ঢাকা, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ হাসিনাকে কেন গ্রহণ করেছিল ভারত, জানালেন দীনেশ

রাজনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৩ ১৬:৩০:৩৪
শেখ হাসিনাকে কেন গ্রহণ করেছিল ভারত, জানালেন দীনেশ

শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে এখনই কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারছে না ভারত। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং এর সঙ্গে আদালতও যুক্ত। ফলে প্রক্রিয়াটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়।

শনিবার ‘বে অফ বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড বলরুমে অনুষ্ঠিত একটি সেশনে প্রশ্নের জবাবে ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন দীনেশ ত্রিবেদী। একই আলোচনায় ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফিরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গেও একই ধরনের আইনগত প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের অবস্থান

আলোচনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে আসে। দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য, দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়।

বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক বজায় রাখবে, সেটি দেশটির নিজস্ব বিষয়। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষার যেমন অধিকার রয়েছে, ভারতেরও নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অধিকার রয়েছে বলে জানান তিনি।

তার মতে, প্রতিবেশী দুই দেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরস্পরের মর্যাদা ও সম্মানকে স্বীকৃতি দেওয়া।

দুই দেশের সম্পর্কের সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দীনেশ বলেন, এই সম্পর্ককে বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরোপুরি বোঝা কঠিন। নজরুলগীতি ও রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা হওয়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশেরই

বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণই নির্ধারণ করবেন।

বাংলাদেশের কী করা উচিত, তা অন্য কোনো দেশের পক্ষ থেকে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের কোনো প্রশ্ন নেই বলে মন্তব্য করেন দীনেশ।

বাংলাদেশের মানুষের ওপর ভারতের পূর্ণ আস্থা রয়েছে বলেও জানান তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনগণও বুঝবেন যে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের বিষয়টি কখনো সামনে আসবে না।

নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ককে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের মানুষ ভারতের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বোঝেন বলে উল্লেখ করেন দীনেশ ত্রিবেদী।

মতপার্থক্য থাকলে সমাধানের পথ কী

দুই দেশের সম্পর্কে মতবিরোধের প্রসঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদী পরিবারের উদাহরণ টানেন। তার বক্তব্য, একটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও যেমন বিভিন্ন বিষয়ে সমস্যা বা মতপার্থক্য তৈরি হতে পারে, দুই দেশের সম্পর্কেও তেমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।

গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে কোনো বিষয়ে বিরোধ তৈরি হলে সেটি সমাধানের পথ হিসেবে সংলাপ, আলোচনা, পরামর্শ এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ওপর জোর দেন তিনি।

দীনেশের বক্তব্যে, এই পুরো প্রক্রিয়ার ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন আস্থা।

এবার শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ

শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের আগের বক্তব্যগুলোর কথা উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিষয়টি নিয়ে ভারতের অবস্থান একাধিকবার পরিষ্কার করেছেন। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি একটি আইনগত ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। আদালতও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে।

এ কারণে কখন শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো সম্ভব নয় বলে জানান ভারতের হাইকমিশনার।

যে পরিস্থিতিতে ভারতে এসেছিলেন শেখ হাসিনা

শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে পৌঁছেছিলেন, সেই প্রশ্নেরও জবাব দেন দীনেশ ত্রিবেদী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী কিংবা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি।

ওই সময় বাংলাদেশে যে মর্মান্তিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই শেখ হাসিনা ভারতে এসেছিলেন বলে জানান তিনি। দীনেশ আরও বলেন, পৃথিবীর কোথাও যেন ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, যেখানে নিরপরাধ মানুষকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়—এটাই প্রত্যাশা।

তার বর্ণনায়, ওই সময় একটি সামরিক বিমান ভারতে এসেছিল। ভারতও এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। তিনি নিজে তখন টেলিভিশনে পরিস্থিতি দেখছিলেন এবং স্ক্রলে শেখ হাসিনা অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন—এমন খবর প্রচার হতে দেখেছিলেন।

তখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সেই বাস্তবতায় ভারতের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না বলে জানান দীনেশ ত্রিবেদী।

কেন ভারত গ্রহণ করেছিল

দীনেশ ত্রিবেদীর ব্যাখ্যায়, ওই পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই ভারতের দায়িত্ব ছিল। তার মতে, কোনো কোনো সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার জন্য কোনো দেশই আগে থেকে প্রস্তুত থাকে না।

ভারত যদি সেসময় শেখ হাসিনাকে গ্রহণ না করত, এমনকি তার বিমানকে অবতরণের অনুমতিও না দিত, তাহলে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা বলা কঠিন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সেই সময়কার ঘটনাকে তিনি ‘ঐতিহাসিক বাস্তবতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আলাদা। এখন শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি যে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, সেটি নিজস্ব গতিতেই এগোচ্ছে।

বাংলাদেশ যেমন একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ এবং দেশটির মানুষ আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাকে সম্মান করেন, ভারতও একইভাবে নিজেদের আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে জানান ভারতের হাইকমিশনার।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