ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

Md Razib Ali

Senior Reporter

বড় পাপে ডুবে গেছেন? কোরআন-হাদিসে ফিরে আসার পথ

ধর্ম ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৫ ১৯:৪৮:১৮
বড় পাপে ডুবে গেছেন? কোরআন-হাদিসে ফিরে আসার পথ

জীবনে বড় কোনো পাপ করে ফেললে অনেকে অনুশোচনায় ভোগেন, আবার কেউ কেউ মনে করেন, তাঁদের আর ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, ভুলের পর হতাশ হয়ে থেমে থাকা নয়; বরং অন্যায় থেকে সরে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নিজের কাজের সংশোধন করা। তবে তওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার নাম নয়। এর সঙ্গে পাপ ছেড়ে দেওয়া, ভবিষ্যতে তা থেকে দূরে থাকার সংকল্প এবং অন্যের অধিকার নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ও জড়িত।

শিরক, মানুষ হত্যা, ব্যভিচার, সুদ খাওয়া ও মা-বাবার অবাধ্যতার মতো কাজ ইসলামে কবিরা গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। শয়তানের প্ররোচনা, প্রবৃত্তির তাড়না কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে মানুষ এমন অন্যায়ে জড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু ভুলের পর তার করণীয় কী, কীভাবে খাঁটি তওবা করতে হবে এবং কোন বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি—সে বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে নির্দেশনা রয়েছে।

তওবা মানে শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়, ভুল থেকে ফিরে আসা

কোনো পাপের জন্য তওবা করতে হলে প্রথমেই সেই কাজ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে নিজের কৃতকর্মের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা এবং ভবিষ্যতে আর সেই পাপে না জড়ানোর দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে।

ইমাম নববি তাঁর রিয়াদুস সালিহিন গ্রন্থে তওবার তিনটি প্রধান শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—তাৎক্ষণিকভাবে পাপ ছেড়ে দেওয়া, কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই পাপ আর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া। গ্রন্থটির ১/১৪ পৃষ্ঠায় এ আলোচনা রয়েছে (দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)।

পবিত্র কোরআনের সুরা তাহরিমের ৮ নম্বর আয়াতেও মুমিনদের খাঁটি তওবা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়াতে ব্যবহৃত ‘তাওবাতুন নাসুহা’ বলতে আন্তরিক ও বিশুদ্ধ তওবাকে বোঝানো হয়।

অতএব, তওবার ক্ষেত্রে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়; নিজের আচরণ পরিবর্তনের আন্তরিক প্রচেষ্টাও প্রয়োজন।

অন্যের ক্ষতি করলে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে

সব পাপের সঙ্গে শুধু ব্যক্তির নিজের আমল বা আল্লাহর হকের বিষয় জড়িত থাকে না। কোনো মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ, তার প্রতি জুলুম কিংবা গিবতের মাধ্যমে সম্মানহানির মতো কাজ অন্যের অধিকারও ক্ষুণ্ন করে। এ ধরনের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার আদায়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

কারও সম্পদ নিয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্য কোনো অধিকার নষ্ট করলে যথাসম্ভব তা পূরণ করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

সহিহ বুখারির ২৪৪৯ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন, কারও কাছে তার ভাইয়ের সম্মান বা অন্য কোনো বিষয়ে পাওনা থাকলে দুনিয়াতেই তা মিটিয়ে নেওয়া উচিত। কারণ এমন এক দিন আসবে, যখন দিনার বা দিরহাম দিয়ে কোনো বিনিময় করা যাবে না।

এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, তওবার সঙ্গে মানুষের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও সম্পর্কিত। অন্যের ক্ষতি করে শুধু ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইলেই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

নিজের ভুলের জন্য অনুশোচনা কেন জরুরি

তওবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অনুশোচনা। নিজের ভুল উপলব্ধি না করলে তা থেকে ফিরে আসার আন্তরিকতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করা জরুরি।

সুনানে ইবনে মাজাহর ৪২৫২ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অনুশোচনাই হলো তওবা।’

মোল্লা আলী কারি তাঁর মিরকাতুল মাফাতিহ শারহু মিশকাতিল মাসাবিহ গ্রন্থে অনুশোচনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন (৪/১৬১৯, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০২)। অনুশোচনা মানুষকে নিজের ভুলের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং সংশোধনের পথ খুঁজতে সাহায্য করে।

তবে অনুশোচনা যেন কেবল সাময়িক আবেগে সীমাবদ্ধ না থাকে। যে কাজের জন্য অনুতপ্ত, তা থেকে সরে আসার বাস্তব পদক্ষেপও নিতে হবে।

আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না

বড় পাপের পর কেউ কেউ মনে করেন, তাঁদের অপরাধ এতটাই গুরুতর যে আল্লাহ আর ক্ষমা করবেন না। এ ধরনের হতাশা মানুষকে সংশোধনের পথ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিতে পারে। ইসলামে তাই আল্লাহর রহমতের প্রতি আশা রাখতে এবং তাঁর কাছে ফিরে আসতে উৎসাহিত করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সুরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, যারা নিজেদের ওপর অবিচার করেছে, তারা যেন তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন; তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

আয়াতটির শিক্ষা হলো, পাপের পরও ক্ষমা চাওয়ার আশা ধরে রাখতে হবে। তবে এই আশার অর্থ পাপকে তুচ্ছ মনে করা নয়; বরং অন্যায় থেকে ফিরে এসে আন্তরিকভাবে সংশোধিত হওয়ার চেষ্টা করা।

পাপের কথা প্রকাশ না করে সংশোধনের চেষ্টা করুন

কেউ ভুল করে পাপে জড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে গর্ব করা কিংবা অকারণে অন্যের কাছে প্রকাশ করে বেড়ানো ইসলামের শিক্ষা নয়। নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করাই গুরুত্বপূর্ণ।

সহিহ মুসলিমের ২৯৯০ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার সব উম্মতকে ক্ষমা করা হবে, তবে দোষ প্রকাশকারী ছাড়া।’

আল-আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি গ্রন্থে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন (১০/৪৮৬, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)।

তবে পাপ গোপন রাখার বিষয়টি অন্যের অধিকার নষ্ট করে তা আড়াল করার অনুমতি নয়। কোনো কাজের কারণে অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং ক্ষতি সংশোধনের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

তওবার পর ভালো কাজ বাড়ানোর নির্দেশনা

পাপ থেকে ফিরে আসার পর জীবনে সৎকাজের চর্চা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কাজ মানুষের আচরণ সংশোধনে সহায়তা করে এবং তাকে অন্যায় থেকে দূরে থাকার পথে এগিয়ে নেয়।

পবিত্র কোরআনের সুরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই পুণ্য কাজ পাপকে দূর করে দেয়।’

সুনানে তিরমিজির ১৯৮৭ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবি মুয়াজকে উপদেশ দিয়েছেন, যেখানেই থাকুন আল্লাহকে ভয় করতে এবং কোনো মন্দ কাজ হয়ে গেলে তার পরপরই ভালো কাজ করতে, যা ওই মন্দ কাজকে মুছে দেবে।

এই শিক্ষা অনুযায়ী, ভুল হয়ে গেলে হতাশ হয়ে বসে না থেকে সৎকাজের দিকে মনোযোগী হওয়া উচিত। তবে ভালো কাজ করার পাশাপাশি পাপ ত্যাগ, খাঁটি তওবা এবং মানুষের অধিকার আদায়ের বিষয়গুলোও বজায় রাখতে হবে।

বড় পাপের পর করণীয় কী?

কবিরা গুনাহের পর করণীয় হলো—আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া, নিজের ভুলের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা করা, পাপ অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে তা থেকে দূরে থাকার দৃঢ় সংকল্প করা। অন্যের অধিকার নষ্ট হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে বা যথাসম্ভব ক্ষতি পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি সৎকাজ বাড়িয়ে নিজের জীবন সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, পাপের ওপর অটল থাকা নয়, বরং ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসার চেষ্টা করাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই জীবনের শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা না করে এখনই অনুতপ্ত হওয়া, ক্ষমা চাওয়া এবং সংশোধনের পথে এগিয়ে যাওয়াই উচিত।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. বড় পাপ করলে কি আল্লাহ ক্ষমা করেন?

সুরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হতে বলা হয়েছে। তাই আন্তরিকভাবে তওবা করে তাঁর কাছে ফিরে আসা উচিত।

২. খাঁটি তওবার প্রধান শর্ত কী?

পাপ ছেড়ে দেওয়া, কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।

৩. অন্যের অধিকার নষ্ট করলে কী করতে হবে?

আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার পাওনা ফিরিয়ে দিতে হবে বা যথাসম্ভব ক্ষতি পূরণ করতে হবে।

৪. তওবার পর সৎকাজ করা কি জরুরি?

কোরআন ও হাদিসে ভালো কাজের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। পাপ থেকে ফিরে এসে সৎকাজ বাড়ানো উচিত, তবে পাপ ত্যাগ ও মানুষের হক আদায়ের দায়িত্বও পালন করতে হবে।

৫. নিজের পাপ অন্যের কাছে প্রকাশ করা কি উচিত?

অকারণে নিজের পাপ প্রচার করা উচিত নয়। তবে অন্যের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা সংশোধন ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: