ঢাকা, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

২৫ কোটি জন্মনিবন্ধন, অথচ জনসংখ্যা ১৮ কোটি—কেন?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৭ ১৭:২৩:১০
২৫ কোটি জন্মনিবন্ধন, অথচ জনসংখ্যা ১৮ কোটি—কেন?

দেশের জনসংখ্যা যেখানে প্রায় ১৮ কোটি, সেখানে জন্মনিবন্ধনের ডেটাবেজে সংখ্যা প্রায় ২৫ কোটি—এই বড় ব্যবধানই জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থার নির্ভুলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এনেছে। দ্বৈত নিবন্ধনের কারণে তৈরি হওয়া এই অসামঞ্জস্যের পাশাপাশি জনবল, লজিস্টিক সহায়তা ও নাগরিকবান্ধব সেবার ঘাটতিও রয়েছে। জাতীয় পরিকল্পনা থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা—সব ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করতে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবসের অনুষ্ঠানে এসব বিষয় উঠে আসে। রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত সুশাসন’।

২৫ কোটি নিবন্ধনের তথ্য, জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দেশে জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা নিয়ে অসামঞ্জস্যের বিষয়টি সামনে আনেন।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ২৫ কোটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে। অথচ জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বৈত নিবন্ধনই এই পার্থক্যের প্রধান কারণ।

এই পরিস্থিতিতে শুধু নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করাই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রয়োজন নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সঠিক নিবন্ধনের গুরুত্ব রয়েছে। জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যচাহিদা নির্ধারণসহ বিভিন্ন জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নে নির্ভুল তথ্য প্রয়োজন। এ জন্য নাগরিকদের সময়মতো জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি।

ভুল তথ্যের প্রভাব পড়বে স্কুল-হাসপাতাল পরিকল্পনাতেও

জন্মনিবন্ধনের তথ্যকে শুধু একটি সনদ বা পরিচয়পত্রের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে চলবে না—অনুষ্ঠানে বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে এর বিস্তৃত প্রভাবের বিষয়টি।

কোন এলাকায় কত শিশু জন্ম নিচ্ছে, সেই তথ্য নির্ভরযোগ্য না হলে ভবিষ্যতে সেখানে কতগুলো স্কুল বা হাসপাতাল প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে কত মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন, সে পরিকল্পনাতেও সঠিক জন্মতথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) ফারাহ শাম্মী বলেন, কোনো এলাকায় কত স্কুল ও হাসপাতাল প্রয়োজন কিংবা সেখানে কী ধরনের রোগের ঝুঁকি বেশি—এসব বিষয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্য থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। তাই জাতীয় পরিকল্পনার ভিত্তি শক্ত করতে যথাযথ নিবন্ধন প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপও একই গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোথায় নতুন বিদ্যালয় দরকার, কোন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বেশি, কত টিকা সংগ্রহ করতে হবে এবং জনগোষ্ঠীর জন্য কী পরিমাণ সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন—এসব পরিকল্পনার ভিত্তি হলো নির্ভুল জন্মনিবন্ধন।

জন্মনিবন্ধন থেকেই নাগরিক জীবনের শুরু

একজন নাগরিকের আইনি পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হিসেবে জন্মনিবন্ধনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয় অনুষ্ঠানে। এর সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, বিবাহনিবন্ধন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ ১৮টি নাগরিক সেবা ও অধিকার যুক্ত রয়েছে।

অন্যদিকে একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকার ও সরকারি ভাতাসহ বিভিন্ন অধিকার সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন মৃত্যুনিবন্ধন। ফলে জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত না হলে নাগরিক অধিকার এবং সরকারি পরিকল্পনা—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হতে পারে।

প্রায় দেড় শ বছর পরও পুরোপুরি নির্ভুল নয়

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৩ সালে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন করা হয়েছিল। এরপর প্রায় দেড় শ বছর পেরিয়ে গেলেও জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের কাজ পুরোপুরি নির্ভুল করা সম্ভব হয়নি। দেশের মোট জনসংখ্যা এবং নিবন্ধনের ডেটাবেজে থাকা সংখ্যার অসামঞ্জস্যও সেই প্রশ্নকে সামনে আনে।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, প্রচলিত প্রক্রিয়া বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

