ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

জমির পর্চা অনলাইনে পাওয়ার নিয়ম, আবেদন ফি ও প্রয়োজনীয় তথ্য

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৫ ১৬:৫০:৩০
জমির পর্চা অনলাইনে পাওয়ার নিয়ম, আবেদন ফি ও প্রয়োজনীয় তথ্য

জমির পর্চা বা খতিয়ান সংগ্রহ করতে এখন ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদন করা যায়। বাংলাদেশ সরকারের ভূমি রেকর্ড ও মৌজা ম্যাপ সিস্টেমে জমির খতিয়ান অনুসন্ধান, অনলাইন কপি সংগ্রহ এবং সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করার সুবিধা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন জমির অবস্থান, মৌজার নাম এবং খতিয়ান বা দাগ নম্বরের মতো কিছু মৌলিক তথ্য। খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলেও নির্দিষ্ট অনুসন্ধান পদ্ধতিতে রেকর্ড খুঁজে দেখার সুযোগ রয়েছে।

জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির রেকর্ড যাচাই কিংবা জমির কাগজপত্র প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পর্চা গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনলাইন কপি ও সার্টিফাইড কপির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই আবেদন করার আগে সঠিক খতিয়ান শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী কপির ধরন নির্বাচন এবং সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত ফি যাচাই করা জরুরি।

জমির পর্চা অনলাইনে কোথায় পাওয়া যাবে?

জমির পর্চা খোঁজা ও কপির জন্য আবেদন করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি রেকর্ড ও মৌজা ম্যাপ সিস্টেম ব্যবহার করতে হবে।

সরকারি ওয়েবসাইট: https://dlrms.land.gov.bd/

এখানে সার্ভে খতিয়ান, নামজারি খতিয়ান এবং মৌজা ম্যাপসংক্রান্ত সেবা পাওয়া যায়। ওয়েবসাইটে জমির বিভাগ, জেলা, উপজেলা বা থানা, খতিয়ানের ধরন এবং মৌজার তথ্য নির্বাচন করে অনুসন্ধান করা যায়। খতিয়ান পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী কপির জন্য আবেদন করা যাবে।

ভূমিসেবা সম্পর্কে অন্যান্য তথ্য জানতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি পোর্টাল https://land.gov.bd/ ব্যবহার করা যেতে পারে।

জমির পর্চা অনলাইনে পাওয়ার নিয়ম

অনলাইনে জমির পর্চা সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা যায়।

১. সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

প্রথমে https://dlrms.land.gov.bd/ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। সেখানে ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবার আওতায় সার্ভে খতিয়ান অথবা নামজারি খতিয়ানের সংশ্লিষ্ট অপশন নির্বাচন করুন।

২. জমির অবস্থান ও খতিয়ানের ধরন নির্বাচন করুন

জমিটি যে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা বা থানায় অবস্থিত, সেগুলো নির্বাচন করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের ধরন এবং মৌজার নাম নির্ধারণ করুন।

পুরোনো জমির রেকর্ড খুঁজতে গেলে কোন জরিপের খতিয়ান প্রয়োজন, সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস খতিয়ানের তথ্য এক নয়। তাই সঠিক জরিপ নির্বাচন না করলে প্রয়োজনীয় রেকর্ড খুঁজে পেতে সমস্যা হতে পারে।

৩. খতিয়ান নম্বর বা দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করুন

খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সেটি দিয়ে অনুসন্ধান করা সবচেয়ে সহজ। নম্বর জানা না থাকলে ওয়েবসাইটের ‘অধিকতর অনুসন্ধান’ অপশন ব্যবহার করে দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করুন।

একই নামের একাধিক জমির মালিক থাকতে পারেন। তাই শুধু নামের ওপর নির্ভর না করে মৌজা, দাগ নম্বর এবং জরিপের ধরন মিলিয়ে রেকর্ড শনাক্ত করুন।

