ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

জন্ম নিবন্ধন আবেদন ঘরে বসেই করবেন যেভাবে, জানুন পুরো প্রক্রিয়া

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৮ ১৬:১০:৫৯
জন্ম নিবন্ধন আবেদন ঘরে বসেই করবেন যেভাবে, জানুন পুরো প্রক্রিয়া

সন্তানের জন্মের পর জন্ম নিবন্ধন করতে এখন প্রথম ধাপের কাজটি ঘরে বসেই করা যায়। সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য ব্যবস্থা (BDRIS)-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনে আবেদন করা সম্ভব। আবেদন করার সময় জন্মস্থান, স্থায়ী ঠিকানা, বাবা-মায়ের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয় এবং প্রযোজ্য কাগজপত্রের ছবি আপলোড করতে হয়। তবে অনলাইনে ফরম পূরণ করলেই জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন হয়ে যায় না; আবেদনটি সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের যাচাই ও পরবর্তী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।

জন্ম নিবন্ধন একজন ব্যক্তির জন্ম ও পরিচয়সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। তাই প্রথমবার আবেদন করার সময় নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম এবং ঠিকানার মতো তথ্য নির্ভুলভাবে দেওয়া জরুরি। সামান্য ভুলও পরবর্তীতে সংশোধনের ঝামেলা তৈরি করতে পারে।

কোথা থেকে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করবেন

জন্ম নিবন্ধনের অনলাইন আবেদন করতে যেতে হবে সরকারি BDRIS ওয়েবসাইটে। সেখানে জন্ম নিবন্ধনের জন্য নতুন আবেদন, আবেদনের বর্তমান অবস্থা দেখা, আবেদনপত্র প্রিন্ট এবং জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের মতো বিভিন্ন সেবা রয়েছে।

সরকারি ওয়েবসাইট: BDRIS-এ জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করুন

অনলাইনে আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন করতে হবে। তাই আবেদন শুরুর আগে জন্মস্থান ও স্থায়ী ঠিকানার তথ্য হাতের কাছে রাখা ভালো।

অনলাইনে আবেদন শুরুর আগে কী কী প্রস্তুত রাখবেন

ফরম পূরণের সময় বিভিন্ন তথ্য প্রয়োজন হবে। তাই আবেদন শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য প্রস্তুত রাখলে কাজ অনেক সহজ হয়।

বিশেষ করে শিশুর ক্ষেত্রে জন্মস্থান ও জন্মতারিখের প্রমাণ হিসেবে চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র, জন্মসংক্রান্ত সনদ বা প্রযোজ্য অন্য কোনো প্রমাণপত্র লাগতে পারে। ৪৫ দিনের মধ্যে আবেদন করলে স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ এবং বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো নথিও প্রয়োজন হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত বয়সের প্রমাণও লাগতে পারে।

তবে আবেদনকারীর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিন্ন হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট একটি কাগজের তালিকাকে সবার জন্য একই নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

ধাপে ধাপে ঘরে বসে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন

প্রথমে BDRIS ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

প্রথমে সরকারি BDRIS ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে ‘জন্ম নিবন্ধন আবেদন’ অপশন নির্বাচন করতে হবে। BDRIS-এর হোমপেজে এই সেবাটি আলাদাভাবে দেওয়া রয়েছে।

জন্মস্থান বা ঠিকানার তথ্য দিন

এরপর আবেদনকারীর জন্মস্থান এবং স্থায়ী ঠিকানার তথ্য দিতে হবে। ফরমে বিভাগ, জেলা, উপজেলা/সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডসহ প্রয়োজনীয় ঠিকানা নির্বাচন করতে হয়।

এখানে ভুল তথ্য দেওয়া উচিত নয়। কারণ ঠিকানার তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের বিষয়টি নির্ধারিত হতে পারে।

নাম ও জন্মতারিখ সাবধানে লিখুন

আবেদনকারীর নাম বাংলা ও ইংরেজিতে সঠিকভাবে লিখতে হবে। একই সঙ্গে জন্মতারিখ, লিঙ্গ এবং জন্মস্থানসংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে।

