ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২

Alamin Islam

Senior Reporter

বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কিন্তু কেন?

প্রবাসী ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৫ নভেম্বর ১৬ ১২:৫১:২৯
বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কিন্তু কেন?

আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশিদের ভিসা প্রাপ্তি কঠিন হয়ে উঠেছে। বিদেশে পড়াশোনা, কাজ বা ভ্রমণে আগ্রহীরা অভিযোগ করেছেন, ভ্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের ভিসা দিতে অনেক দেশ অনীহা দেখাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভিসার অপব্যবহার এবং দেশের ভাবমূর্তির অবনমনের কারণে এই অপ্রত্যাশিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি তানজুমান আলম ঝুমার মতো অসংখ্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। হাঙ্গেরি ও যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নের জন্য বৃত্তি পেলেও দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে ভিসা জটিলতার গেরোয় আটকে থেকেছেন তিনি। ঝুমা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গত বছরের অক্টোবর থেকে এই নভেম্বর পর্যন্ত বুদাপেস্ট ও ওয়াশিংটনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েও কোনোটিতেই সফলতা মেলেনি।

এই ভিসা সংকট কেবল শিক্ষাক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বহু দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিরা এবং শ্রমবাজারে কাজের সন্ধানে থাকা ব্যক্তিরাও সহজে ভিসা পাচ্ছেন না। এমনকি ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো যে দেশগুলো এতদিন ভিসা সহজলভ্য করেছিল, তারাও এখন অনেক ক্ষেত্রে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বলে খাত-সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন।

পর্যটন খাতের উদ্বেগ: কোন দেশগুলো ভিসা দিচ্ছে না?

পর্যটন ও শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ বা কর্মসংস্থানের জন্য ভিসা দিতে অস্বীকার করছে। ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)-এর সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ভারত, কাতার, ইউএই, ওমান, সৌদি আরব, বাহরাইন, উজবেকিস্তান এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো এখন কার্যত ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, থাইল্যান্ডের ভিসা পেতে অনেক বেশি সময় লাগছে, সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার ভিসার রেশিও কম, ফিলিপাইনও সময়ক্ষেপণ করছে এবং ইন্দোনেশিয়ার ভিসা ফি অনেক বেশি। এমনকি অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা থাকা শ্রীলঙ্কার ইলেক্ট্রনিক ভিসাও এখন দুই-তিন দিন সময় নিচ্ছে।

পর্যটন ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন সেলিমের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত প্রতি বছর পাঁচ থেকে ছয় লাখ ভি১, ভি২ ভিসা দিয়ে থাকে। কিন্তু চলতি বছর মার্কিন দূতাবাস দুই লাখের বেশি ভিসা দিয়েছে বলে মনে হয় না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২৩-২৪ সালে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদী ভিসা দিলেও, এই বছর তারা ভিসা দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে।

ভিসা প্রত্যাখ্যানের মূল কারণ: বিশ্বাসযোগ্যতার অবনমন

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমস্যার উৎস দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার চেয়েও গভীরে প্রোথিত। তাদের মতে, ভিসা লাভের সুযোগ নিয়ে বা তার অপব্যবহার করে বাংলাদেশিদের একটি অংশের অনিয়মিত পথে অন্য দেশে প্রবেশের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিশ্বস্ততাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, "ভিসা পাওয়ার সুযোগে বা এটাকে অপব্যবহার করে অনেকে কিন্তু অনিয়মিতভাবেও যাচ্ছে। এবং সে প্রবণতার কারণেই আমার ধারণা যে দেশগুলোতে খুব বেশি অভিবাসনবিরোধী বাতাবরণ নেই সেই দেশগুলোও কিন্তু এখন সতর্ক হচ্ছে। যেমন ধরুন ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড।"

এছাড়াও, অসৎ ব্যবসায়ীদের ভ্রমণ ভিসায় লোক পাঠিয়ে পরে তা শ্রমিক ভিসায় রূপান্তরের অভিযোগ আছে। বিদেশে গিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রকাশ্য কোন্দল ও বিবাদে জড়িয়ে পড়াও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে অল্প সংখ্যক মানুষের 'আইন বহির্ভূত' কাজের ফল অনেক বেশি সংখ্যক মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।

পাসপোর্ট র‍্যাংকিং ও রাজনৈতিক পটভূমি

পাসপোর্টের বৈশ্বিক মানদণ্ডেও বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থান এই জটিলতা বৃদ্ধির একটি কারণ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্য অনুসারে, দুর্বলতম পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন সপ্তম। বাংলাদেশি নাগরিকরা মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়া ভ্রমণের সুযোগ পান, যার অধিকাংশই আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় অবৈধ অভিবাসনের সুযোগ খোঁজার প্রবণতা বৃদ্ধিও এই পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে।

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ভারত বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয়। এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক হিসেবে দেখা হলেও, ইউরোপ-আমেরিকার বহু দেশ অঘোষিতভাবে সব ধরনের ভিসা প্রদান কঠিন করে তুলেছে।

সমাধানের পথ: কূটনৈতিক সংলাপ ও দৃশ্যমান অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ

এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো: সবার আগে দেশের অভ্যন্তরে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া। পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা কয়েক মাস আগে ভিসা জটিলতা স্বীকার করে এর জন্য বাংলাদেশিদের কার্যকলাপকেই দায়ী করেছিলেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারতের ভ্রমণ ভিসার ক্ষেত্রে জটিলতা যেহেতু পুরোপুরি রাজনৈতিক, তাই নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ নেই। তবে ভারত বাদে অন্য দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যার নিরসন সম্ভব।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, অসৎ উপায়ে যারা বিদেশে লোক পাঠাচ্ছেন বা যাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে তা দৃশ্যমান করতে পারলে বর্তমান ভিসা জটিলতা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, "ডমেস্টিক জায়গায়... সমাধানের চেষ্টা করছি- এটা যদি দৃশ্যমান করতে পারি, তাহলে আমার ধারণা ভিসা প্রক্রিয়ার এই বাড়তি জটিলতা আমরা এই সাম্প্রতিককালে যা দেখছি সেটা থেকে হয়তো বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।"

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