ঢাকা, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রতিদিন বাদাম খেলে শরীরে কী হয়? কতটা খাওয়া ভালো

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০২ ১৯:৫৪:৫৮
প্রতিদিন বাদাম খেলে শরীরে কী হয়? কতটা খাওয়া ভালো

প্রতিদিনের খাবারে অল্প পরিমাণ বাদাম যোগ করা শরীরের জন্য বেশ কিছু উপকার বয়ে আনতে পারে। কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট, পেস্তা কিংবা চিনাবাদামে থাকে প্রোটিন, ফাইবার, অসম্পৃক্ত চর্বি, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ। গবেষণায় নিয়মিত বাদাম খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কম থাকা এবং রক্তের কিছু ক্ষতিকর কোলেস্টেরল সূচকের উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে বাদাম যত বেশি, উপকারও তত বেশি—বিষয়টি এমন নয়। এটি ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার হওয়ায় পরিমাণের দিকে নজর রাখাও জরুরি।

সাধারণভাবে দিনে প্রায় এক মুঠো বা ২৮–৩০ গ্রাম বাদাম একটি ব্যবহারিক পরিমাণ হিসেবে ধরা হয়। তবে বাদামের ধরন, ব্যক্তির মোট খাদ্যতালিকা, ক্যালরির প্রয়োজন এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর উপযুক্ত পরিমাণ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই বাদামকে দেখা উচিত।

বাদামে কী কী পুষ্টি থাকে?

বাদামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অল্প পরিমাণ খাবারের মধ্যেই বেশ কিছু পুষ্টি পাওয়া যায়। এতে সাধারণত উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, ফাইবার, অসম্পৃক্ত চর্বি, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন ইসহ বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট থাকে। অবশ্য কোন বাদামে কোন পুষ্টি কতটা থাকবে, তা একেক ধরনের বাদামের ক্ষেত্রে আলাদা।

উদাহরণ হিসেবে, এক আউন্স বা প্রায় ২৮ গ্রাম কাঠবাদামে আনুমানিক ১৬৫ ক্যালরি, ৬ গ্রাম প্রোটিন, ১৪ গ্রাম চর্বি এবং ৩ গ্রাম ফাইবার থাকে। এর বেশির ভাগ চর্বিই মনো-আনস্যাচুরেটেড বা এক ধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি।

এই কারণেই বাদামকে শুধু ‘স্ন্যাকস’ হিসেবে না দেখে পুষ্টিকর খাবারের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

প্রতিদিন বাদাম খেলে শরীরে কী হতে পারে?

১. হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে

বাদাম খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি systematic review ও dose-response meta-analysis-এ ৩৩টি প্রকাশনা থেকে ৬৩টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে বেশি বাদাম খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্‌রোগ, করোনারি হার্ট ডিজিজ এবং হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তবে এসব গবেষণার বড় অংশ observational বা পর্যবেক্ষণভিত্তিক। অর্থাৎ বাদাম খাওয়াই একমাত্র কারণে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমেছে—এমন সিদ্ধান্ত এখান থেকে দেওয়া যায় না। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।

২. রক্তের কোলেস্টেরলের কিছু সূচকে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে

বাদামে থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রক্তের লিপিড প্রোফাইলের জন্য উপকারী হতে পারে। বাদাম ও বীজ নিয়ে একটি systematic review ও meta-analysis-এ বাদাম খাওয়ার সঙ্গে মোট কোলেস্টেরল ও LDL বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের মাত্রা কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তবে বাদাম খাওয়ার পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও পরিশোধিত খাবার বেশি থাকলে শুধু বাদাম খেয়ে সেই প্রভাব পুরোপুরি পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

৩. দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে

বাদামে প্রোটিন, ফাইবার ও চর্বি—তিন ধরনের উপাদানই থাকে। ফলে অল্প পরিমাণ বাদাম খেলে তুলনামূলকভাবে তৃপ্তি পাওয়া যেতে পারে।

এটি খাবারের মাঝে অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাকসের বদলে বাদাম বেছে নেওয়ার একটি কারণ হতে পারে। তবে বাদাম ক্যালরিসমৃদ্ধ হওয়ায় নিয়মিত খাবারের ওপর অতিরিক্ত হিসেবে অনেকটা খেলে মোট ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।

