Md Razib Ali
Senior Reporter
বিয়ের কাবিন বেশি ভালো নাকি কম, কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে
বিয়ের সময় কাবিন বা মহরের অঙ্ক নিয়ে অনেক পরিবারেই আলোচনা হয়—অঙ্কটি বেশি রাখা ভালো, নাকি সামর্থ্য অনুযায়ী কম রাখা উচিত? এ নিয়ে সামাজিকভাবে নানা ধারণা থাকলেও কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা দেখলে বিষয়টি অনেক বেশি পরিষ্কার হয়। ইসলামে মহর স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার; তবে শুধু অঙ্ক বড় হলেই সেটি বেশি উত্তম—এমন কথা কোরআন বা সহিহ হাদিসে বলা হয়নি। বরং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিসে সহজ ও সামর্থ্যের মধ্যে মহর নির্ধারণের দিকটি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
কাবিন বা মহর আসলে কী
ইসলামি বিবাহে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে যে নির্ধারিত অর্থ, সম্পদ বা মূল্যবান কিছু দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়, সেটিই মহর বা মোহর। বাংলাদেশে প্রচলিত ভাষায় এটি সাধারণত ‘কাবিন’ হিসেবে পরিচিত।
কোরআনে আল্লাহ বলেন, নারীদের তাদের মহর আন্তরিকভাবে দিয়ে দিতে। সূরা আন-নিসার ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, নারীদের তাদের প্রাপ্য মহর দিতে হবে; তবে স্ত্রী যদি নিজের ইচ্ছায় মহরের কোনো অংশ ছেড়ে দেন, তখন তা গ্রহণ করা বৈধ।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—মহর স্ত্রীর অধিকার। এটি কেবল বিয়ের কাগজে লেখা একটি অঙ্ক নয়।
কোরআনে কি বেশি কাবিন রাখার নির্দেশ আছে?
না। কোরআনে এমন কোনো সাধারণ নির্দেশ নেই যে বিয়েতে যত বেশি মহর নির্ধারণ করা হবে, তত বেশি সওয়াব বা মর্যাদা হবে।
বরং সূরা আন-নিসার ২০ নম্বর আয়াতে এমন পরিস্থিতির কথাও এসেছে, যেখানে কোনো স্ত্রীকে বিপুল পরিমাণ মহর দেওয়া হয়েছিল। সেখানে ‘কিনতার’ অর্থাৎ বিপুল সম্পদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, স্ত্রীকে তা দেওয়ার পর সেখান থেকে কোনো অংশ ফেরত নেওয়া যাবে না।
অর্থাৎ, বেশি মহর হওয়া নিজেই নিষিদ্ধ নয়। একজন ব্যক্তি যদি সামর্থ্য অনুযায়ী বড় অঙ্কের মহর নির্ধারণ করেন এবং সেটি স্ত্রীর অধিকার হিসেবে দেন, তাহলে শুধু অঙ্ক বেশি হওয়ার কারণে সেটিকে ইসলামবিরোধী বলা যায় না।
তবে এর বিপরীতটিও মনে রাখা জরুরি—বড় অঙ্ক লিখে রাখা আর বাস্তবে তা পরিশোধ করার সক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়।
কম কাবিন কি ইসলামে বেশি পছন্দনীয়?
এখানেই হাদিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সর্বোত্তম মহর হলো যা সহজ।” এই বর্ণনাটি আবু দাউদে এসেছে এবং আল-হাকিম এটিকে সহিহ বলেছেন।
এই হাদিসের আলোকে বোঝা যায়, মহর এমন হওয়া উচিত নয় যা বিয়েকে অযথা কঠিন করে তোলে বা স্বামীর ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে দেয়, যা বাস্তবে তার জন্য অসহনীয়।
তাই ‘কম’ মানেই যে যেকোনো অঙ্ক কমিয়ে দিতে হবে—বিষয়টি এমন নয়। বরং সহজ, যুক্তিসংগত এবং বাস্তবসম্মত মহর নির্ধারণের শিক্ষা পাওয়া যায়।
নবীজি (সা.)-এর যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
মহর খুব বড় অঙ্কের না হলেও যে বিয়ে হতে পারে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে সহিহ বুখারিতে।
হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি বিয়ের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তার কাছে মহর দেওয়ার মতো কিছু আছে কি না। লোকটি জানায়, তার কাছে কিছুই নেই। তখন নবীজি (সা.) এমনকি একটি লোহার আংটির কথাও উল্লেখ করেন। শেষ পর্যন্ত ওই ব্যক্তির জানা কোরআনের ভিত্তিতে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
এই ঘটনা থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে ইসলামে বিয়ের জন্য অত্যন্ত বড় অঙ্কের অর্থ বা সম্পদ থাকা আবশ্যিক শর্ত নয়।
আবার বড় মহরের উদাহরণও আছে
অন্যদিকে, ইসলামের ইতিহাসে তুলনামূলক বড় মহরের উদাহরণও পাওয়া যায়।
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর বিয়েতে স্বর্ণের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মহরের কথা এসেছে। নবীজি (সা.) তাকে বিয়ের পর ওয়ালিমা করার নির্দেশ দেন।
এতে বোঝা যায়, ইসলাম মহরের জন্য এমন কোনো একক অঙ্ক নির্ধারণ করে দেয়নি যে এর ওপরে হলে ভালো নয় বা এর নিচে হলে ভালো। পরিস্থিতি ও সামর্থ্য অনুযায়ী মহর ভিন্ন হতে পারে।
তাহলে বেশি কাবিন ভালো, নাকি কম?
