ঢাকা, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

২০৮ ম্যাচ, ১২৬ গোল: শেষ হলো মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

খেলা ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৭ ০৯:৩৩:৫১
২০৮ ম্যাচ, ১২৬ গোল: শেষ হলো মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচটাও নিজের মতো করেই খেললেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে একটি গোল করেছেন, সঙ্গে সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও দুটি। ৬ অক্টোবর বুয়েনস আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্টালে সেই ম্যাচের মধ্য দিয়েই আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলো। শেষ বাঁশির পর তার নামের পাশে থাকল ২০৮ ম্যাচ, ১২৬ গোল ও ৭০ অ্যাসিস্ট—আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনটিই রেকর্ড।

৩৯ বছর বয়সী মেসির বিদায়ী ম্যাচটি ছিল নিছক একটি প্রীতি ম্যাচ নয়। ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকে পূর্ণ মনুমেন্টালে ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে ছিল আবেগ। আর মাঠে সেই আবেগকে আরও বিশেষ করে তুললেন মেসি নিজেই—গোল করলেন, দুটি গোল বানিয়ে দিলেন এবং জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচটি জয়ে রাঙালেন।

বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে মেসির কী হলো?

প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৪৮ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দি গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। এরপর নিকো পাজকে দিয়ে দ্বিতীয় গোল করান মেসি। শেষ পর্যন্ত ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে নিজেই গোল করে আর্জেন্টিনার ৩-০ জয় নিশ্চিত করেন।

অর্থাৎ বিদায়ী ম্যাচে আর্জেন্টিনার তিন গোলেই সরাসরি অবদান ছিল মেসির। শেষ ম্যাচের এমন পারফরম্যান্সই হয়তো তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উপযুক্ত সমাপ্তিগুলোর একটি।

আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও জানিয়েছে, বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটিই ছিল আর্জেন্টিনার দর্শকদের সামনে জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির শেষ উপস্থিতি।

২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল—মেসির শেষ আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান

বেনিনের বিপক্ষে গোল করার আগে মেসির আন্তর্জাতিক গোল ছিল ১২৫টি। বিদায়ী ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করে সেই সংখ্যা নিয়ে যান ১২৬-এ।

একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার হয়ে তার ম্যাচের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০৮। অর্থাৎ দেশের জার্সিতে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সবচেয়ে বেশি গোল করা—দুই রেকর্ডই মেসির দখলে। তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ হিসাবে রয়েছে ৭০টি অ্যাসিস্টও।

এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; আর্জেন্টিনার হয়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে মেসির ধারাবাহিকতারও প্রমাণ।

২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল অস্বস্তিকর

আজকের মেসির বিদায়ের সঙ্গে তার আন্তর্জাতিক অভিষেকের গল্পের মিল খুঁজলে বিষয়টি আরও চমকপ্রদ মনে হয়।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে সিনিয়র দলে অভিষেক হয়েছিল মেসির। সেই ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে।

সেই অস্বস্তিকর শুরু থেকে ২০৮তম ও শেষ ম্যাচে এসে গোল করে বিদায়—মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু ও শেষ যেন দুই ভিন্ন প্রান্তের গল্প।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন সবচেয়ে বড় সাফল্য

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম দিকটা অবশ্য এতটা সফল ছিল না। বারবার ফাইনালে উঠেও শিরোপা না পাওয়ার কারণে জাতীয় দলের হয়ে তার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়—পরপর তিনটি বড় ফাইনালের ব্যর্থতা মেসির ক্যারিয়ারে বড় আক্ষেপ হয়ে ছিল।

কিন্তু সেই গল্প বদলে যায় ২০২১ সালে।

ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে মেসি প্রথম বড় সিনিয়র আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতেন আর্জেন্টিনার হয়ে। এরপর ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে ফাইনালিসিমা এবং একই বছর ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতেন তিনি। ২০২৪ সালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে আবারও কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা।

ফলে মেসির সিনিয়র আন্তর্জাতিক ট্রফির তালিকায় রয়েছে—

২০২১ কোপা আমেরিকা

২০২২ ফাইনালিসিমা

২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ

২০২৪ কোপা আমেরিকা

এর বাইরে ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে আর্জেন্টিনার হয়ে ফুটবলে সোনাও জিতেছেন মেসি। তবে সেটি সিনিয়র জাতীয় দলের প্রধান ট্রফির তালিকায় আলাদাভাবে বিবেচিত হয়।

বিশ্বকাপেও মেসির রেকর্ড আলাদা

বিশ্বকাপের ইতিহাসেও মেসি রেখে গেছেন একাধিক রেকর্ড। তিনি ছয়টি বিশ্বকাপ আসরে খেলেছেন—২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬।

বিশ্বকাপে তার মোট ম্যাচ ৩৪টি এবং গোল ২১টি। ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত এসে বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার গোলসংখ্যা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। মেসি একই সঙ্গে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের একজন এবং আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গোলদাতা।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ অবশ্য তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে দুই গোল করে এবং টাইব্রেকারে গোল করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।

