ঢাকা, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

পাসপোর্ট করতে কী কী কাগজ লাগে, আবেদন করার আগে জেনে নিন

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৩ ১৮:০৫:৪৫
পাসপোর্ট করতে কী কী কাগজ লাগে, আবেদন করার আগে জেনে নিন

পাসপোর্টের আবেদন করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা। বাংলাদেশে ই-পাসপোর্টের জন্য সাধারণ আবেদনকারীর ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ (BRC) প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি অনলাইনে পূরণ করা আবেদনপত্র, আবেদন সামারির প্রিন্ট কপি এবং ফি পরিশোধের প্রমাণপত্র নিয়ে নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে যেতে হয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে আগের পাসপোর্ট, সরকারি চাকরিজীবীদের NOC/GO বা তথ্য সংশোধনের প্রমাণপত্রও লাগতে পারে।

অনেকেই পাসপোর্টের আবেদন করার সময় শেষ মুহূর্তে কাগজপত্র নিয়ে সমস্যায় পড়েন। অথচ আবেদন করার আগেই কোন কাগজটি লাগবে এবং কার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন—এসব জানা থাকলে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হয়।

নতুন ই-পাসপোর্ট করতে মূলত যেসব কাগজ লাগে

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বর্তমান নাগরিক সেবা সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ই-পাসপোর্টের জন্য সাধারণ আবেদনকারীর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বয়স ও আবেদনের ধরন অনুযায়ী কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, NID বা জন্মনিবন্ধনের মূল কপি প্রদর্শন করতে হয়।

প্রয়োজনীয় কাগজকার জন্য/কেন প্রয়োজন
অনলাইনে পূরণ করা আবেদনপত্র নতুন ই-পাসপোর্ট আবেদনের জন্য
আবেদন সামারির প্রিন্ট কপি পাসপোর্ট অফিসে জমা দেওয়ার সময়
NID সাধারণত ২০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য
ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ (BRC) ১৮ বছরের নিচে বয়সীদের জন্য
NID/BRC ১৮–২০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
পাসপোর্ট ফি জমার প্রমাণ/এ-চালান ফি পরিশোধের প্রমাণ হিসেবে
আগের পাসপোর্ট রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে
NOC/GO প্রযোজ্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে

NID না থাকলে কি পাসপোর্ট করা যাবে?

বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র দিতে হবে। অধিদপ্তরের নাগরিক সেবা তথ্য অনুযায়ী, ২০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য NID, আর ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করা হয়। ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে NID অথবা BRC প্রযোজ্য।

১৮ বছরের কম বয়সী যাদের নিজস্ব NID নেই, তাদের ক্ষেত্রে পিতা বা মাতার NID প্রযোজ্য হতে পারে। তাই অপ্রাপ্তবয়স্কের পাসপোর্ট আবেদনে সন্তানের জন্মনিবন্ধনের পাশাপাশি অভিভাবকের পরিচয়পত্রও প্রস্তুত রাখা ভালো।

পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার সময় কী কী নিতে হবে?

ই-পাসপোর্টের সরকারি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, এনরোলমেন্টের সময় আবেদনকারীকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজ সঙ্গে নিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

আবেদন সামারির প্রিন্ট কপি, অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলে সেটিসহ

NID বা জন্মনিবন্ধনের মূল কপি

অফলাইনে পেমেন্ট করা হলে পেমেন্ট স্লিপ

আগের পাসপোর্ট, যদি থাকে

পূরণ করা আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি

সরকারি চাকরিজীবী হলে প্রযোজ্য NOC/GO

তথ্য সংশোধনের আবেদন হলে সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র।

অর্থাৎ শুধু অনলাইনে আবেদন করলেই কাজ শেষ নয়। নির্ধারিত দিনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

পাসপোর্টের আবেদনে কি ছবি লাগবে?

ই-পাসপোর্টের সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে আবেদন ফরমে আলাদা করে ছবি সংযুক্ত বা সত্যায়ন করার প্রয়োজন নেই। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নির্দেশনায় এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

তবে ৬ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে ৩R সাইজের ল্যাব-প্রিন্ট রঙিন ছবি প্রয়োজন হতে পারে। তাই শিশুর পাসপোর্টের আবেদন হলে বয়স অনুযায়ী এই অতিরিক্ত প্রয়োজনীয়তাটি খেয়াল রাখা জরুরি।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অতিরিক্ত কী লাগে?

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সাধারণ কাগজপত্রের পাশাপাশি NOC (অনাপত্তি সনদ) বা GO প্রযোজ্য হতে পারে। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বর্তমান নির্দেশনায় সরকারি চাকরিজীবীদের NOC/GO ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত বা আপলোড করা থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীর নির্ভরশীল স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্দিষ্ট বয়সের নির্ভরশীল সন্তানের ক্ষেত্রেও আলাদা কাগজপত্রের বিধান রয়েছে।

পুরোনো পাসপোর্ট থাকলে কী করবেন?