৪. খাদ্যতালিকায় স্বাস্থ্যকর চর্বি যোগ হয়

সব ধরনের চর্বি এক নয়। বাদামে থাকা চর্বির বড় অংশই অসম্পৃক্ত ধরনের, যা স্যাচুরেটেড ফ্যাটের তুলনায় হৃদ্‌স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসে বেশি উপযোগী।

তাই চিপস, মিষ্টি বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকসের বদলে পরিমিত বাদাম বেছে নেওয়া খাদ্যতালিকার সামগ্রিক মান উন্নত করতে পারে।

৫. ফাইবারের একটি ভালো উৎস হতে পারে

বাদামের ফাইবার অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সামগ্রিক খাদ্যমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ফাইবারযুক্ত খাবার দীর্ঘ সময় তৃপ্তি ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

তবে শুধু বাদামের ওপর ফাইবারের চাহিদা পূরণের চেষ্টা না করে শাকসবজি, ফল, ডাল ও পূর্ণ শস্যও খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি।

৬. কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়

বাদামের ধরনভেদে ভিটামিন ই, ম্যাগনেশিয়াম, কপার, ফসফরাসসহ বিভিন্ন পুষ্টি পাওয়া যায়। কাঠবাদাম বিশেষ করে ভিটামিন ই, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ফাইবারের উৎস।

আখরোটে উদ্ভিজ্জ উৎসের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (ALA) পাওয়া যায়, অন্যদিকে বিভিন্ন বাদামে পুষ্টির ধরন ও পরিমাণ ভিন্ন। তাই এক ধরনের বাদামের বদলে বৈচিত্র্য রাখা যেতে পারে।

দিনে কতটা বাদাম খাওয়া ভালো?

বেশির ভাগ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রায় ২৮–৩০ গ্রাম বাদাম দিনে একটি ব্যবহারিক পরিমাণ। এটি মোটামুটি এক ছোট মুঠোর কাছাকাছি। বাদাম ও বীজের স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে umbrella review-তেও প্রায় ২৮ গ্রাম দৈনিক বাদাম গ্রহণের সঙ্গে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তবে ২৮–৩০ গ্রাম কোনো বাধ্যতামূলক ‘মেডিকেল ডোজ’ নয়। কারও দৈনিক ক্যালরির চাহিদা কম হলে পরিমাণ আরও কম হতে পারে। আবার শারীরিক পরিশ্রম ও মোট খাদ্যতালিকার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।

একটি সহজ উপায় হলো বাদামকে আলাদা করে বাড়তি খাবার হিসেবে যোগ না করে বিস্কুট, মিষ্টি বা অন্য কম পুষ্টিকর স্ন্যাকসের জায়গায় পরিমিত পরিমাণে খাওয়া।

কোন বাদাম বেছে নেওয়া ভালো?

কাঠবাদাম, আখরোট, পেস্তা, কাজুবাদাম, চিনাবাদামসহ বিভিন্ন ধরনের বাদাম খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। একটিকে অন্যটির চেয়ে ‘অবশ্যই সেরা’ বলা ঠিক নয়, কারণ প্রতিটির পুষ্টিগুণ আলাদা।

সম্ভব হলে লবণ ছাড়া বা কম লবণযুক্ত এবং চিনি ছাড়া বাদাম বেছে নেওয়া ভালো। অতিরিক্ত লবণযুক্ত বাদাম নিয়মিত বেশি খেলে খাদ্যে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। একইভাবে চিনি, ক্যারামেল বা মিষ্টি আবরণ দেওয়া বাদাম অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরি যোগ করতে পারে।

ভাজা বাদাম কি খাওয়া যাবে?

