহমান মধু, এ কে এম আক্তারুজ্জামান, আল মারুফ, এলাহী নেওয়াজ মাছুম ও সাজ্জাদুল আনামের নামও রয়েছে।
৭৩ জনের বিরুদ্ধে শুরু, পরে আসামি ২৮৬
মামলাটির শুরুতে আসামির সংখ্যা ছিল ৭৩। শেখ হাসিনাসহ ওই ৭৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে গত বছরের ২৭ মার্চ আদালতে মামলা করেন সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার এনামুল হক।
তদন্তের পর মামলার পরিধি বাড়ে। একই বছরের ৩০ জুলাই তদন্ত শেষে শেখ হাসিনাসহ মোট ২৮৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন এনামুল হক।
অভিযোগপত্র আদালতে গ্রহণ করা হয় ১৪ অগাস্ট। ওই দিনই আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
এরপর ১১ সেপ্টেম্বর মামলার আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আর গত ১৪ অক্টোবর পলাতক আসামিদের আদালতে হাজির করার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিযোগ গঠনের শুনানি এখন নতুন তারিখে গড়িয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
FAQ
১. শেখ হাসিনাসহ কতজনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে?
শেখ হাসিনাসহ মোট ২৮৬ জনকে মামলাটিতে আসামি করা হয়েছে।
২. মামলাটির পরবর্তী শুনানি কবে?
অভিযোগ গঠনের বিষয়ে পরবর্তী শুনানি ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
৩. মামলার কতজন আসামি পলাতক রয়েছেন?
শেখ হাসিনাসহ ২৪৬ জন আসামি পলাতক রয়েছেন।
৪. মামলাটি কবে করা হয়েছিল?
শেখ হাসিনাসহ ৭৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গত বছরের ২৭ মার্চ মামলাটি করা হয়।
৫. সাবিনা আক্তার তুহিন কী দাবি করেছেন?
তিনি দাবি করেছেন, তারা কোনো অন্যায়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা তাদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার।
তানভির ইসলাম/