৪. সঠিক খতিয়ান নির্বাচন করুন

অনুসন্ধানের ফলাফলে পাওয়া খতিয়ানগুলোর তথ্য ভালোভাবে যাচাই করুন। মালিকের নাম, খতিয়ান নম্বর, মৌজা এবং দাগ নম্বর মিলিয়ে প্রয়োজনীয় রেকর্ডটি নির্বাচন করুন।

ভুল খতিয়ান নির্বাচন করলে অন্য জমির তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাই আবেদন করার আগে প্রতিটি তথ্য মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

৫. প্রয়োজনীয় কপির জন্য আবেদন করুন

খতিয়ান নির্বাচন করার পর প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইন কপি অথবা সার্টিফাইড কপির প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।

সার্টিফাইড কপির ক্ষেত্রে সরকারি সিস্টেমের নির্দেশনা অনুযায়ী খতিয়ান কার্টে যোগ করতে হবে। এরপর আবেদন ফরম পূরণ, চেকআউট এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে।

৬. কপি সংগ্রহ করুন

অনলাইন কপির আবেদন সম্পন্ন হলে পোর্টালে প্রদর্শিত নির্দেশনা অনুযায়ী কপি সংগ্রহ করুন। সার্টিফাইড কপির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে খতিয়ান প্রস্তুত হওয়ার পর ডাক বিভাগের মাধ্যমে সরবরাহ করা হতে পারে।

আবেদনের সময় দেওয়া তথ্য ও যোগাযোগের মাধ্যম ঠিক আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করুন।

জমির পর্চা তুলতে কত টাকা লাগে?

জমির পর্চার ফি কপির ধরন এবং সরকারি সিস্টেমে কার্যকর ফি নির্ধারণের ওপর নির্ভর করে। ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সিস্টেমের বর্তমান প্রদর্শিত তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন বা তাৎক্ষণিক কিউআর কোডযুক্ত খতিয়ান কপি এবং সার্টিফাইড কপির ফি ১২০ টাকা দেখানো হচ্ছে।

তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাধারণ ফি-তথ্য পৃষ্ঠায় অনলাইন খতিয়ানের জন্য ১০০ টাকা এবং ডাকযোগে সার্টিফাইড কপি পেতে ১০০ টাকা সরকারি ফি ও ৪০ টাকা ডাক মাশুলের উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত হালনাগাদ ফি যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

সরকারি ফি যাচাইয়ের জন্য দেখুন:

ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সিস্টেম: https://dlrms.land.gov.bd/

ভূমিসেবার নির্ধারিত ফি: https://land.gov.bd/vumisheba-fee

মনে রাখবেন: নামজারি বা মিউটেশনের খতিয়ান তৈরির ফি আর আগে থেকে থাকা খতিয়ানের কপি সংগ্রহের ফি এক নয়। দুটি সেবাকে এক করে দেখা উচিত নয়।

খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলে কী করবেন?

খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলেও জমির রেকর্ড খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা যায়। এ ক্ষেত্রে জমির মৌজার নাম, দাগ নম্বর এবং রেকর্ডভুক্ত মালিকের নাম কাজে আসতে পারে।

প্রথমে সরকারি ওয়েবসাইটে ‘অধিকতর অনুসন্ধান’ অপশন ব্যবহার করুন। এরপর জমির অবস্থান ও জরিপের ধরন নির্বাচন করে পাওয়া রেকর্ডগুলো যাচাই করুন।

আরও পড়ুন:

জমির খতিয়ান অনলাইনে বের করবেন যেভাবে, জেনে নিন পুরো নিয়ম

জমির দলিল হারিয়ে গেলে নতুন কপি পাবেন যেভাবে

পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে কী করবেন? নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার নিয়ম

অনলাইনে তথ্য না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস অথবা জেলা প্রশাসনের রেকর্ড রুমে যোগাযোগ করা যেতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো জরিপের খতিয়ান বা ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত না হওয়া রেকর্ডের ক্ষেত্রে সরাসরি অনুসন্ধানের প্রয়োজন হতে পারে।