বিশেষ করে নামের ইংরেজি বানান এবং জন্মতারিখ লেখার সময় বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে পাসপোর্ট, শিক্ষাগত নথি বা অন্যান্য সরকারি কাজে এসব তথ্য ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে।

বাবা-মায়ের তথ্য পূরণ করুন

পরবর্তী ধাপে বাবা ও মায়ের নাম এবং প্রযোজ্য অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। BDRIS-এর আবেদন ব্যবস্থায় বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখের মতো তথ্য দেওয়ার ঘর রয়েছে।

তাই আবেদন করার আগে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া ভালো।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করুন

আবেদন ফরমে প্রয়োজনীয় সংযুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। BDRIS-এর বর্তমান ফরমে .jpg, .jpeg ও .png ধরনের ইমেজ ফাইল আপলোড করা যায় এবং প্রতিটি ফাইলের সর্বোচ্চ আকার ২ মেগাবাইট উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই কাগজপত্রের ছবি তোলার সময় খেয়াল রাখতে হবে, যেন লেখা স্পষ্ট দেখা যায় এবং ফাইলের আকার নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকে।

মোবাইল নম্বর দিয়ে OTP যাচাই করুন

আবেদনকারীর মোবাইল নম্বর দেওয়ার পর OTP যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই এমন একটি সচল মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা উচিত, যেখানে সহজেই OTP পাওয়া যায়।

আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য মিলিয়ে নিন

ফরম সাবমিট করার আগে নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম, জন্মস্থান ও ঠিকানার তথ্য অন্তত একবার ভালোভাবে মিলিয়ে দেখা উচিত।

একবার ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন জমা দেওয়ার পর সেটি সংশোধনের জন্য আলাদা প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে। BDRIS-এ জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের জন্য পৃথক অনলাইন আবেদন ব্যবস্থাও রয়েছে।

আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করুন

আবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর আবেদনপত্রের নম্বর সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে BDRIS-এর মাধ্যমে আবেদনপত্র প্রিন্ট করা যায়।

পরবর্তীতে আবেদনসংক্রান্ত কোনো তথ্য জানতে বা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এই নম্বর কাজে লাগতে পারে।

জন্ম নিবন্ধনের জন্য কত টাকা লাগে

বাংলাদেশে জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করলে নিবন্ধন ফি লাগে না। ৪৫ দিন পার হওয়ার পর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত নিবন্ধনের জন্য ২৫ টাকা এবং ৫ বছরের বেশি হলে ৫০ টাকা সরকারি ফি নির্ধারিত রয়েছে।

তাই নবজাতকের জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে ৪৫ দিনের মধ্যেই আবেদন করা ভালো। এতে ফি ছাড়াও পরবর্তী সময়ে বয়স প্রমাণের অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজনীয়তা এড়ানো সহজ হতে পারে।

বয়স বেশি হলে কী অতিরিক্ত কাগজ লাগতে পারে

জন্মের ৪৫ দিন পার হওয়ার পর আবেদন করলে আগের কাগজপত্রের পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী অতিরিক্ত প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।

সরকারি নির্দেশনায় ৫ বছরের মধ্যে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে EPI কর্মীর প্রত্যয়ন বা EPI কার্ডের অনুলিপির কথা উল্লেখ রয়েছে। আর ৫ বছরের পর আবেদন করলে বয়স প্রমাণের জন্য চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র অথবা প্রযোজ্য শিক্ষাগত সনদের মতো নথি প্রয়োজন হতে পারে।

এ কারণে অনেক বছর পর জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয় থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।

অনলাইনে আবেদন করলেই কি জন্ম নিবন্ধন হয়ে যায়?

না। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

অনলাইনে আবেদন করা হলো জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ার একটি ধাপ। আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয় আবেদনটি যাচাই করে এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে। তাই শুধু অনলাইনে ফরম পূরণ করলেই হাতে জন্ম নিবন্ধন সনদ চলে আসবে—এমন ধারণা ঠিক নয়।

BDRIS-এ আবেদন করার পাশাপাশি আবেদনটির পরবর্তী অবস্থা জানার জন্যও অনলাইন ব্যবস্থা রয়েছে।

আবেদন করার সময় যেসব ভুল করবেন না

জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সতর্ক হতে হবে তথ্যের নির্ভুলতার বিষয়ে। বিশেষ করে—

নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান যাচাই করুন।

জন্মতারিখ সঠিকভাবে দিন।

বাবা ও মায়ের নামের বানান মিলিয়ে নিন।

বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন নম্বর থাকলে সেটি সঠিকভাবে দিন।

জন্মস্থান ও স্থায়ী ঠিকানা ভুল নির্বাচন করবেন না।

অস্পষ্ট কাগজপত্রের ছবি আপলোড করবেন না।

OTP পাওয়ার জন্য সচল মোবাইল নম্বর ব্যবহার করুন।

আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করুন।

একই ব্যক্তির জন্য একাধিক আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের পরামর্শ নিন।

জন্ম নিবন্ধনের তথ্য অনলাইনে যাচাই করবেন যেভাবে

জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর তথ্য অনলাইনে যাচাই করা যায়। সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন যাচাই সিস্টেমে ১৭ অংকের জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্মতারিখ দিয়ে রেকর্ড যাচাই করার ব্যবস্থা রয়েছে।

জন্ম নিবন্ধন যাচাই: সরকারি Birth and Death Verification পোর্টাল

এটি ব্যবহার করে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সঠিকভাবে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব।

জন্ম নিবন্ধনের আবেদন নিয়ে শেষ কথা

জন্ম নিবন্ধনের আবেদন এখন আগের তুলনায় সহজ হয়েছে, কারণ প্রাথমিক আবেদন প্রক্রিয়ার বড় একটি অংশ অনলাইনে সম্পন্ন করা যায়। ঘরে বসে BDRIS-এ ফরম পূরণ, প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া এবং কাগজপত্রের ছবি সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

তবে আবেদন করার সময় তাড়াহুড়া না করে প্রতিটি তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুর নাম, জন্মতারিখ এবং বাবা-মায়ের তথ্য ভবিষ্যতের বিভিন্ন সরকারি নথিতে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব, বিশেষ করে ৪৫ দিনের মধ্যে, জন্ম নিবন্ধনের আবেদন সম্পন্ন করাই ভালো।

জন্ম নিবন্ধন নিয়ে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ FAQ

প্রশ্ন: ঘরে বসে কি জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করা যায়?

হ্যাঁ। সরকারি BDRIS ওয়েবসাইটে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করা যায়। তবে অনলাইনে আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের যাচাই ও পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হয়।

প্রশ্ন: জন্মের কত দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করলে ফি লাগে না?

জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করলে সরকারি নিবন্ধন ফি লাগে না। ৪৫ দিন পর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত ২৫ টাকা এবং ৫ বছরের বেশি হলে ৫০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে।

প্রশ্ন: অনলাইনে আবেদন করার পর কী করতে হবে?

আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের পরবর্তী নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। BDRIS-এ আবেদনপত্র প্রিন্ট ও আবেদনের বিভিন্ন সেবা ব্যবহারের ব্যবস্থাও রয়েছে।

প্রশ্ন: জন্ম নিবন্ধনের তথ্য অনলাইনে যাচাই করা যায়?

হ্যাঁ। সরকারি যাচাই পোর্টালে ১৭ অংকের জন্ম নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে তথ্য যাচাই করা যায়।

প্রশ্ন: জন্ম নিবন্ধনে ভুল হলে কী করা যাবে?

ভুল তথ্য সংশোধনের জন্য BDRIS-এ আলাদা সংশোধন আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সংশোধনের ধরন অনুযায়ী প্রমাণপত্র ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: