ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

‘নো পেপার, নাথিং পেপার’—শেয়ারবাজারে নতুন ব্যবস্থা

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০১ ১৬:৩০:৩২
‘নো পেপার, নাথিং পেপার’—শেয়ারবাজারে নতুন ব্যবস্থা

কাগজের লেনদেন থেকে পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাওয়ার পথে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার। আবেদন, অনুমোদন কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ—বাজারের কোনো ধাপই কাগজের ওপর নির্ভরশীল না রাখার পরিকল্পনা সামনে এসেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভরতা কমিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে শেয়ারবাজারের কাঠামোতে পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর সুবর্ণজয়ন্তী ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি শেয়ারবাজারের আধুনিকায়নে আইসিবির ভূমিকার বিষয়টিও সামনে আনেন।

আবেদন থেকে সিদ্ধান্ত—সবই হবে অনলাইনে

শেয়ারবাজারের ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে শুধু নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো বাজারব্যবস্থাকেই অটোমেশনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউজ এবং আইসিবিসহ বাজারের প্রতিটি পর্যায়ে শতভাগ অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের কাজ শুরু হয়েছে।

এই ব্যবস্থার আওতায় লিস্টিংয়ের আবেদন জমা দেওয়ার পর থেকে অনুমোদন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ‘নো পেপার ট্রানজেকশন, নাথিং পেপার’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

খুচরা বিনিয়োগকারী থেকে প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ

শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ কাঠামো নিয়েও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের বাজার দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত রিটেইল বা খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ক্যাপিটাল মার্কেটের চিত্র এর থেকে আলাদা। সেসব বাজার মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এই পার্থক্যের কারণে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে রিটেইলনির্ভর অবস্থা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীনির্ভর বাজারে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন আমির খসরু। এই পরিবর্তনে আইসিবিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও জানান তিনি।

পুরোনো কার্যক্রমের গণ্ডি পেরোতে হবে আইসিবিকে

আইসিবির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে দিকনির্দেশনা দেন। তার মতে, প্রতিষ্ঠানটিকে কেবল প্রচলিত বা ঐতিহ্যগত কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। বরং বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইসিবিকে বাজারভিত্তিক, প্রতিযোগিতামূলক ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে।

দেশের শেয়ারবাজারের পাশাপাশি সামগ্রিক আর্থিক খাতকে আধুনিক করার ক্ষেত্রেও আইসিবির কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আইসিবি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি গঠনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বাজারভিত্তিক শেয়ারবাজার গড়ে তোলা। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় আইসিবির মাধ্যমে মূলধন বাজারে এনে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও ছিল প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়েও নীতিগত অবস্থান

শেয়ারবাজারের পরিবর্তনের পাশাপাশি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়টিও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি জানান, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের নীতিগত অবস্থান হিসেবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য নতুন সুযোগ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও শেয়ারবাজার নিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কথাও অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন আমির খসরু।

সম্প্রতি নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটে বিশ্বের বড় ১৫টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রাতঃরাশ বৈঠকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও শেয়ারবাজার নিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আস্থা প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশে বৈশ্বিক পুঁজি প্রবেশের পরিবেশ তৈরিতে প্রাইভেট ফান্ড, ক্লাইমেট ফান্ডিং এবং ডেরিভেটিভস পণ্যের সুযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রচলিত ‘হাই স্ট্রিট ব্যাংকস’ নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আন্তর্জাতিক মানের আর্থিক চর্চার সঙ্গে নিজেদের অভ্যস্ত করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী।

আইসিবির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা

দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে আইসিবি ভবিষ্যতে আধুনিক, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ।

FAQ

১. বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে কী পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে?

শেয়ারবাজারের প্রতিটি পর্যায়ে শতভাগ অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুরো বাজারকে পেপারলেস করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২. ‘নো পেপার ট্রানজেকশন, নাথিং পেপার’ নীতির লক্ষ্য কী?

শেয়ারবাজারের লেনদেন ও কার্যক্রমে কাগজের ব্যবহার বাদ দিয়ে ডিজিটাল প্রক্রিয়া চালুর বিষয়টি এই নীতির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে।

৩. আইসিবিকে কেন আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা বলা হয়েছে?

দেশের শেয়ারবাজারকে রিটেইল বা খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর অবস্থা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীনির্ভর বাজারে রূপান্তরে আইসিবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা বলা হয়েছে।

৪. লিস্টিংয়ের প্রক্রিয়ায় কী পরিবর্তন আসতে পারে?

লিস্টিংয়ের আবেদন থেকে শুরু করে অনুমোদন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।

৫. বাংলাদেশে বৈশ্বিক পুঁজি আনার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে?

প্রাইভেট ফান্ড, ক্লাইমেট ফান্ডিং ও ডেরিভেটিভস পণ্যের মাধ্যমে বৈশ্বিক পুঁজি আনার পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