ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

খাজনা বাকি থাকলে জমির মালিকের কী কী সমস্যা হতে পারে?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৯ ১৩:৫৭:৩১
খাজনা বাকি থাকলে জমির মালিকের কী কী সমস্যা হতে পারে?

জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর দীর্ঘদিন বকেয়া থাকলে জমির মালিককে শুধু বকেয়া টাকা পরিশোধের চাপই সামলাতে হয় না, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। বকেয়া করের কারণে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের দায় তৈরি হতে পারে এবং জমিসংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক কাজেও জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে খাজনা বাকি থাকলেই জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় বা জমি সঙ্গে সঙ্গে সরকারের হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়।

বাংলাদেশে জমির মালিকদের জন্য ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। জমির শ্রেণি, পরিমাণ, প্রযোজ্য করহার ও আইনি বিধান অনুযায়ী কর নির্ধারিত হয়। নির্ধারিত কর পরিশোধ না করলে বকেয়া আদায়ের জন্য আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন খাজনা বাকি থাকলে বিষয়টি উপেক্ষা না করে নিজের জমির করের হিসাব যাচাই করা এবং বকেয়া থাকলে নিয়ম অনুযায়ী পরিশোধ করা জরুরি।

অনেক জমির মালিক জানতে চান, কত বছর খাজনা বাকি থাকলে সমস্যা হয়, বকেয়া থাকলে জমি বিক্রি বা নামজারিতে বাধা আসে কি না এবং সরকার কি জমি নিলামে তুলতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান, বকেয়ার অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট রাজস্ব প্রক্রিয়ার ওপর।

খাজনা বাকি থাকলে জমির মালিকের যে সমস্যাগুলো হতে পারে

১. বকেয়া করের সঙ্গে জরিমানা যোগ হতে পারে

প্রতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে ওই বছরের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ না করলে তা বকেয়া হিসেবে বিবেচিত হয়। টানা তিন বছর বকেয়া থাকলে প্রথম থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত বকেয়া করের ওপর বার্ষিক ৬.২৫ শতাংশ হারে জরিমানা প্রযোজ্য হওয়ার বিধান রয়েছে।

২. সার্টিফিকেট মামলা হতে পারে

ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, টানা তিন বছর কর বকেয়া থাকলে তৃতীয় বছর শেষে সরকারি পাওনা আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট মামলা করা যেতে পারে। এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হলে বিষয়টি আর শুধু বকেয়া কর পরিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

৩. সরকারি পাওনা আদায়ের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারেন

সার্টিফিকেট মামলার মাধ্যমে পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ চলতে পারে। তাই সরকারি নোটিশ উপেক্ষা না করে বকেয়ার হিসাব যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

৪. জমিসংক্রান্ত কাজে অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে

জমি বিক্রি, হস্তান্তর বা নামজারির সময় ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে কাজে লাগে। বকেয়া থাকলে হিসাব হালনাগাদ এবং প্রয়োজনীয় দাখিলা সংগ্রহের কাজ জটিল হতে পারে। তবে শুধু খাজনা বকেয়া থাকার কারণে সব ধরনের জমি হস্তান্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন নয়।

এই বিধানগুলোর ভিত্তি হলো ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এর ৭ ও ৯ ধারা।

টানা তিন বছর খাজনা না দিলে কী হয়?

এ বিষয়ে আইনটি স্পষ্টভাবে কিছু নিয়ম নির্ধারণ করেছে। সেগুলো সহজভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, প্রতি বছরের ভূমি উন্নয়ন কর ওই বছরের ৩০ জুনের মধ্যে জরিমানা ছাড়া পরিশোধ করা যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে তা বকেয়া হিসেবে গণ্য হয়।

দ্বিতীয়ত, টানা তিন বছর বকেয়া থাকলে প্রথম থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত বকেয়া ভূমি উন্নয়ন করের ওপর বার্ষিক ৬.২৫ শতাংশ হারে জরিমানা প্রযোজ্য হয়।

আরও পড়ুন:

ঘরে বসেই জমির খাজনা দেবেন যেভাবে, জানুন পুরো নিয়ম

জমি নিয়ে বিরোধ হলে প্রথমেই যে ৫টি কাজ করবেন

মোবাইলেই দেখুন জমির খতিয়ানে নিজের নাম আছে কি না

তৃতীয়ত, তৃতীয় বছর শেষে সরকারি পাওনা আদায়ের জন্য Public Demands Recovery Act, 1913 অনুযায়ী সার্টিফিকেট মামলা করা যেতে পারে। মামলা চলাকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জরিমানাসহ বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করলে আইন অনুযায়ী মামলাটি প্রত্যাহার করতে হবে।

bdlaws.minlaw.gov.bd

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—আইনে বকেয়া আদায়ের জন্য মামলা করার সুযোগ রাখা হয়েছে; কিন্তু তিন বছর পূর্ণ হলেই মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়, এমন বিধান এই ধারায় নেই।

খাজনা বাকি থাকলে কি জমি বিক্রি করা যাবে?

খাজনা বকেয়া থাকলে জমি বিক্রি করা যাবে না—এমন সরল সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। জমি বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রেতার বৈধ মালিকানা, দলিল, প্রযোজ্য রেকর্ড এবং অন্যান্য আইনি শর্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে জমি বিক্রির আগে বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে হিসাব হালনাগাদ রাখা বাস্তবসম্মত। কারণ জমির কর পরিশোধের দাখিলা বিভিন্ন ভূমিসেবায় গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

portal.ldtax.gov.bd

আর যদি বকেয়া কর আদায়ের জন্য ইতিমধ্যে সার্টিফিকেট মামলা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে। Public Demands Recovery Act, 1913-এর অধীনে সার্টিফিকেটের নোটিশ জারির পর সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ব্যক্তিগত হস্তান্তর আদায়যোগ্য দাবির বিরুদ্ধে অকার্যকর হওয়ার বিধান নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হতে পারে। তাই মামলা বা নোটিশ থাকলে আইনজীবীর পরামর্শ ছাড়া জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

খাজনা বাকি থাকলে কি জমির মালিকানা চলে যায়?