ডিজিটাল সুশাসনের সঙ্গেও যুক্ত জন্মনিবন্ধন

জন্মনিবন্ধনের নির্ভুলতার বিষয়টি এখন কেবল নিবন্ধন কার্যালয়ের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারি ডিজিটাল উদ্যোগের সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে জানান স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান।

তিনি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে জানান, সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যার সঙ্গে জন্মনিবন্ধনও সম্পৃক্ত।

তাই ডিজিটাল সুশাসনের সুবিধা নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে হলে জন্মনিবন্ধনের তথ্য নির্ভুল হওয়া জরুরি।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, নাগরিকের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা না মিললে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। নাগরিকের জন্য ব্যবস্থাটি ব্যবহারবান্ধব হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।

নিবন্ধন ব্যবস্থায় জনবল সংকট, ছিল ভুয়া সনদের ঘটনাও

নির্ভুল নিবন্ধন নিশ্চিত করার পথে বাস্তব কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।

রেজিস্ট্রার জেনারেল আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে প্রধান কার্যালয়ে জায়গার সংকট এবং লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতিও রয়েছে।

তিনি আরও জানান, অতীতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপের কারণে ভুয়া জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ঘটনাও ঘটেছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি ইউনিয়নে ২০ থেকে ২৫ জন উদ্যোক্তাকে যুক্ত করার প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, এমন ব্যবস্থা করা গেলে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের পাশাপাশি পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের আবেদন করাও সহজ হবে। এতে নাগরিকদের ভোগান্তি কমার সুযোগ তৈরি হবে।

সেবা নিতে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর তাগিদ

বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদলের উন্নয়ন সহযোগিতা বিভাগের প্রধান মিখাল ক্রেজা ডিজিটাল সেবায় নাগরিকদের প্রবেশাধিকারের বিষয়টি সামনে আনেন।

তিনি বলেন, অনেক নাগরিকের সরাসরি ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে তাঁদের পরিবারের সদস্য বা অন্য কারও সহযোগিতা নিতে হয়। এমন ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা নাগরিককে নিজেই সেবা গ্রহণে সক্ষম করবে এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাবে।

এতে স্পষ্ট হয়, শুধু তথ্য সঠিক রাখাই নয়, সেই তথ্য ও সেবা ব্যবস্থাকে নাগরিকের জন্য সহজলভ্য করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সহজ ও সাশ্রয়ী করার ওপর গুরুত্ব

ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ জন্মনিবন্ধনকে পরিবারের জন্য আরও সহজ করার ওপর জোর দেন।

তাঁর মতে, একটি পরিবারের জন্য জন্মনিবন্ধনের প্রক্রিয়া সহজ, সাশ্রয়ী এবং সময়োপযোগী হওয়া প্রয়োজন। কারণ জন্মনিবন্ধনের তথ্যের ওপর নির্ভর করেই ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, টিকাদান এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়।

অর্থাৎ নাগরিকের জন্মের তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত হওয়ার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও সেবা ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।

অবদানের স্বীকৃতি পেল ১৩ কার্যালয় ও চার কর্মকর্তা

জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবসের অনুষ্ঠানে ভালো কাজের স্বীকৃতিও দেওয়া হয়। নির্ভুল জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং সনদ সংশোধনের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য দেশের ১৩টি নিবন্ধন কার্যালয় ও চারজন কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করা হয়।

অনুষ্ঠানের আলোচনায় তাই জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে—একদিকে তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে নাগরিকের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ ও কার্যকর করা। জাতীয় পরিকল্পনা এবং নাগরিক সেবা—দুই ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য নিবন্ধন ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

FAQ

জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে কতটি নাগরিক সেবা ও অধিকার যুক্ত?

জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, বিবাহনিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ ১৮টি নাগরিক সেবা ও অধিকার যুক্ত।

দেশে বর্তমানে কতটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে?

অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৫ কোটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে।

জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা কত?

জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি।

জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা ও জনসংখ্যার মধ্যে পার্থক্যের কারণ কী?

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, মূলত দ্বৈত নিবন্ধনের কারণে এই অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

জন্মনিবন্ধন নির্ভুল হওয়া কেন জরুরি?

সঠিক জন্মনিবন্ধনের তথ্যের ওপর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিভিন্ন জাতীয় পরিকল্পনা নির্ভর করে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: