সার কারখানা আছে, উৎপাদন নেই; সামনে এলো বড় সংকট
দেশের সার উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও গ্যাসের সংকটে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পরিস্থিতির সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে যমুনা ও আশুগঞ্জ সার কারখানায়। গত দুই বছরে যমুনা সার কারখানায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র তিন দিন। আর আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাসের অভাবে ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ১৯ মাস ধরে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এই তথ্য জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির বৈঠকে উঠে এসেছে। সার উৎপাদনের এই সংকটের মধ্যে দেশে উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বন্ধ ও পুরোনো কারখানাগুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
উৎপাদন সক্ষমতা আছে, নেই পর্যাপ্ত গ্যাস
যমুনা ও আশুগঞ্জ—দুই কারখানারই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান গ্যাসের সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগছে না।
জামালপুরের তারাকান্দির যমুনা সার কারখানা প্রতিদিন ১৭০০ টন দানাদার ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারে। এই কারখানার উৎপাদিত সার সরবরাহ করা হয় ১৯ জেলায়। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সেখানে টানা ২৩ মাস ৯ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল।
পরে ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর উৎপাদন আবার শুরু হলেও গ্যাস সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে কারখানাটিতে কার্যত মাত্র তিন দিন উৎপাদন হয়েছে।
চলতি বছরের ৭ জুন সংসদে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তার ভাষ্য ছিল, “গ্যাস সংকটের কারণে যমুনা সার কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। গ্যাস পাওয়া গেলে কারখানাটি চালাতে সমস্যা নেই।”
আশুগঞ্জেও একই বাস্তবতা
আশুগঞ্জ সার কারখানার চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নয়। ২০২৫ সালের ১ মার্চ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে সেখানে ইউরিয়া উৎপাদন থেমে আছে। কারখানাটির প্রতিদিন অন্তত ১১৫০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
গত জুনে সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আশুগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ না করার কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে গ্যাস সরবরাহ করতে হওয়ায় তখন আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
অর্থাৎ, একটি কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরু হলেও তা পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না, আর অন্যটি দীর্ঘ সময় ধরে পুরোপুরি উৎপাদনের বাইরে—দুই ক্ষেত্রেই গ্যাস সংকট বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
পাঁচ কারখানার চারটিতে একসঙ্গে উৎপাদন বন্ধ
রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর ওপর গ্যাস সংকটের প্রভাবের আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় গত ৬ মার্চ। সে সময় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া কারখানার মধ্যে চারটিতে ১৫ দিনের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল।
ওই সময়ে কেবল শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে উৎপাদন চলছিল। বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি কারখানাকে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
এই তথ্যগুলোই দেখাচ্ছে, সার উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সরবরাহের সীমাবদ্ধতা রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রমে বড় প্রভাব ফেলছে।
উৎপাদন বাড়াতে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ
এই পরিস্থিতিতে দেশে সার উৎপাদন বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি। আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তারা।
শুধু নতুন করে উৎপাদন বাড়ানো নয়, পুরোনো সার কারখানাগুলো আধুনিক করার ওপরও জোর দিয়েছে কমিটি। এসব কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া যেসব সার কারখানা পে-অফ করা হয়েছে, অর্থাৎ বন্ধ করে কর্মীদের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাও জানতে চেয়েছে কমিটি।
সার সরবরাহে তাৎক্ষণিক নজরদারি চায় কমিটি
উৎপাদনের পাশাপাশি সার কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় কত মজুত রয়েছে, সেটিও নজরদারির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটির পক্ষ থেকে এমন একটি ডিজিটাল রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে সার সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে।
সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন এমন ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
বীজ ও খাদ্য উৎপাদন নিয়েও নির্দেশনা
বৈঠকের আলোচনায় সার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বীজ উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ খাদ্য উৎপাদনের বিষয়ও ছিল।
বীজ উৎপাদনে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্য উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে কমিটি।
এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বৈঠকে বিসিআইসি ও বিএডিসির কার্যক্রম পর্যালোচনা
বুধবার সংসদ ভবনে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সংসদের চিফ হুইপ ও কমিটির সভাপতি নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম। পাশাপাশি বিএডিসির কার্যক্রম এবং বিসিআইসি ও বিএডিসির সার উৎপাদন, মজুদ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনাও পর্যালোচনা করা হয়।
কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া এবং মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বৈঠকে অংশ নেন।
শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিআইসি, বিএডিসি এবং সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
FAQ
যমুনা সার কারখানায় গত দুই বছরে কত দিন উৎপাদন হয়েছে?
শিল্প মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে যমুনা সার কারখানায় মাত্র তিন দিন উৎপাদন হয়েছে।
যমুনা সার কারখানায় আবার উৎপাদন কবে শুরু হয়েছিল?
২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সেখানে পুনরায় ইউরিয়া উৎপাদন শুরু হয়।
আশুগঞ্জ সার কারখানায় কখন থেকে উৎপাদন বন্ধ?
২০২৫ সালের ১ মার্চ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর থেকে আশুগঞ্জ সার কারখানায় ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
যমুনা সার কারখানার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা কত?
কারখানাটি প্রতিদিন ১৭০০ টন দানাদার ইউরিয়া উৎপাদনে সক্ষম।
সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি কী সুপারিশ করেছে?
দেশে সারের উৎপাদন বাড়ানো, আমদানি নির্ভরতা কমানো, পুরোনো কারখানা আধুনিক করা, বন্ধ কারখানার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা এবং সার সরবরাহে ডিজিটাল রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
আল-মামুন/