ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং বিক্রির প্রস্তুতি

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২১ ১৫:১৩:৩২
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং বিক্রির প্রস্তুতি

বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার একটি বড় অংশ অন্য ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশ। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এই পোর্টফোলিও বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানীয় ব্যাংক ব্যবসাটি নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। সম্ভাব্য লেনদেনে পোর্টফোলিওর মূল্যায়ন করতে বাইরের পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টিও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত কয়েকজন ঊর্ধ্বতন ব্যাংকারের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার জন্য আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে লেনদেনের চূড়ান্ত কাঠামো, পরিধি বা নির্দিষ্ট সময়সূচি তুলে ধরা হয়নি।

৮ হাজার কোটি টাকার রিটেইল আমানত

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির রিটেইল এবং কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (সিএমএসএমই) পোর্টফোলিওর আকার ছিল ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ৩০ হাজার ৪২৩ কোটি টাকার পোর্টফোলিওর হিসাবে এটি প্রায় ২৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, একই সময়ে ব্যাংকটির মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে রিটেইল আমানতের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ২০ শতাংশ।

রিটেইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় সাধারণ গ্রাহকদের দৈনন্দিন বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা থাকে। সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব, শাখাভিত্তিক কার্যক্রম, এটিএম, মোবাইল অ্যাপ এবং ব্যক্তিগত ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সেবা এই ব্যবসার অংশ।

সম্ভাব্য ক্রেতাদের আলোচনায় সিটি ও ব্র্যাক ব্যাংক

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণে কয়েকটি ব্যাংক আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্ভাব্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের নাম আলোচনায় এসেছে। তবে এখনো দরদাতাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি এবং আনুষ্ঠানিক দরপত্র প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।

একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসাটি বাজারে প্রস্তাব করা হচ্ছে এবং সেটি বিডিং বা দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি হতে পারে। সম্ভাব্য ক্রেতাদের পোর্টফোলিওর মূল্য নির্ধারণে পরামর্শক নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের দিকে প্রক্রিয়াটি শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে আগ্রহী ব্যাংকগুলোর জন্য এখনো নির্দিষ্ট সময়সূচি দেওয়া হয়নি।

কেন আগ্রহ দেখাচ্ছে সম্ভাব্য ক্রেতারা

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসার প্রতি আগ্রহের একটি কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট এক ব্যাংকার ব্যাংকটির উচ্চ-মূল্যের গ্রাহকভিত্তির কথা উল্লেখ করেছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডে সম্পদশালী ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত গ্রাহকের অনুপাত তুলনামূলক বেশি। এসব গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে গড় ব্যালেন্সও বড়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন এবং অন্যান্য ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত উল্লেখযোগ্য একটি এমপ্লয়ি-ব্যাংকিং ব্যবসাও রয়েছে।

তবে রিটেইল পোর্টফোলিও অন্য ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হলেও সংশ্লিষ্ট সব গ্রাহক নতুন ব্যাংকে চলে যাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যাংকিং সম্পর্ক কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাখবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা গ্রাহকদেরই থাকবে।

পোর্টফোলিওর সঙ্গে কী কী যেতে পারে

সম্ভাব্য লেনদেনে শুধু গ্রাহক হিসাব নয়, আমানত, ঋণসম্পর্ক, কর্মী ও অবকাঠামোর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে সম্ভাব্য প্যাকেজের সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনো স্পষ্ট হয়নি।

সম্পর্কিত বিষয়ে ব্যাংকারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো লেনদেনের কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রস্তুত হতে বলা হয়েছে এবং পোর্টফোলিওর মূল্যায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কৌশলের সঙ্গেও মিল

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের রিটেইল ব্যবসা সীমিত করার উদ্যোগকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের মতে, এটি বরং ব্যাংকটির বৈশ্বিক ব্যবসায়িক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম কমাচ্ছে বা সীমিত করছে। একই সময়ে করপোরেট ব্যাংকিংয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মূলধনের ব্যয় বৃদ্ধি, বিদেশি বাজারে রিটেইল ব্যাংকিং পরিচালনার খরচ এবং কমপ্লায়েন্স ও অর্থপাচারবিরোধী বাধ্যবাধকতার ব্যয় বৃদ্ধিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতেও ব্যাংকটির রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম ছোট করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেখানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পোর্টফোলিওর একটি অংশ ফেডারেল ব্যাংকের কাছে বিক্রির চুক্তি হয়েছে, যা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশে এমন লেনদেনের নজির বিরল

বাংলাদেশে এর আগে ব্যাংক একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের ঘটনা ঘটেছে। তবে কোনো বিদেশি ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক পোর্টফোলিও আলাদাভাবে বিক্রির এমন নজির সংশ্লিষ্ট এক ব্যাংকারের জানা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই কারণে পুরো ব্যাংক বিক্রি বা একীভূত না করে একটি বিদেশি ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার একটি অংশ পৃথকভাবে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি বিরল লেনদেন হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

তবে কৃষি ঋণ ও কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (সিএমএসএমই) খাতসহ কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধ্যতামূলক নিয়ম রয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোকেও এসব বিধিবিধান মেনে চলতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি জানিয়েছেন।

কমেছে শাখা ও এটিএম

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং অবকাঠামোতেও গত কয়েক বছরে পরিবর্তন এসেছে। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের ১৮টি শাখা ও ৭০টি সেলফ-সার্ভিস টার্মিনাল রয়েছে।

পাঁচ বছর আগে ব্যাংকটির শাখা ছিল প্রায় ২৪টি। সে সময় এটিএম বুথের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৩ থেকে ৯৬টি।

এ ছাড়া কয়েক বছর আগে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জমা রাখার শর্ত চালু করা হয়। সম্প্রতি এমএফএস অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর সুবিধা বন্ধ করার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