অনলাইন পর্চা ও সার্টিফাইড পর্চার পার্থক্য

অনলাইন পর্চা হলো সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে পাওয়া ডিজিটাল খতিয়ান কপি। অন্যদিকে, সার্টিফাইড পর্চা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সত্যায়িত কপি হিসেবে সরবরাহ করা হয়।

সাধারণ তথ্য যাচাইয়ের জন্য অনলাইন কপি কাজে আসতে পারে। তবে আদালত, জমি নিয়ে বিরোধ, রেজিস্ট্রেশন বা অন্য কোনো আনুষ্ঠানিক কাজে কপি জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নেওয়া উচিত কোন ধরনের কপি প্রয়োজন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খতিয়ান জমির রেকর্ডসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি হলেও শুধু খতিয়ান দেখেই সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মালিকানা নির্ধারণ করা যায় না। জমির দলিল, নামজারি, উত্তরাধিকার এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রও যাচাই করতে হয়।

অনলাইনে জমির পর্চা না পাওয়া গেলে করণীয়

সরকারি ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান করেও খতিয়ান পাওয়া না গেলে প্রথমে তথ্যগুলো আবার যাচাই করুন। বিশেষ করে মৌজার নামের বানান, খতিয়ানের ধরন, দাগ নম্বর ও মালিকের নাম ঠিক আছে কি না, তা দেখুন।

এরপর খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সেটি দিয়ে আবার অনুসন্ধান করুন। তাতেও ফল না এলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা জেলা রেকর্ড রুমে যোগাযোগ করুন।

অনলাইনে রেকর্ড না পাওয়া মানেই জমির কোনো রেকর্ড নেই—এমন নয়। পুরোনো নথি, তথ্যের অমিল অথবা ডিজিটাল ডেটাবেইসে রেকর্ড না থাকার কারণেও অনুসন্ধানে ফল নাও আসতে পারে।

জমির পর্চা অনলাইনে পাওয়ার বিষয়ে সাধারণ প্রশ্ন

১. মোবাইল দিয়ে কি জমির পর্চা তোলা যায়?

হ্যাঁ। স্মার্টফোনের ব্রাউজার ব্যবহার করে সরকারি ভূমি রেকর্ড ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যায়। সেখান থেকে খতিয়ান অনুসন্ধান ও কপির জন্য আবেদন করা সম্ভব।

২. খতিয়ান নম্বর ছাড়া কি জমির পর্চা পাওয়া সম্ভব?

হ্যাঁ, খতিয়ান নম্বর না থাকলেও দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে ‘অধিকতর অনুসন্ধান’ সুবিধায় রেকর্ড খোঁজার চেষ্টা করা যায়। তবে সঠিক মৌজা ও জরিপের তথ্য জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়।

৩. জমির পর্চা অনলাইনে তুলতে কত টাকা লাগে?

ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সিস্টেমে বর্তমানে অনলাইন বা তাৎক্ষণিক কপি এবং সার্টিফাইড কপির জন্য ১২০ টাকা প্রদর্শিত হচ্ছে। তবে সরকারি ফি-তথ্য পৃষ্ঠায় কিছু সেবার জন্য ভিন্ন অঙ্ক রয়েছে। তাই আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট সেবার হালনাগাদ ফি যাচাই করতে হবে।

৪. অনলাইন পর্চা কি জমির মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ?

শুধু পর্চার ভিত্তিতে সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মালিকানা নির্ধারণ করা যায় না। জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

৫. অনলাইনে খতিয়ান না পাওয়া গেলে কোথায় যোগাযোগ করব?

সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস অথবা জেলা প্রশাসনের রেকর্ড রুমে যোগাযোগ করতে পারেন। জমির মৌজা, দাগ নম্বর ও জরিপের তথ্য সঙ্গে রাখলে রেকর্ড অনুসন্ধানে সুবিধা হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: