লাওসে ভিসা বন্ধ
ভিসা বন্ধ, পাসপোর্ট ও টাকা জমা নিয়ে সরকারের সতর্কতা
লাওসে চাকরির জন্য যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন বাংলাদেশি কর্মীদের এখন বাড়তি সতর্ক হতে বলেছে সরকার। দেশটিতে বাংলাদেশিদের শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট এবং শ্রমিক শ্রেণির ভিসা ইস্যু ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত থাকায় কর্মসংস্থানের নামে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট জমা না দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আপাতত কোনো আর্থিক লেনদেন না করারও পরামর্শ দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে লাওসে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট এবং শ্রমিক শ্রেণির ভিসা—এলএ-বি২—ইস্যুসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চার মাসের এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ৩১ ডিসেম্বর।
এই পরিস্থিতিতে ভুয়া ভিসা কিংবা অননুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারণার শিকার না হতে কর্মীদের সতর্ক করেছে সরকার।
চাকরির আশ্বাসে পাসপোর্ট দেবেন না
বর্তমানে লাওসে কর্মী পাঠানোর ওপর স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকায় নতুন করে কর্মসংস্থানের প্রস্তাব নিয়ে কেউ যোগাযোগ করলে যাচাই ছাড়া কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই সময়ে চাকরির আশ্বাস দেখিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান পাসপোর্ট চাইলে তা জমা দেওয়া যাবে না। একইভাবে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন থেকেও বিরত থাকতে হবে।
সরকারের এই সতর্কতার অন্যতম কারণ হিসেবে ভুয়া ভিসা ও অননুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থগিতাদেশের বিষয়টি জানানো হয় ২৮ সেপ্টেম্বর
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে লাওস সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাওসে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশ মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
লাওসের এই সিদ্ধান্তের ফলে শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট এবং এলএ-বি২ শ্রেণির শ্রমিক ভিসা ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রয়েছে।
তবে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি লাওস সরকার বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।
কারণ জানতে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, লাওসের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে যোগাযোগ করছে।
বাংলাদেশে লাওসের নিজস্ব দূতাবাস না থাকায় পাশের দেশের দূতাবাসের মাধ্যমেও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘দ্য লাওসিয়ান টাইমস’ জানিয়েছে, অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার, অনুমোদনহীন শ্রমিক সরবরাহ এবং বিদেশি কর্মী আনার পর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নিয়োগদাতাদের নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
লাওসের নির্দেশনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্যই কেন স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো কারণ অবশ্য উল্লেখ করা হয়নি।
লাওসের অনুমোদন ছাড়া কর্মী নেওয়া যাবে না
লাওসের নিয়ম অনুযায়ী, দেশটির অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি, নিয়োগদাতা কিংবা শ্রমিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশি নাগরিককে সেখানে প্রবেশ করানো বা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবে না।
নিয়ম ভেঙে কর্মী আনলে বা নিয়োগ দিলে জরিমানার বিধানও রয়েছে। অনুমোদন ছাড়া শ্রমিক আনা বা নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২৫ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ১১০ মার্কিন ডলার জরিমানা হতে পারে।
অন্য কোনো শ্রমিক ইউনিটে নিয়োগের উদ্দেশ্যে কর্মী আনা হলেও একই ধরনের জরিমানা প্রযোজ্য হবে।
কর্মস্থল বদল করলেও রয়েছে জরিমানা
নির্ধারিত শ্রমিক ইউনিটের জন্য আনা কর্মীকে অন্য কোনো শ্রমিক ইউনিটে কাজে ব্যবহার বা গ্রহণ করলেও নিয়োগদাতাকে জরিমানা দিতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকপ্রতি জরিমানার পরিমাণ ২০ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ৮৯ মার্কিন ডলার।
আবার অনুমোদন ছাড়া নির্ধারিত কর্মস্থলের বাইরে কাজ করলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের প্রতি ঘটনায় ১০ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ৪৪ মার্কিন ডলার জরিমানা হতে পারে।
এ ধরনের ঘটনায় ওই শ্রমিককে ৩০ দিনের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিধানও রাখা হয়েছে। দেশে ফেরানোর যাতায়াতসহ সংশ্লিষ্ট সব খরচ বহন করতে হবে নিয়োগদাতা বা নিয়ম লঙ্ঘনকারী পক্ষকে।
