ঢাকা, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

গ্যাসের ব্যথা কোথায় হয়? হার্টের ব্যথা চিনবেন যেভাবে

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১০ ১৬:১৮:৪৯
গ্যাসের ব্যথা কোথায় হয়? হার্টের ব্যথা চিনবেন যেভাবে

বুকের মাঝখানে ব্যথা, পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি কিংবা বুকজ্বালা হলেই অনেকে মনে করেন, গ্যাসের সমস্যা হয়েছে। কিন্তু সব সময় বিষয়টি এতটা সহজ নয়। **গ্যাস বা অ্যাসিডিটির ব্যথা এবং হার্ট অ্যাটাকের ব্যথার লক্ষণে মিল থাকতে পারে।এমনকি হার্ট অ্যাটাকের সময়ও অনেকের বদহজম, বুকজ্বালা, বমি বমি ভাব কিংবা পেটের ওপরের অংশে ব্যথা হতে পারে। তাই শুধু ব্যথার স্থান দেখে কিংবা ঢেকুর ওঠার পর কিছুটা আরাম পেয়ে একে গ্যাসের সমস্যা বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।

গ্যাসের ব্যথা সাধারণত কোথায় হয়, হার্টের ব্যথা কেমন অনুভূত হয়, কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত এবং কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে—এসব বিষয় জানা থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে গ্যাসের ব্যথা ও হার্টের ব্যথা আলাদা করা যায় না।

গ্যাসের ব্যথা সাধারণত কোথায় হয়?

পাকস্থলী ও অন্ত্রে গ্যাস জমলে পেটের বিভিন্ন স্থানে অস্বস্তি, চাপ কিংবা মোচড়ের মতো ব্যথা হতে পারে। আবার পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে এলে বুকজ্বালা বা বুকের মাঝখানে জ্বালাপোড়া অনুভূত হতে পারে।

গ্যাস, বদহজম ও অ্যাসিডিটির ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব লক্ষণ দেখা যায়, সেগুলো হলো—

পেটের ওপরের অংশে ব্যথা: বুকের ঠিক নিচে, পেটের ওপরের দিকে চাপ, ভারী ভাব বা অস্বস্তি হতে পারে।

পেট ফাঁপা ও চাপ: পেট ফুলে থাকা, পেটে টান লাগা কিংবা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।

বুকজ্বালা: বুকের মাঝখানে জ্বালাপোড়া হতে পারে, বিশেষ করে খাওয়ার পর বা শুয়ে পড়লে।

ঢেকুর ও গ্যাস নির্গমন: ঢেকুর ওঠা বা পায়ুপথে গ্যাস বের হওয়ার সঙ্গে অস্বস্তি কমতে পারে।

মোচড়ের মতো ব্যথা: অন্ত্রে গ্যাস জমলে পেটের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

তবে এসব লক্ষণ থাকলেই যে ব্যথার কারণ গ্যাস, তা নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে নতুন করে বুকব্যথা শুরু হলে বা ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঘাম কিংবা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ থাকলে অবহেলা করা উচিত নয়।

হার্টের ব্যথা কোথায় হয়?

হার্টের রক্তপ্রবাহ কমে গেলে বা হার্ট অ্যাটাক হলে বুকের মাঝখানে কিংবা বুকের ভেতরে চাপ, ভারী ভাব, চেপে ধরা বা ব্যথার অনুভূতি হতে পারে। অনেকেই এটিকে বুকের ওপর ভারী কিছু বসে থাকার মতো অনুভূতি হিসেবে বর্ণনা করেন।

হার্টের ব্যথা শুধু বুকেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নয়। ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে—

- এক বা দুই হাত ও কাঁধে;

- ঘাড় ও চোয়ালে;

- পিঠের ওপরের অংশে;

- বুকের নিচে বা পেটের ওপরের অংশে।

এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে, আবার কমে গিয়ে পুনরায় ফিরে আসতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণ তুলনামূলক মৃদু বা অস্বাভাবিকও হতে পারে।

নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লক্ষণ সব সময় প্রচলিত ধারণার মতো নাও হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে বুকব্যথার চেয়ে শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি কিংবা পিঠ ও চোয়ালে অস্বস্তি বেশি স্পষ্ট হতে পারে।

গ্যাসের ব্যথা ও হার্টের ব্যথার পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে?

কিছু লক্ষণ দেখে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও এগুলোকে নিশ্চিত রোগনির্ণয়ের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। নিচের বিষয়গুলো সাধারণ পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

১. ব্যথার ধরন

গ্যাস বা বদহজমের ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা, ঢেকুর, পেটের মোচড় কিংবা বুকজ্বালা বেশি দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে হার্টের সমস্যায় বুকের মাঝখানে চাপ, আঁটসাঁট অনুভূতি, ভারী ভাব বা চেপে ধরার মতো অস্বস্তি হতে পারে।

তবে হার্ট অ্যাটাকেও জ্বালাপোড়া বা বদহজমের মতো অনুভূতি হতে পারে। তাই শুধু ব্যথার ধরন দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

২. খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক

খাওয়ার পর, অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের পর কিংবা শুয়ে পড়লে অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়তে পারে। টক ঢেকুর, মুখে টক স্বাদ এবং বুকজ্বালাও দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে হার্টের ব্যথা হাঁটাচলা বা পরিশ্রমের সময় শুরু হতে পারে, যদিও বিশ্রামের সময়ও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। খাবারের পর ব্যথা হয়েছে বলেই সেটি গ্যাস—এমন ধারণা নিরাপদ নয়।

৩. ব্যথা অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে কি না

পেটের গ্যাসের কারণে পেটে চাপ বা অস্বস্তি হতে পারে। কিন্তু বুকের অস্বস্তির সঙ্গে হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ব্যথা ছড়িয়ে পড়লে হার্টের সমস্যার আশঙ্কা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

৪. সঙ্গে অন্য কোনো লক্ষণ আছে কি না

বুকব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা থাকলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা থাকতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে গ্যাসের ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করা উচিত নয়।

৫. ঢেকুর বা অ্যান্টাসিডে ব্যথা কমছে কি না

ঢেকুর ওঠা বা অ্যাসিডিটির ওষুধে আরাম পাওয়া বদহজমের ক্ষেত্রে ঘটতে পারে। কিন্তু এতে হার্টের সমস্যা নেই—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। হার্টের সমস্যার ব্যথাও কখনো কমে আবার ফিরে আসতে পারে।

কখন বুকব্যথা হলে জরুরি বিভাগে যাবেন?

বুকের মাঝখানে নতুন বা অজানা কারণে ব্যথা, চাপ কিংবা অস্বস্তি হলে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে জরুরি চিকিৎসা নিন—

- বুকের মাঝখানে চাপ, চেপে ধরা বা ভারী ব্যথা কয়েক মিনিট ধরে থাকা কিংবা বারবার ফিরে আসা;

- ব্যথা হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া;

- শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া;

- ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব বা বমি;

- মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতি কিংবা হঠাৎ অস্বাভাবিক দুর্বলতা।

এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে বাংলাদেশে **৯৯৯ নম্বরে ফোন করে জরুরি সহায়তা চান অথবা দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।** সম্ভব হলে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাবেন না। ব্যথা কমে গেলেও সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

গ্যাসের ব্যথা হলে কী করবেন?

যদি পরিচিত ও হালকা বদহজমের লক্ষণ থাকে এবং কোনো বিপৎসংকেত না থাকে, তাহলে কয়েকটি অভ্যাস উপকার করতে পারে—

- একবারে অতিরিক্ত খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে খান।

- ধীরে খাবার খান এবং খাওয়ার সময় অতিরিক্ত বাতাস গিলে ফেলা এড়িয়ে চলুন।

- যেসব খাবারে নিয়মিত পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি বাড়ে, সেগুলো চিহ্নিত করুন।

- খাবারের পরপরই শুয়ে পড়বেন না; অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে শোয়ার আগে পর্যাপ্ত সময় রাখুন।

- বারবার বুকজ্বালা, পেটব্যথা বা বদহজম হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

তবে বুকব্যথা নতুন, তীব্র বা অজানা হলে এসব ব্যবস্থা চেষ্টা করে সময় নষ্ট করবেন না। প্রথমে জরুরি হৃদ্‌রোগের সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন।

গ্যাস নাকি হার্টের সমস্যা—নিশ্চিত হবেন কীভাবে?

হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে চিকিৎসক উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নের পাশাপাশি সাধারণত ইসিজি (ECG) এবং রক্তে ট্রোপোনিন পরীক্ষার মতো পরীক্ষা করতে পারেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

শুধু ব্যথার স্থান, বয়স, খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা ওষুধে সাময়িক আরাম পাওয়ার ভিত্তিতে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। একইভাবে বুকব্যথা হলেই হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, এমনও নয়—অন্য কারণও থাকতে পারে। মূল বিষয় হলো, বিপজ্জনক কারণগুলো দ্রুত শনাক্ত করা।

বুকব্যথাকে নিজে থেকে গ্যাসের ব্যথা ধরে নেবেন না। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণের সঙ্গে মিল থাকলে বা ব্যথার কারণ বুঝতে না পারলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। সন্দেহের ক্ষেত্রে দেরি করার চেয়ে জরুরি বিভাগে মূল্যায়ন করানোই নিরাপদ।

পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

১. গ্যাসের ব্যথা কি বুকের বাঁ পাশে হতে পারে?

হ্যাঁ, গ্যাস বা পরিপাকতন্ত্রের সমস্যায় বুকের আশপাশে অস্বস্তি হতে পারে। তবে বুকের বাঁ পাশে ব্যথা হলে সেটিকে শুধু গ্যাস বলে ধরে নেওয়া যাবে না। হার্টের সমস্যাও এমন ব্যথার কারণ হতে পারে।

২. হার্টের ব্যথা কি গ্যাসের মতো মনে হতে পারে?

হ্যাঁ। হার্ট অ্যাটাকের সময় বুকজ্বালা, বদহজম, পেটের ওপরের অংশে ব্যথা কিংবা বমি বমি ভাব হতে পারে। তাই লক্ষণের মিল থাকলে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

৩. ঢেকুর উঠলে কি বুঝব ব্যথা গ্যাসের?

না। ঢেকুর ওঠা বদহজমের লক্ষণ হতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে হার্টের সমস্যা বাদ দেওয়া যায় না। বুকব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম বা হাত-চোয়ালে ব্যথা থাকলে জরুরি চিকিৎসা নিন।

৪. হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা কতক্ষণ থাকে?

হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে বা কমে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই রকম হয় না। ব্যথার সময়কাল দেখে একা সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়।

৫. বুকব্যথা হলে প্রথমে কী করা উচিত?

বুকের মাঝখানে চাপ, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম বা ব্যথা হাত-চোয়ালে ছড়িয়ে পড়লে জরুরি সহায়তা নিন। বাংলাদেশে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করতে পারেন। নিজে থেকে গ্যাসের ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করবেন না।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