ঢাকা, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

শাহজালাল কেন বিশ্বসেরা ১০০ বিমানবন্দরের বাইরে?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৩ ১৬:৫৫:৩৪
শাহজালাল কেন বিশ্বসেরা ১০০ বিমানবন্দরের বাইরে?

বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রতিদিন এই বিমানবন্দর দিয়ে দেশে আসেন-যান হাজার হাজার প্রবাসী, পর্যটক ও ব্যবসায়ী। বিদেশি যাত্রীদেরও বড় একটি অংশ ব্যবহার করেন ঢাকার এই বিমানবন্দর। অথচ আন্তর্জাতিক যাত্রীমূল্যায়নের সর্বশেষ চিত্রে শাহজালালের অবস্থান বেশ পিছিয়ে। বিশ্বের ৫৭৫টির বেশি বিমানবন্দর নিয়ে করা স্কাইট্র্যাক্সের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে বিশ্বসেরা ১০০-তে জায়গা হয়নি ঢাকার এই বিমানবন্দরের। দক্ষিণ এশিয়ার সেরা দশেও নেই এটি।

বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও সেবাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর মধ্যেই সামনে এসেছে এই আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের তথ্য। এক নারী চিকিৎসক ও জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর শাহজালাল বিমানবন্দরের বিভিন্ন সেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে শুধু ঢাকার অবস্থান নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য বিমানবন্দরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলেও ব্যবধানটি স্পষ্ট হয়।

ভারতের পাঁচ বিমানবন্দর বিশ্বসেরা ১০০-তে

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বসেরা ১০০ বিমানবন্দরের তালিকায় জায়গা পেয়েছে শুধু ভারত। দেশটির পাঁচটি বিমানবন্দরই আগের বছরের তুলনায় নিজেদের অবস্থান এগিয়ে নিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে গোয়ার মনোহর বিমানবন্দর। আগের বছর ৮০তম অবস্থানে থাকা বিমানবন্দরটি এবার উঠে এসেছে ৬৪তম স্থানে। দিল্লির বিমানবন্দর ৩২তম থেকে ২৮তম হয়েছে।

ব্যাঙ্গালোরের অবস্থান সাত ধাপ উন্নতি করে ৪১তম। হায়দ্রাবাদ ১৩ ধাপ এগিয়ে ৪৩তম এবং মুম্বাই সাত ধাপ উন্নতি করে ৬৬তম স্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপালের কোনো বিমানবন্দর বিশ্বসেরা ১০০-এর তালিকায় স্থান পায়নি।

ঢাকার চেয়ে এগিয়ে কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর

শুধু বিশ্ব র‍্যাংকিং নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক তালিকাতেও শাহজালালের অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। আঞ্চলিক সেরা দশের নয়টি বিমানবন্দর ভারতের। তালিকাটিতে একমাত্র ভারত-বহির্ভূত বিমানবন্দর হলো শ্রীলঙ্কার কলম্বো, যার অবস্থান সপ্তম।

এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে দিল্লি। আঞ্চলিক সেরা বিমানবন্দরের স্বীকৃতিও পেয়েছে এটি। কর্মীদের সেবার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় এগিয়ে হায়দ্রাবাদ এবং আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে সেরা হয়েছে ব্যাঙ্গালোর।

আরও একটি বিষয় এই তুলনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চেন্নাই, কোচিন, আহমেদাবাদ ও কলকাতা বিশ্বসেরা ১০০-এর তালিকায় না থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক তালিকায় ঢাকার আগে রয়েছে।

চেন্নাইয়ের বিমানবন্দরের মানসনদও ঢাকার মতো ২-স্টার। অর্থাৎ মানসনদের দিক থেকে একই স্তরে থাকার পরও যাত্রীদের ভোটে চেন্নাই দক্ষিণ এশিয়ার ষষ্ঠ সেরা বিমানবন্দর হয়েছে। ঢাকার অবস্থান অবশ্য সেরা দশের মধ্যেও নেই।

কলকাতার বিমানবন্দরও ঢাকার আগে রয়েছে। একই আঞ্চলিক তালিকায় পাকিস্তানের করাচি ও লাহোর, নেপালের কাঠমান্ডু এবং মালদ্বীপের মালের মতো বিমানবন্দরও সেরা দশে জায়গা পায়নি। ফলে শাহজালালের অনুপস্থিতি একেবারে একক ঘটনা নয়। তবে বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হওয়া সত্ত্বেও ভারতের কোচিন বা আহমেদাবাদের মতো বিমানবন্দরের পেছনে থাকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

প্রবাসীদের নিয়মিত যাতায়াতের বিমানবন্দরগুলোর অবস্থান

বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের বড় অংশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার যোগাযোগ রয়েছে। প্রবাসীরা দেশে ফেরার সময় যেসব বিমানবন্দর বেশি ব্যবহার করেন, সেগুলোর অধিকাংশই স্কাইট্র্যাক্সের বিশ্বসেরা ১০০ তালিকায় রয়েছে।

এই তালিকায় দুবাই ১৩তম এবং রিয়াদ ১৪তম। বাহরাইন রয়েছে ২০তম স্থানে। আবুধাবি ২৪তম, জেদ্দা ২৭তম, মদিনা ৫০তম, দাম্মাম ৫৩তম, কুয়ালালামপুর ৬০তম এবং মাসকাট ৬৮তম অবস্থানে আছে।

রিয়াদের অগ্রগতিও উল্লেখযোগ্য। এক বছর আগে ২৪তম স্থানে থাকা বিমানবন্দরটি এবার ১৪তম হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নতি করা বিমানবন্দরের পুরস্কারও পেয়েছে রিয়াদ।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিত্রেও একই ধরনের অবস্থান দেখা যায়। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ২২তম, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক সুবর্ণভূমি ৩৬তম এবং ভিয়েতনামের হ্যানয় রয়েছে ৭১তম স্থানে।