শুকনো ভাজা বা হালকা ভাজা বাদামও খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। তবে তেল, লবণ বা চিনি বেশি যোগ করা প্যাকেটজাত বাদাম নিয়মিত খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো।

বাদাম কেনার সময় শুধু ‘বাদাম’ লেখা দেখলেই হবে না; প্যাকেটের উপাদান তালিকা ও পুষ্টি তথ্য দেখে অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা তেল যোগ করা হয়েছে কি না, সেটিও দেখা উচিত।

বেশি বাদাম খেলেও সমস্যা হতে পারে

বাদাম স্বাস্থ্যকর হলেও এটি ‘যত বেশি খাবেন তত ভালো’ ধরনের খাবার নয়। এর ক্যালরি ঘনত্ব বেশি। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বাদাম খেলে মোট ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।

এ ছাড়া বাদামে অ্যালার্জি থাকা ব্যক্তিদের জন্য এটি গুরুতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বাদাম খাওয়ার পর ঠোঁট বা মুখ ফুলে যাওয়া, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট, গলা বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি বা অন্য গুরুতর অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

ডায়াবেটিস থাকলে বাদাম খাওয়া যাবে?

ডায়াবেটিস থাকলেই বাদাম বাদ দিতে হবে—এমন নিয়ম নেই। বরং পরিমিত বাদাম একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে বাদাম কীভাবে ও কতটা খাওয়া হবে, তা ব্যক্তির সামগ্রিক খাদ্যতালিকা ও চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে।

বাদাম ও বীজ নিয়ে গবেষণায় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ফলাফল সবসময় একরকম নয়। তাই বাদামকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা চিকিৎসার ওষুধ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

প্রতিদিন বাদাম খাওয়ার সহজ নিয়ম

সকালের নাশতা, বিকেলের হালকা খাবার কিংবা সালাদের সঙ্গে অল্প বাদাম যোগ করা যায়। তবে একসঙ্গে অনেকটা খাওয়ার বদলে আগে থেকেই পরিমাণ ঠিক করে নেওয়া ভালো।

যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাদের জন্য বাদামের ক্যালরি হিসাবের মধ্যে রাখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর বাদামে অ্যালার্জি থাকলে বিকল্প পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে, প্রতিদিনের খাবারে প্রায় এক ছোট মুঠো বাদাম যোগ করা একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হতে পারে। কিন্তু এর উপকার পাওয়ার মূল বিষয় হলো পরিমিত পরিমাণ, কম প্রক্রিয়াজাত বাদাম এবং সামগ্রিকভাবে সুষম খাদ্যাভ্যাস। গবেষণায় বাদাম খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্‌স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ইতিবাচক ফলাফলের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, বাদাম কোনো রোগের একক চিকিৎসা নয়।

FAQ

প্রশ্ন: প্রতিদিন কতটা বাদাম খাওয়া ভালো?

উত্তর: সাধারণভাবে দিনে প্রায় ২৮–৩০ গ্রাম বা এক ছোট মুঠো বাদাম একটি ব্যবহারিক পরিমাণ। তবে ব্যক্তির ক্যালরির প্রয়োজন ও খাদ্যতালিকা অনুযায়ী পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রশ্ন: প্রতিদিন বাদাম খেলে কি ওজন কমে?

উত্তর: বাদাম পেট ভরা রাখতে সহায়তা করতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। কিন্তু বাদাম নিজে ওজন কমানোর খাবার নয়। এতে ক্যালরি বেশি থাকায় অতিরিক্ত খেলে বরং মোট ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন: হৃদ্‌রোগের জন্য বাদাম কি ভালো?

উত্তর: গবেষণায় নিয়মিত বাদাম খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্‌রোগ ও হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রমাণের ওপর নির্ভর করে এবং বাদাম কোনো হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা নয়।

প্রশ্ন: লবণ দেওয়া বাদামের বদলে কোনটি ভালো?

উত্তর: সম্ভব হলে লবণ ছাড়া বা কম লবণযুক্ত বাদাম বেছে নেওয়া ভালো। এতে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের ঝুঁকি কম থাকে। চিনি বা মিষ্টি আবরণ দেওয়া বাদামও নিয়মিত খাওয়ার ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা ভালো।

প্রশ্ন: ডায়াবেটিস থাকলে বাদাম খাওয়া যাবে?

উত্তর: সাধারণভাবে বাদাম সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে বাদাম ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নয় এবং পরিমাণ ও খাদ্যতালিকা ব্যক্তিভেদে নির্ধারণ করা উচিত। বাদাম ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ে গবেষণার ফলও সব ক্ষেত্রে একরকম নয়।

তথ্যসূত্র: সাম্প্রতিক systematic review ও meta-analysis, PubMed-indexed গবেষণা এবং Harvard T.H. Chan School of Public Health-এর পুষ্টি তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