একই ধরনের অপরাধ আবার করলে জরিমানার পরিমাণ তিন গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত আইনগত ব্যবস্থার মুখেও পড়তে হতে পারে।
চলতি বছর ৩ হাজার কর্মীর ছাড়পত্র
বাংলাদেশ থেকে লাওসে যাওয়া কর্মীদের একটি বড় অংশ নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে কাজ করেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চীনের বিভিন্ন প্রকল্পেও কিছু বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন।
তবে বর্তমানে লাওসে মোট কত বাংলাদেশি কর্মী অবস্থান করছেন, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকের কাছে নেই।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন। গত বছর একই সময়ে নয়, পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৩৫ জন।
প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে লাওস উল্লেখযোগ্য নয়। সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের যাতায়াত মূলত কিছু চীনা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে।
ভুয়া চাহিদাপত্র নিয়েও সতর্ক সরকার
লাওসকে কেন্দ্র করে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির অনিয়মের তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার। কিছু এজেন্সি ভুয়া কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে লাওসের নামে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে কর্মী পাঠানোর চেষ্টা করছে—এমন তথ্য পাওয়ার পর কাগজপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোরতা আনা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনা রয়েছে। এ কারণে বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে যাচাই-বাছাই বাড়ানো হয়েছে।
কর্মী কোন জায়গায় যাচ্ছেন, সেখানে তার কাজ কী হবে, কত সময়ের জন্য যাওয়ার কথা এবং যে প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেটি বাস্তবে আছে কি না—এসব বিষয় পরীক্ষা করা হচ্ছে।
নিরাপদ অভিবাসনের দিকে জোর
লাওসের পাশাপাশি কম্বোডিয়া এবং অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে সরকার।
ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার পরিবর্তে নিরাপদ এবং নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা, চাকরি, কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
লাওসের বর্তমান স্থগিতাদেশ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকায় এই সময়ের মধ্যে কর্মসংস্থানের নামে পাসপোর্ট বা টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকাই সরকারের প্রধান সতর্কবার্তা।
FAQ
লাওসে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা কেন বন্ধ?
লাওস বাংলাদেশকে স্থগিতাদেশের নির্দিষ্ট কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তবে ‘দ্য লাওসিয়ান টাইমস’-এর তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার, অননুমোদিত শ্রমিক সরবরাহ এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নিয়োগদাতাদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।
লাওসে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা কতদিন বন্ধ থাকবে?
গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে স্থগিতাদেশ কার্যকর হয়েছে এবং এটি ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকার কথা।
এই সময়ে চাকরির জন্য পাসপোর্ট জমা দেওয়া যাবে কি?
না। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় কর্মসংস্থানের আশ্বাসে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট জমা দেওয়া এবং আর্থিক লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
লাওসে অনুমোদন ছাড়া শ্রমিক নিয়োগ করলে কত জরিমানা হতে পারে?
প্রতি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২৫ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ১১০ মার্কিন ডলার জরিমানা হতে পারে। একই ধরনের অপরাধ পুনরায় করলে জরিমানার পরিমাণ তিন গুণ হতে পারে এবং অতিরিক্ত আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
চলতি বছর কত বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন?
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৩৫ জন।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- ব্রাজিলের পরের দুই ম্যাচ কবে, জানুন সময়সূচি ও প্রতিপক্ষ
- Vivo V80: ৭,২০০mAh ব্যাটারি ও ZEISS ক্যামেরার চমক
- এনসিসি ব্যাংকের শেয়ার বিক্রি, বাজারমূল্য ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা
- ডোমিনেজ স্টিলে মালিকানা বদল, এবার পর্ষদেও বড় রদবদল
- আয়-সম্পদে বড় উত্থান অ্যাপেক্স ফুডসের, ডিভিডেন্ড কেন একই?
- সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য সুখবর