আগের পাসপোর্ট থাকলে সেটি সঙ্গে রাখতে হবে। রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আগের পাসপোর্টের তথ্য ও আবেদনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে হয়। তথ্য অপরিবর্তিত থাকলে এক ধরনের নথি এবং তথ্য পরিবর্তন করলে সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।

আর আগের ই-পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে মূল জিডি (GD) দাখিল করার নির্দেশনা রয়েছে।

পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে NID বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য মিলিয়ে নিন

পাসপোর্ট আবেদনের আগে নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য NID বা জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। ই-পাসপোর্টের আবেদন ফরমের তথ্য NID বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী পূরণ করার নির্দেশনা রয়েছে।

কোনো তথ্যের ভুল বা অসামঞ্জস্য থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের প্রমাণপত্র দিতে হতে পারে। তাই আবেদন সাবমিট করার আগে প্রতিটি তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা উচিত।

পাসপোর্ট করতে কি পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগে?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন রয়েছে। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নির্দেশনা তালিকায় ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজনীয়তা শিথিলকরণ সংক্রান্ত পরিপত্রের উল্লেখ রয়েছে।

তাই পুরোনো নিয়মের তথ্য অনুসরণ করে সবার জন্য একইভাবে পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগবে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। আবেদনকারীর পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিষয়টি নির্ধারিত হবে।

পাসপোর্টের ফি কত?

ই-পাসপোর্টের ফি পাসপোর্টের পৃষ্ঠা সংখ্যা, মেয়াদ এবং ডেলিভারির ধরন অনুযায়ী আলাদা। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রকাশিত ফি তালিকায় ৪৮ বা ৬৪ পৃষ্ঠার এবং ৫ বা ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের জন্য নিয়মিত, এক্সপ্রেস ও সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারির পৃথক ফি দেওয়া রয়েছে।

তবে যেহেতু সরকারি ফি ও সেবার তথ্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদন করার সময় অফিশিয়াল পোর্টালে প্রদর্শিত বর্তমান ফি দেখে পেমেন্ট করাই নিরাপদ।

অনলাইনে আবেদন করার পর কী করবেন?

ই-পাসপোর্টের আবেদন অনলাইনে করা যায়। আবেদন সম্পন্ন করার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে যেতে হয়। পাসপোর্ট অধিদপ্তর জানিয়েছে, আবেদনকারীর বসবাসের এলাকার সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস বা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হয়।

আবেদন করার আগে তাই তিনটি বিষয় বিশেষভাবে যাচাই করা উচিত—পরিচয়পত্রের তথ্য সঠিক কি না, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত আছে কি না এবং সঠিক পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন করা হয়েছে কি না।

আবেদন করার আগে ছোট্ট চেকলিস্ট

নতুন পাসপোর্ট হলে:

NID/BRC প্রস্তুত রাখুন

অনলাইন আবেদন সম্পন্ন করুন

আবেদন সামারির প্রিন্ট নিন

আবেদনপত্রের প্রিন্ট নিন

পাসপোর্ট ফি পরিশোধ করুন

পেমেন্টের প্রমাণপত্র রাখুন

অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলে তার তথ্য সঙ্গে রাখুন

নির্ধারিত দিনে মূল পরিচয়পত্র নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে যান

রি-ইস্যু হলে: আগের পাসপোর্ট এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন বা পরিবর্তনের প্রমাণপত্রও প্রস্তুত রাখুন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা

পাসপোর্টের আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা একবার অফিসিয়াল নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ আবেদনকারীর বয়স, নতুন পাসপোর্ট নাকি রি-ইস্যু, সরকারি চাকরি, তথ্য সংশোধন বা পাসপোর্ট হারানোর মতো বিষয় অনুযায়ী অতিরিক্ত নথির প্রয়োজন হতে পারে।

ই-পাসপোর্টের সরকারি পোর্টাল ও ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনাই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে অনুসরণ করা উচিত।

পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

১. পাসপোর্ট করতে NID কি বাধ্যতামূলক?

বয়স অনুযায়ী পরিচয়পত্র প্রয়োজন। ২০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য NID এবং ১৮ বছরের নিচে ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে। ১৮–২০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে NID বা BRC প্রযোজ্য।

২. পাসপোর্টের আবেদনে কি ছবি দিতে হয়?

সাধারণ ই-পাসপোর্ট আবেদনে আলাদা ছবি সংযুক্ত বা সত্যায়ন করার প্রয়োজন নেই। তবে ৬ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে ৩R সাইজের ল্যাব-প্রিন্ট রঙিন ছবির বিধান রয়েছে।

৩. পুরোনো পাসপোর্ট থাকলে কি সেটি জমা দিতে হবে?

রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে আগের পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতে ও প্রদর্শন করতে হয়। তথ্য পরিবর্তনের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত প্রমাণপত্রও প্রয়োজন হতে পারে।

৪. সরকারি চাকরিজীবীদের অতিরিক্ত কী লাগে?

প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবীদের NOC বা GO প্রয়োজন হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নথি প্রস্তুত করতে হবে।

৫. পাসপোর্টের আবেদন কোথায় করা যায়?

অনলাইনে আবেদন করা যায় এবং পরবর্তী এনরোলমেন্টের জন্য আবেদনকারীর বসবাসের এলাকার সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস বা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে যেতে হয়।

তথ্যসূত্র: ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সরকারের ই-পাসপোর্ট পোর্টালের সর্বশেষ প্রকাশিত নির্দেশনা।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: