Md Razib Ali
Senior Reporter
সরকারি চাকরির পদোন্নতিতে বড় বদল, থাকছে যেসব নতুন নিয়ম
সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির সুযোগ পেয়েও তা গ্রহণ না করলে এবার শাস্তির মুখে পড়ার বিধান আসতে পারে। নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে যে নতুন বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে, তাতে যোগ্যতা অর্জনের পরও পদোন্নতি নিতে অনাগ্রহকে অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে পদোন্নতি গ্রহণের বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরকারি চাকরি আইনের আওতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থারও সুযোগ তৈরি হবে।
তবে শুধু পদোন্নতি গ্রহণের বিষয়টিই নয়, নতুন খসড়ায় এসিআরের নম্বর, বিচারাধীন মামলা, শাস্তির মেয়াদ, শূন্য পদ, নিয়োগের ধরন এবং বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার মতো বিষয়কে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এখনো অবশ্য পুরো বিধিমালাটি চূড়ান্ত হয়নি।
কেন পদোন্নতি না নেওয়ার বিষয়টি খসড়ায়
নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি অংশ, বিশেষ করে ঢাকায় কর্মরতদের মধ্যে সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ রয়েছে। পদোন্নতি হলে ঢাকার বাইরে বদলি হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে বর্তমান পদেই থাকার চেষ্টা করেন।
খসড়া বিধিমালায় এই প্রবণতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই যোগ্যতা পূরণ করার পরও কেউ পদোন্নতি নিতে না চাইলে সেটিকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারি চাকরি আইনে অসদাচরণের জন্য দুই ধরনের দণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। লঘুদণ্ডের মধ্যে তিরস্কার, পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত এবং মূল বেতনস্কেলের নিচের ধাপে অবনমিত করার বিধান রয়েছে।
গুরুদণ্ডের ক্ষেত্রে নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর এবং সরকারি চাকরি থেকে অপসারণের বিধান রয়েছে।
পদোন্নতির আগে এসিআরের হিসাব
নতুন ব্যবস্থায় পদোন্নতির যোগ্যতা যাচাইয়ে বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন বা এসিআরের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
খসড়া অনুযায়ী, পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিগত পাঁচ বছর অথবা সংশ্লিষ্ট ফিডার পদে চাকরির সময়—এই দুইয়ের মধ্যে যেটি কম, সেই সময়ের এসিআরের গড় নম্বর অন্তত ৮০ হতে হবে।
এখানেই শেষ নয়। কারও গড় নম্বর ৬৯-এর নিচে নেমে গেলে সেটিকে বিরূপ মন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করার বিধানও রাখা হয়েছে।
অবসরোত্তর ছুটি ভোগ করছেন—এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রেও পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়নি।
কোন শূন্য পদে পদোন্নতি হবে
পদোন্নতির ক্ষেত্রে পদটি খালি থাকলেই হবে না, সেটি পদোন্নতিযোগ্য শূন্য পদ হতে হবে। খসড়া বিধিমালায় এ ধরনের শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে লিয়েন কিংবা চলতি দায়িত্বের কারণে কোনো পদ শূন্য হলে সেই শূন্য পদকে পদোন্নতির জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
জ্যেষ্ঠতার হিসাবেও বদল
নতুন বিধিমালার আওতায় নন-ক্যাডার সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের নিয়ম নির্দিষ্ট করা হচ্ছে। একই পদে একাধিক ব্যক্তির অবস্থান নির্ধারণে শুধু নিয়োগের তারিখ নয়, নিয়োগের পদ্ধতি, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ফলাফলও বিবেচনায় আসবে।
উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যারা আগে নিয়োগ পেয়েছেন, একই পদ্ধতিতে পরে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় তারা জ্যেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
আবার কোনো কমিটি বা কমিশনের সুপারিশে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের মধ্যে কে আগে থাকবেন, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কমিটি বা কমিশনের মেধাতালিকা দেখা হবে।
মেধাতালিকা পাওয়া না গেলে বয়স হবে পরবর্তী ভিত্তি। বয়সও একই হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শিক্ষাবর্ষ এবং এরপর ফলাফল বিবেচনা করা হবে।
ফিডার পদে যোগদানের তারিখও গুরুত্বপূর্ণ
সমন্বিত জ্যেষ্ঠতার ক্ষেত্রে পদোন্নতিযোগ্য পদের ফিডার পদে নিয়মিত যোগদানের তারিখকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যদি একাধিক কর্মকর্তার যোগদানের তারিখ একই হয়, তাহলে বয়স দিয়ে তাদের অবস্থান নির্ধারণ করা হবে। বয়সও সমান হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শিক্ষাবর্ষ এবং পরে ফলাফল দেখা হবে।
এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ফিডার পদের মেধাক্রমও বিবেচনায় রাখা হবে।
মামলা চললে আটকে যাবে পদোন্নতি
শুধু যোগ্যতা বা জ্যেষ্ঠতা থাকলেই পদোন্নতি নিশ্চিত হবে না। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধরনের মামলা বা বিভাগীয় ব্যবস্থা চললে পদোন্নতি স্থগিত রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
বিভাগীয় অভিযোগনামা দাখিল, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় চার্জশিট দাখিল, ফৌজদারি মামলা দায়েরের সরকারি অনুমোদন অথবা গ্রেফতারের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি দেওয়া হবে না।
শাস্তির ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অপেক্ষার বিধান রয়েছে। লঘুদণ্ডের মেয়াদ এক বছর এবং গুরুদণ্ডের মেয়াদ দুই বছর হলে, দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও দুই বছর পর্যন্ত পদোন্নতি দেওয়া হবে না।
তবে মামলা বা অভিযোগ থেকে শেষ পর্যন্ত অব্যাহতি পাওয়া গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। বিভাগীয় মামলা, দুদকের মামলা বা ফৌজদারি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি এবং পদ শূন্য থাকা—এই দুই শর্ত পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি পাবেন। পাশাপাশি তার ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাও নির্ধারণ করা হবে।
পদোন্নতিতে কমিটি-কমিশনের সুপারিশ
উচ্চতর স্কেলে পদোন্নতির জন্য কমিটি বা কমিশনের সুপারিশ অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে খসড়ায়। বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোটার সীমাও মানতে হবে।
কোটার বাইরে অতিরিক্ত পদোন্নতি দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জ্যেষ্ঠতা পদোন্নতির তারিখ থেকে গণনা করা যাবে না।
অন্যদিকে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কোনো পদে একজন নিয়োগ পেলে এবং কমিটি বা কমিশনের সুপারিশ থাকলে তার জ্যেষ্ঠতা ওই পদে যোগদানের তারিখ থেকেই গণনা করা যাবে।
বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে আগে যাদের নাম সুপারিশ করা হবে, জ্যেষ্ঠতায় তারাই আগে থাকবেন। একই ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতির জন্য একসঙ্গে সুপারিশ করা হলে তাদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বয়স বিবেচনা করা হবে।
সরকার এখনো মতামত নিচ্ছে
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি) মো. মোস্তফা জামান যুগান্তরকে জানিয়েছেন, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে নতুন বিধিমালা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রক্রিয়াটি এখনো চলমান। একটি খসড়া প্রস্তুত করে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। নতুন বিধিমালায় কিছু নতুন বিধি যুক্ত হওয়ার বিষয়টি তিনি জানিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে নির্দিষ্ট করে কোন কোন পরিবর্তন থাকছে, তা বলা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে নতুন ঝুঁকি
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া নতুন উদ্যোগ নিয়ে ভিন্ন ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
যুগান্তরকে তিনি বলেন, যথাযথভাবে বিধিমালা তৈরি না হলে ভবিষ্যতে সরকারকে মামলা-মোকদ্দমার মুখে পড়তে হতে পারে। তার মতে, আগের বিধিমালা সংশোধনের পরিবর্তে নতুন করে বিধিমালা প্রণয়ন করা হলে জটিলতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে প্রস্তাবিত বিধিমালায় একদিকে যেমন পদোন্নতির যোগ্যতা, এসিআর ও জ্যেষ্ঠতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে পদোন্নতি গ্রহণ না করা, মামলা ও দণ্ডের মতো বিষয়েও স্পষ্ট বিধান আনার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে পুরো বিষয়টিই এখনো খসড়া পর্যায়ে থাকায় চূড়ান্ত বিধিমালায় এসব প্রস্তাবের পরিবর্তন হতে পারে।
তানভির ইসলাম/