ঢাকা, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

শেয়ারবাজারে বড় পরিবর্তন, এক বছরের মধ্যে বদলে যাবে চেহারা

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৪ ১৯:২৪:০৩
শেয়ারবাজারে বড় পরিবর্তন, এক বছরের মধ্যে বদলে যাবে চেহারা

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে ঘিরে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা না ঘটলে আগামী এক বছরের মধ্যেই দেশের শেয়ারবাজারের চেহারা বদলে যাবে। শুধু পুঁজিবাজার নয়, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি খাতে অর্থ জোগানের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

রোববার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ অডিটরিয়ামে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা জানান আমির খসরু। এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য—‘বিনিয়োগকারীর স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল প্রতারণা ও প্রতারণা সতর্কতা’।

বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতার কাঠামো বদলানোর কথা

দেশের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে অর্থের উৎসে পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিচালনার পদ্ধতি আর ধরে রাখতে চান না তিনি।

আমির খসরুর ভাষ্য, দেশের আর্থিক কাঠামোর পাশাপাশি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি খাতে অর্থায়নের ব্যবস্থাতেও সংস্কার চলছে। ভবিষ্যতে অর্থের জন্য বাইরের উন্নয়ন সহযোগীদের দিকে তাকিয়ে থাকার পরিবর্তে দেশের নিজস্ব বাজারকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা চালালে অর্থের খরচ বাড়ে। এই ব্যয় কমানো না গেলে দেশের ব্যবসা ও শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না। তাই অর্থায়নের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজারকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।

বড় প্রকল্পের সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থ সংগ্রহ

সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পগুলোও ভবিষ্যতে অর্থ সংগ্রহের উৎস হতে পারে বলে জানান আমির খসরু। বড় প্রকল্পের সম্পদ এবং সেসব প্রকল্প থেকে ভবিষ্যতে যে আয় আসার সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি পদ্মা সেতু ও যমুনা সেতুর সিকিউরিটাইজেশনের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাতেই এ ধরনের আরও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

অর্থনীতির আকার বাড়ানোর লক্ষ্যের সঙ্গে এই উদ্যোগকে যুক্ত করে তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে হলে শুধু আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থের ওপর নির্ভর করে থাকা সম্ভব নয়।

বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন, আসবে ১০ বিলিয়ন

বাংলাদেশের অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার একটি তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরেন আমির খসরু। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। অথচ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা সম্মিলিতভাবে ১০ বিলিয়ন ডলার দিতে পারবে।

এই ব্যবধান পূরণে সরাসরি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, বিদেশি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে পাওয়া অর্থের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তাই বাংলাদেশ এখন সরাসরি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের দিকে যাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলেও অনুষ্ঠানে জানান অর্থমন্ত্রী।

আইএমএফ কর্মসূচি বাতিলের কথা জানালেন

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের অর্থের ওপর নির্ভরতার প্রসঙ্গও উঠে আসে আমির খসরুর বক্তব্যে। তিনি বলেন, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক অর্থ দেবে—এমন ধারণা থেকে বাংলাদেশকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আমির খসরু জানান, আইএমএফের কর্মসূচি তিনি বাতিল করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে আইএমএফের দেওয়া শর্ত বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রস্তুতির কথা

পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রস্তুত রয়েছেন।

তাঁর মতে, বাজারের কাঠামো ও অর্থায়নের পদ্ধতিতে যে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তার প্রভাব আগামী এক বছরের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা না ঘটার বিষয়টিকে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাই স্বনিয়ন্ত্রণ

শুধু নীতিগত সংস্কার নয়, আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব দায়িত্ববোধের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন আমির খসরু। তাঁর আহ্বান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্দেশনা দেবে—এই অপেক্ষায় বসে না থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিজেদের কাজের ক্ষেত্রে স্বনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কী করতে হবে কিংবা কী করা যাবে না, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসে বলে দেবে—এমন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল থাকা ঠিক নয়।

বিশেষ করে আর্থিক প্রতিবেদন ও হিসাবের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। কারণ আর্থিক খাতের কার্যক্রমের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব ও আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল। তাই নিজেদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

ইউডি সনদের অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলেন মডেল

স্বনিয়ন্ত্রণ কীভাবে কার্যকর হতে পারে, তা বোঝাতে নিজের বাণিজ্যমন্ত্রী থাকার সময়ের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলেন আমির খসরু।

তখন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের পণ্য আমদানি ও রপ্তানির হিসাবসংক্রান্ত ইউডি সনদ সংগ্রহ করতে হতো। ওই সনদ দেওয়ার দায়িত্ব ছিল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হাতে।

ইপিবি থেকে সনদ নেওয়ার প্রক্রিয়ায় হয়রানি, বিলম্ব ও অনিয়মের অভিযোগ আসত বলে জানান তিনি। এর কারণে অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকদের পণ্য পাঠাতেও সমস্যার মুখে পড়তে হতো।

এই পরিস্থিতিতে ইপিবির মাধ্যমে সমস্যাটি সমাধানের পরিবর্তে ইউডি সনদ দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) কাছে দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। তবে দায়িত্ব দেওয়ার সঙ্গে একটি শর্তও রাখা হয়েছিল—বিজিএমইএকে নিজেদের সক্ষমতা তৈরি করে পুরো ব্যবস্থাটি স্বনিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে।

শুরুতে এই দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে বিজিএমইএর প্রতিনিধিদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। পরে তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে স্বনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনে সম্মত হন। এরপর থেকে ব্যবস্থাটি কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে বলে জানান আমির খসরু।

সংস্কারের সফলতার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগোতে হবে

এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমির খসরুর বক্তব্য, শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে পরিবর্তন আনলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—দুই পর্যায়েই স্বনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

তাঁর মতে, নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই সঠিকভাবে পালন এবং কার্যক্রমে স্বনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারলে সরকারের সংস্কার ও উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের পথ আরও সহজ হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আল-সাদ/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