যাত্রীদের অভিজ্ঞতার ওপরই তৈরি হয়েছে র‍্যাংকিং

স্কাইট্র্যাক্সের বিমানবন্দর মূল্যায়ন কোনো একটি নির্দিষ্ট সেবাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি। যাত্রীর বিমানবন্দরে প্রবেশ থেকে শুরু করে উড্ডয়নের আগের শেষ ধাপ পর্যন্ত অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ১০০টির বেশি দেশের যাত্রীরা অংশ নেন। মূল্যায়নের আওতায় ছিল ৫৭৫টির বেশি বিমানবন্দর।

চেক-ইন, আগমন, ট্রানজিট, কেনাকাটা, নিরাপত্তা তল্লাশি, ইমিগ্রেশন এবং বোর্ডিং গেট—যাত্রাপথের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে যাত্রীদের মতামত নেওয়া হয়। এই ভোটের ফল ১৮ মার্চ লন্ডনে প্রকাশ করা হয়।

এই মূল্যায়নে শাহজালালের নাম বিশ্বসেরা ১০০-তে না থাকলেও তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা যাচ্ছে না। কারণ স্কাইট্র্যাক্স প্রকাশিত ১০০টির পরের বিমানবন্দরগুলোর আলাদা ক্রম জানায় না। ফলে ৫৭৫টির বেশি বিমানবন্দরের মধ্যে শাহজালাল ঠিক কত নম্বরে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

শীর্ষে চাঙ্গি, সেরা পাঁচে এশিয়ার সব বিমানবন্দর

বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোর শীর্ষ অবস্থানেও এবার এশিয়ার আধিপত্য রয়েছে। সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর আবারও প্রথম হয়েছে। এ নিয়ে টানা ১৪তমবার বিশ্বের সেরা বিমানবন্দরের স্বীকৃতি পেল এটি।

দ্বিতীয় অবস্থানে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপানের টোকিও হানেদা। সেরা পাঁচের সব বিমানবন্দরই এশিয়ার।

এবার নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

থার্ড টার্মিনালকে ঘিরে পরিবর্তনের প্রত্যাশা

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে শাহজালালের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের প্রত্যাশার কথা উঠে এসেছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. রাগীব সামাদ জানিয়েছেন, বর্তমান বিমানবন্দরের যাত্রী ধারণক্ষমতা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। অতিরিক্ত যাত্রী চাপ সামলানো এবং বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা মোকাবিলার জন্যই দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে টার্মিনাল-৩ নির্মাণ করা হয়েছে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে নতুন টার্মিনালের কার্যক্রম বা পরিচালনা শুরু হওয়ার আশা রয়েছে। তখন বর্তমান অভিযোগগুলো আর থাকবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।

ব্যাগেজ নিয়ে অভিযোগের পেছনে কী বলছে কর্তৃপক্ষ

মালামাল হারানো বা ব্যাগেজ নিয়ে অভিযোগের বিষয়েও নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিমানবন্দরটির নির্বাহী পরিচালক।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাগেজ নিয়ে এ ধরনের সমস্যা শুধু একটি বিমানবন্দরকেন্দ্রিক নয়। বিশ্বের প্রায় সব বিমানবন্দরেই ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ বিভাগ থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ফ্লাইটের সময়সূচিতে বড় ধরনের বিপর্যয় হলে কোনো কোনো যাত্রীর ব্যাগ নির্দিষ্ট ফ্লাইটে পৌঁছাতে নাও পারে। পরে সেগুলো শনাক্ত করে যাত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

নিরাপত্তার নিয়মের কারণেও ব্যাগ থেকে কিছু জিনিস সরানো হতে পারে। যাত্রার শুরুর স্থানেই কোনো ব্যাগে পাওয়ার ব্যাংকের মতো সিকিউরিটি রেস্ট্রিক্টেড আইটেম থাকলে নিয়ম অনুযায়ী সেটি বের করে নেওয়া হয়। আবার কাস্টমস স্ক্যানিংয়ের সময় শুল্কযুক্ত পণ্য পাওয়া গেলে যাত্রীর সামনেই তল্লাশি করে তা বের করা হয়।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, নিয়ম মেনে এসব কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও অনেক সময় যাত্রীরা সেটিকে ব্যাগ কেটে মালামাল সরানো বা নষ্ট করার ঘটনা হিসেবে ধরে নেন।

কাগজের কার্টুন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণও জানাল কর্তৃপক্ষ

প্রবাসীদের বহন করা কাগজের কার্টুন নিয়েও আলাদা সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন রাগীব সামাদ।

তার বক্তব্য, এসব কার্টুন সাধারণত খুব শক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিমানের কার্গো কিংবা কনটেইনারে মালামাল ওঠানোর সময় অন্য ব্যাগেজের চাপ পড়লে সেগুলো ফেটে যেতে বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ কারণে গন্তব্যে পৌঁছে কোনো কোনো যাত্রী নিজেদের ব্যাগ বা মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান। সেখান থেকেও তৈরি হয় ভুল বোঝাবুঝি।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক যাত্রীভিত্তিক মূল্যায়নে শাহজালালের অবস্থান না থাকায় দেশের প্রধান বিমানবন্দরের সেবা নিয়ে আলোচনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের চিত্র, অন্যদিকে অতিরিক্ত যাত্রী চাপ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা বলছে কর্তৃপক্ষ। এখন টার্মিনাল-৩ চালুর পর পরিস্থিতিতে কী পরিবর্তন আসে, সেদিকেই নজর থাকবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