কোরআন-হাদিসের সামগ্রিক নির্দেশনা থেকে বিষয়টি এভাবে বোঝা যায়:
শুধু অঙ্কের দিক থেকে বেশি কাবিনকে উত্তম বলা যায় না। একইভাবে শুধু কম অঙ্ক হওয়াকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তম বলা ঠিক নয়।
মূল বিষয় হলো—
মহর স্ত্রীর প্রকৃত অধিকার হিসেবে নির্ধারিত হওয়া;
স্বামীর সামর্থ্যের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া;
বিয়েকে অযথা কঠিন করে না তোলা;
নির্ধারিত মহর পরিশোধের বাস্তব ইচ্ছা ও সক্ষমতা থাকা;
স্ত্রীর সম্মতি ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া;
লোকদেখানো বা সামাজিক প্রতিযোগিতার জন্য অস্বাভাবিক অঙ্ক নির্ধারণ না করা।
হাদিসে সহজ মহরের প্রশংসা এবং নবীজি (সা.)-এর যুগে কম ও বেশি—দুই ধরনের মহরের উদাহরণ পাশাপাশি দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
কাবিন বেশি লিখে পরে না দেওয়া কি ঠিক?
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাবিননামায় যে মহর নির্ধারণ করা হয়, সেটি স্ত্রীর পাওনা হিসেবে গণ্য হয়। শুধু লোক দেখানোর জন্য বিশাল অঙ্ক লিখে রাখা, অথচ তা দেওয়ার কোনো বাস্তব পরিকল্পনা না থাকা ইসলামের মহরের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কোরআনের সূরা আন-নিসার ২০ নম্বর আয়াতে এমনকি বিপুল মহর দেওয়ার উদাহরণ দিয়ে তা ফেরত নেওয়া থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর ২১ নম্বর আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ‘দৃঢ় অঙ্গীকার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, মহরকে কেবল কাগজে লেখা একটি বড় সংখ্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির মূল উদ্দেশ্যই হারিয়ে যায়।
স্ত্রী কি নিজের ইচ্ছায় কাবিনের কিছু অংশ ছেড়ে দিতে পারেন?
হ্যাঁ, তবে সিদ্ধান্তটি অবশ্যই স্ত্রীর নিজের ইচ্ছায় হতে হবে।
সূরা আন-নিসার ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, স্ত্রী যদি নিজের সন্তুষ্টিতে মহরের কোনো অংশ ছেড়ে দেন, তাহলে স্বামী তা গ্রহণ করতে পারেন।
এখানে ‘নিজের সন্তুষ্টি’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক চাপ, ভয়, প্রতারণা বা জোর করে মহর মাফ করিয়ে নেওয়ার সঙ্গে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি এক নয়।
কাবিন নির্ধারণের সময় কী বিষয় দেখা উচিত?
বিয়ের সময় শুধু আত্মীয়-স্বজন বা সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে তুলনা না করে বাস্তব কিছু বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, বর কতটা বাস্তবসম্মতভাবে মহর পরিশোধ করতে পারবেন তা দেখা দরকার। দ্বিতীয়ত, কনের অধিকার ও সম্মতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, এমন অঙ্ক নির্ধারণ করা উচিত নয় যা শুধু কাগজে বড় দেখাবে কিন্তু পরিশোধের সময় বিরোধের কারণ হবে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মহরের মূল উদ্দেশ্য স্ত্রীকে একটি সম্মানজনক আর্থিক অধিকার দেওয়া; এটিকে বিয়ের প্রতিযোগিতা বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম বানানো নয়।
কোরআন-হাদিসের আলোকে মূল কথা
সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, কাবিন বেশি হলেই ভালো—এমন কোনো ইসলামি নিয়ম নেই। আবার কম হলেই যে সব ক্ষেত্রে উত্তম, তাও বলা যায় না।
কোরআন মহরকে নারীর অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর নবীজি (সা.)-এর হাদিসে সহজ মহরের প্রশংসা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে সহিহ হাদিসে কম মহরের উদাহরণ যেমন রয়েছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মহরের উদাহরণও রয়েছে।
তাই বিয়ের কাবিন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—অঙ্কটি কত বড়, তা নয়; বরং এটি কি ন্যায়সংগত, বাস্তবসম্মত এবং স্ত্রীর অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করছে কি না।
তথ্যসূত্র: কোরআন—সূরা আন-নিসা ৪:৪, ৪:২০-২১; সহিহ বুখারি ৫১৫০ ও ৫১৩২; সহিহ মুসলিম ১৪২৭; আবু দাউদ-ভিত্তিক বর্ণনা—‘সর্বোত্তম মহর হলো যা সহজ’।
আল-মামুন/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- বাংলাদেশ বনাম মালয়েশিয়া ম্যাচ কবে, কখন; কোথায় দেখবেন লাইভ
- ব্রাজিল বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ কবে, কখন, লাইভ দেখবেন যেভাবে
- ঢাকা থেকে সারাদেশে নতুন বাসভাড়া, কোন রুটে কত টাকা
- কম দামে কেনা শেয়ারে মুনাফার সুযোগ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা
- জনতা ব্যাংকের বোর্ড ভাঙার উদ্যোগ, সামনে এলো বড় অনিয়ম
- আজ ৯/২৩/২০২৬ তারিখ: ১৮ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট সোনার দাম কত
- সামান্য ভুলেই আটকে যেতে পারে নতুন পে স্কেলের বেতন
- আজকের সোনার দাম ২০২৬: ২২ ও ২১ ক্যারেটে কত বাড়ল
- শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরবেন, এনডিটিভিকে যা বললেন