কোপা আমেরিকাতেও মেসির দীর্ঘ ছাপ

কোপা আমেরিকায়ও মেসির ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ। ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনাকে এই টুর্নামেন্টের শিরোপা এনে দেওয়ার পর ২০২৪ সালেও দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি।

অর্থাৎ জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারের শেষদিকে এসে যে ট্রফিগুলোকে ঘিরে এতদিনের অপেক্ষা ছিল, সেগুলোর প্রায় সবকটিই নিজের করে নিয়েছেন মেসি।

একসময় জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি এসেছিল ২০১৬ সালে। চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

তবে খুব বেশিদিনের জন্য নয়। পরে সিদ্ধান্ত বদলে আবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফিরে আসেন।

সেই প্রত্যাবর্তনের পরই যেন বদলে যায় গল্পের শেষ অধ্যায়। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা—একটির পর একটি বড় সাফল্য আসে আর্জেন্টিনার ঘরে।

শেষ ম্যাচের আগেই আন্তর্জাতিক অবসরের সিদ্ধান্ত

২০২৬ বিশ্বকাপের পর মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। শেষ পর্যন্ত আগস্টে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান। পরে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তার সম্মানে দেশের মাটিতে একটি বিদায়ী ম্যাচ আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। বেনিনের বিপক্ষে ৬ অক্টোবরের ম্যাচটি সেই বিদায়ের মঞ্চ হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি তার সিদ্ধান্তের মুহূর্ত নয়; বরং আগেই নেওয়া আন্তর্জাতিক অবসরের পর জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবার মাঠে নামার আনুষ্ঠানিক বিদায়ী ম্যাচ।

বিদায়ী রাতে মেসিকে ঘিরে শুধু ফুটবল ছিল না

মনুমেন্টালে ম্যাচ শুরুর আগ থেকেই ছিল অন্যরকম পরিবেশ। হাজার হাজার সমর্থক মেসির নামে স্লোগান দেন। তার ১০ নম্বর জার্সিকে ঘিরেও ছিল বিশেষ আয়োজন।

ম্যাচ শেষে সতীর্থ, প্রতিপক্ষ এবং ম্যাচ কর্মকর্তারা মেসিকে ঘিরে দাঁড়ান। এরপর শুরু হয় বিশেষ বিদায়ী আয়োজন। পুরো মুহূর্তটিই ছিল একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচের চেয়ে অনেক বেশি আবেগঘন।

নিজেও ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি। জাতীয় দলের হয়ে এত দীর্ঘ সময় খেলতে পারাকে নিজের জন্য বড় গর্বের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ, কিন্তু ফুটবল নয়

আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে রাখলেও মেসির ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হচ্ছে না। ক্লাব ফুটবলে তিনি এখনো ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন।

তবে জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হওয়ার অর্থ হলো, আর কোনো বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার ম্যাচে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিতে মেসিকে দেখা যাবে না।

যে জার্সি পরে তিনি ২০৮ ম্যাচ খেলেছেন, ১২৬ গোল করেছেন, ৭০টি অ্যাসিস্ট দিয়েছেন এবং বিশ্বকাপসহ একাধিক বড় ট্রফি জিতেছেন—সেই জার্সিতেই শেষবারের মতো তার নাম লেখা হলো বেনিন ম্যাচের পর।

২১ বছরের গল্পের শেষ লাইনে ২০৮ ম্যাচ, ১২৬ গোল

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে শুধু সংখ্যায় বিচার করলে পাওয়া যাবে ২০৮ ম্যাচ, ১২৬ গোল ও ৭০ অ্যাসিস্ট। পাওয়া যাবে বিশ্বকাপ, দুই কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার মতো বড় শিরোপা।

কিন্তু সংখ্যার বাইরে তার গল্প আরও বড়।

একসময় যে মেসিকে জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার জন্য সমালোচিত হতে হয়েছিল, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছেন। যে খেলোয়াড় একসময় জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনিই পরে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল প্রজন্মের অন্যতম প্রধান মুখ হয়েছেন।

আর শেষ ম্যাচেও তিনি যা করেছেন, সেটিও যেন পুরো ক্যারিয়ারের প্রতিচ্ছবি—একটি গোল, দুটি অ্যাসিস্ট এবং একটি জয়।

FAQ

প্রশ্ন: আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি মোট কতটি ম্যাচ খেলেছেন?

উত্তর: বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচসহ মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮টি ম্যাচ খেলেছেন, যা দেশটির হয়ে সর্বোচ্চ।

প্রশ্ন: আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি কত গোল করেছেন?

উত্তর: আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে বেনিনের বিপক্ষে গোল করার পর আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৬টি।

প্রশ্ন: মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ কোনটি?

উত্তর: ৬ অক্টোবর ২০২৬ বুয়েনস আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটিই ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ৩-০ গোলে জেতে।

প্রশ্ন: শেষ ম্যাচে মেসি কয়টি গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন?

উত্তর: বেনিনের বিপক্ষে মেসি একটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন। অর্থাৎ আর্জেন্টিনার তিনটি গোলেই সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি।

প্রশ্ন: আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি কোন বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছেন?

উত্তর: মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফাইনালিসিমা এবং ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ জিতেছেন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: