১৬ হাজার কর্মী থাকার পরও নিয়োগ, প্রশ্নের মুখে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক PLC-তে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও চাকরিবিধি সমন্বয়ের কাজ এখনও শেষ হয়নি। এর মধ্যেই বাইরে থেকে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ, বেতনকাঠামোয় বড় ব্যবধান এবং আমানত ফেরত নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। প্রায় ১৬ হাজার কর্মীর এই ব্যাংকে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের কাউকে কাউকে বিদ্যমান বেতনকাঠামোর তুলনায় প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেশি বেতন দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রায় ৯৮ শতাংশ আমানতকারী এখনও তাঁদের জমা অর্থ পুরোপুরি তুলতে পারছেন না।
পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংককে একীভূত করে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের লক্ষ্য ছিল পরিচালন ব্যয় কমানো ও দক্ষতা বাড়ানো। কিন্তু একীভূতকরণের পর কর্মীদের মধ্যে বেতনবৈষম্য দূর করা, ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার মতো বিষয়গুলো এখনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। এর মধ্যে নতুন নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘিরে কর্মী ও গ্রাহকদের অসন্তোষ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাইরের ব্যাংক থেকে নিয়োগ, বেতন নিয়েও প্রশ্ন
ব্যাংকটির জনবল পুনর্বিন্যাসের কাজ চলার সময়ই অন্য ব্যাংক থেকে সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসার পদে অন্তত ১৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বেতন বিদ্যমান বেতনকাঠামোর তুলনায় প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেশি।
নিয়োগের এই উদ্যোগ শুধু কর্মকর্তা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই। গতকাল ব্যাংকের নিরাপত্তা বিভাগে একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও একাধিক নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাইরের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা মিলিয়ে প্রায় ১৫ জনের মতো নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
তবে নতুন কর্মকর্তা যুক্ত করার পাশাপাশি আগে থেকেই কর্মরত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব, সুযোগ-সুবিধা ও বেতনকাঠামো কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের বেতনে বড় পার্থক্য থাকায় নতুন নিয়োগের বিষয়টি অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
একই পদে বেতনের পার্থক্য ১৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা
একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগের প্রতিষ্ঠান অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন বেতনকাঠামোর আওতায় রয়েছেন। ফলে পদ ও গ্রেড একই হলেও তাঁদের বেতনে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র অফিসার থেকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার পর্যায় পর্যন্ত এই ব্যবধান ১৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা। বেতনবৈষম্য নিরসন না হওয়ায় কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
কর্মীদের প্রত্যাশা, অভিন্ন সার্ভিস রুলস বা চাকরিবিধি প্রণয়নের পাশাপাশি সব কর্মীর জন্য সমন্বিত বেতনকাঠামো চালু করা হবে। তাঁদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর না হলে একই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে বৈষম্য ও মনোবলহীনতা আরও বাড়তে পারে।
পরিচালনা পর্ষদ অভিন্ন বেতন মডেল তৈরির উদ্যোগ নিলেও তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ফলে একীভূতকরণের পর কর্মীদের চাকরিসংক্রান্ত কাঠামোতে সমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
মেয়াদ শেষ হলেও আমানত ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সংকট কেবল কর্মী ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। আমানত উত্তোলন ও মেয়াদি আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে।
গ্রাহকদের দাবি, প্রায় ৯৮ শতাংশ আমানতকারী তাঁদের গচ্ছিত অর্থের সম্পূর্ণ অংশ এখনও উত্তোলন করতে পারছেন না। ফলে ব্যাংকে জমা থাকা অর্থ প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে না পারার পরিস্থিতি তাঁদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রেও জটিলতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় তিন মাসের সময়সীমা বাড়িয়ে নয় মাস করা হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার পর টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা।
এর পাশাপাশি পুরো আসল টাকা এককালীন উত্তোলনের ক্ষেত্রে ‘চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এভাবে আসল অর্থ তুলে নিলে গ্রাহকেরা তাঁদের অর্জিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
অর্থাৎ, ব্যাংকটির সামনে শুধু কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় আনার প্রশ্ন নয়, আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলন ও মুনাফা পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য: নিয়োগের প্রয়োজন ছিল, তবে লক্ষ্য পুরোনো কর্মীরা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসানের বক্তব্য, আগের ব্যাংকগুলোর অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটির পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছিল। সেই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার প্রয়োজন থেকেই বাইরে থেকে কিছু দক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হয়েছে।
তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের মূল লক্ষ্য বিদ্যমান প্রায় ১৬ হাজার কর্মীকে সর্বোচ্চ কার্যকরভাবে কাজে লাগানো। কর্মীদের জন্য গ্রহণযোগ্য বেতনকাঠামো তৈরির কাজও চলছে, যদিও সেটি সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগবে।
চেয়ারম্যানের বক্তব্যে একদিকে বাইরের দক্ষ জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে, অন্যদিকে বিদ্যমান কর্মীদের কাজে লাগানো ও বেতনকাঠামো সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
স্থিতিশীলতা ফেরানোর আগে বড় নিয়োগ নয়, মত অর্থনীতিবিদের
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। তবে ব্যাংকটি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছানোর আগে বড় পরিসরে নিয়োগ দেওয়া সমীচীন নয়।
তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের প্রধান মনোযোগ থাকা উচিত প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুরে দাঁড় করানোর দিকে। অর্থাৎ, নতুন নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
এই অবস্থান নতুন নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি নাকচ করে না; বরং ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়োগের পরিসর ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেয়।
নিয়োগের বিষয়ে অবগত নয় বাংলাদেশ ব্যাংক
নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জানা নেই।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একীভূতকরণের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে একই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে বড় ধরনের বেতনবৈষম্য তৈরি হলে অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের বৈষম্যকে বাংলাদেশ ব্যাংক সমর্থন করে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
ফলে নতুন নিয়োগের বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকলেও কর্মীদের মধ্যে বেতনসংক্রান্ত বৈষম্য দূর করার প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় রয়েছে।
পাঁচ ব্যাংক নিয়ে গঠিত নতুন প্রতিষ্ঠানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক—এই পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক PLC গঠন করা হয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাংককে এক প্রতিষ্ঠানের অধীনে আনার মধ্য দিয়ে বড় একটি ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই কাঠামোকে কার্যকর করতে বিদ্যমান কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন, বেতনবৈষম্য দূরীকরণ এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়গুলো সমাধান করা প্রয়োজন।
বর্তমানে ব্যাংকটির সামনে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে—প্রায় ১৬ হাজার কর্মীর মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা, অভিন্ন চাকরিবিধি ও বেতনকাঠামো চূড়ান্ত করা এবং গ্রাহকদের আমানত উত্তোলনসংক্রান্ত অভিযোগের সমাধান।
নতুন নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি এসব বিষয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তার ওপরই ব্যাংকটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভর করছে।
FAQ: পাঠকদের সাধারণ প্রশ্ন
১. সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কয়টি ব্যাংক নিয়ে গঠিত?
পাঁচটি ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গঠিত।
২. সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে কতজন কর্মী রয়েছেন?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটিতে বর্তমানে প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
৩. নতুন নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ কী?
বিদ্যমান বিপুল জনবলের পাশাপাশি বাইরের ব্যাংক থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ এবং তাঁদের কাউকে কাউকে প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেশি বেতন দেওয়ার অভিযোগ বিতর্কের কারণ।
৪. ব্যাংকটির কর্মীদের বেতনবৈষম্য কত?
জুনিয়র অফিসার থেকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার পর্যায়ে একই পদ ও গ্রেডের কর্মীদের বেতনে ১৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যবধান রয়েছে।
৫. আমানতকারীদের কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে?
গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রায় ৯৮ শতাংশ আমানতকারী তাঁদের সম্পূর্ণ আমানত তুলতে পারছেন না। মেয়াদি আমানতের মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত না পাওয়া এবং এককালীন আসল অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে অর্জিত মুনাফা হারানোর ঝুঁকি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- আপনার নামে কত জমি আছে, কোথায় কোথায় আছে—অনলাইনে জানবেন যেভাবে
- জমির নামজারি করতে কী কী লাগে, খরচ কত ও সময় কত দিন?
- Honor Magic9 Pro Max: ৮৮০০mAh ব্যাটারি ও ডুয়াল ২০০MP ক্যামেরা
- ৬ কোম্পানির ডিভিডেন্ড ঘোষণা
- ওয়ারিশ সনদ দিয়ে জমি নামজারি করবেন যেভাবে, জানুন নিয়ম
- আজকের সোনার দাম: ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেটের নতুন দর
- আজকের সোনার দাম: প্রতি ভরি ১৮, ২১, ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম কত
- জিকিউ বলপেনের ১২.৫০% নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা
- Infinix Smart 20E: ১২০Hz ডিসপ্লে ও বড় ব্যাটারি?
- iQOO Neo 12: ১৮৫Hz ডিসপ্লে ও ৯০০০mAh ব্যাটারির চমক
- অনলাইনে জমির নামজারি করবেন যেভাবে, খরচ ১১৭০ টাকা
- লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে? জানুন নিয়ম
- ব্রাজিলের পরবর্তী দুই ম্যাচ কবে, কখন ও প্রতিপক্ষ কারা?