না, শুধু খাজনা বাকি থাকার কারণে জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায় না। তবে বকেয়া কর সরকারের পাওনা হিসেবে থেকে যায় এবং আইন অনুযায়ী তা আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

এ কারণে খাজনা না দিলেও জমি নিজের থাকবে—এমন ধারণা করে দীর্ঘদিন বকেয়া রাখা ঠিক নয়। মালিকানা বজায় থাকা এবং সরকারি করের দায়—দুটি আলাদা বিষয়।

একইভাবে, শুধু খাজনার রসিদ থাকলেই জমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। জমির মালিকানা যাচাইয়ের জন্য দলিল, খতিয়ান, হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি বিবেচনা করতে হয়।

বকেয়া খাজনা কীভাবে যাচাই ও পরিশোধ করবেন?

জমির খাজনা বাকি আছে কি না, তা জানতে এখন অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন করের সরকারি সেবা ব্যবহার করা যায়। এজন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত পোর্টাল ব্যবহার করতে পারেন।

অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর সেবা

সরকারি পোর্টালে হোল্ডিং নিবন্ধন, কর পরিশোধ এবং দাখিলা-সংক্রান্ত সেবা পাওয়া যায়।

ভূমি উন্নয়ন কর পোর্টাল খুলুন

যেভাবে এগোবেন

সরকারি ভূমি উন্নয়ন কর পোর্টালে প্রবেশ করুন।

প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মতারিখ, সচল মোবাইল নম্বর এবং জমির খতিয়ান বা হোল্ডিংয়ের তথ্য প্রস্তুত রাখুন।

নিজের হোল্ডিংয়ের করের হিসাব ও বকেয়ার তথ্য যাচাই করুন।

বকেয়া থাকলে পোর্টালে প্রদর্শিত নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করুন এবং দাখিলা সংরক্ষণ করুন।

সরকারি পোর্টালে হোল্ডিং নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, জন্মতারিখ, সচল মোবাইল নম্বর এবং দাখিলা বা খারিজ খতিয়ানের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে।

portal.ldtax.gov.bd

অনলাইনে তথ্য না মিললে বা করের হিসাব নিয়ে আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌর ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন। অন্যের নামে রেকর্ড, ভুল হোল্ডিং বা জমির পরিমাণ নিয়ে অসংগতি থাকলে আগে তা যাচাই করা জরুরি।

সব জমির জন্য কি খাজনা দিতে হয়?

সব জমির ক্ষেত্রে করের নিয়ম এক নয়। জমির ধরন, পরিমাণ এবং প্রযোজ্য আইনি শর্ত অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারিত হয়। ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এর ৩ ধারায় কৃষিকার্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক মোট ৮.২৫ একর বা ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমির জন্য নির্দিষ্ট শর্তে কর মওকুফের বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে সম্পূর্ণ কৃষিজমির ওপর কর প্রযোজ্য হওয়ার বিধানও রয়েছে।

তাই নিজের জমি করমুক্ত কি না, তা অনুমান করে নেওয়া উচিত নয়। জমির প্রকৃতি, মালিকের পরিস্থিতি এবং প্রযোজ্য সরকারি বিধান যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

খাজনা বাকি থাকলে সবচেয়ে বড় ভুল হলো বিষয়টি দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা। কারণ বকেয়া ভূমি উন্নয়ন করের সঙ্গে জরিমানা যুক্ত হতে পারে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সরকারি পাওনা আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট মামলা করা যেতে পারে।

তবে শুধু খাজনা বকেয়া থাকলেই জমির মালিকানা বাতিল হয়ে যায় না। তাই আতঙ্কিত না হয়ে নিজের জমির হোল্ডিং ও করের হিসাব যাচাই করুন, বকেয়া থাকলে নিয়ম অনুযায়ী পরিশোধ করুন এবং কোনো নোটিশ বা মামলা হয়ে থাকলে দ্রুত প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিন।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. কত বছর খাজনা বাকি থাকলে জরিমানা হয়?

ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এর ৯ ধারা অনুযায়ী, টানা তিন বছর বকেয়া থাকলে প্রথম থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত বকেয়া করের ওপর বার্ষিক ৬.২৫ শতাংশ হারে জরিমানা প্রযোজ্য হয়।

২. তিন বছর খাজনা না দিলে কি জমি সরকারের হয়ে যায়?

না। শুধু খাজনা বাকি থাকার কারণে জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারের হয়ে যায় না। তবে বকেয়া কর আদায়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

৩. খাজনা বাকি থাকলে কি জমি বিক্রি করা যায়?

বকেয়া থাকলেই সব ক্ষেত্রে জমি বিক্রি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। তবে মালিকানার বৈধতা, সংশ্লিষ্ট নথি এবং কোনো সার্টিফিকেট মামলা বা আদেশ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

৪. অনলাইনে কি জমির বকেয়া খাজনা পরিশোধ করা যায়?

হ্যাঁ, সরকারি ভূমি উন্নয়ন কর পোর্টালের মাধ্যমে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কর পরিশোধের সুবিধা রয়েছে। পরিশোধের পর দাখিলা সংরক্ষণ করুন।

৫. খাজনার দাখিলা কি জমির মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ?

না। দাখিলা কর পরিশোধের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলেও এটি একাই চূড়ান্ত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে না। দলিল, খতিয়ান ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও বিবেচনা করতে হয়।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: