সকালে হাঁটা নাকি বিকেলে? সময় বেছে নেওয়ার আগে যা জানবেন
হাঁটার জন্য সকালই সবচেয়ে ভালো, নাকি বিকেল? স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন অনেকের মনেই এমন প্রশ্ন থাকে। কিন্তু গবেষণার তথ্য বলছে, সবার জন্য দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়কে হাঁটার ‘সেরা সময়’ বলে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। বরং নিয়মিত হাঁটা, নিজের দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে সময়টি মানিয়ে নেওয়া এবং হাঁটার উদ্দেশ্য অনুযায়ী সময় বেছে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সকালে হাঁটার আলাদা কিছু সুবিধা থাকতে পারে, আবার বিকেল বা সন্ধ্যায় হাঁটাও অনেকের জন্য বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে। এমনকি খাবারের পর হাঁটার ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব কিছুটা বেশি। তাই শুধু সকাল না বিকেল—এই একটি প্রশ্নের মধ্যে উত্তর খুঁজলে হাঁটার গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক বাদ পড়ে যেতে পারে।
হাঁটার জন্য সকাল কি সত্যিই সেরা?
সকালে হাঁটার অন্যতম সুবিধা হলো দিনের শুরুতেই শরীরচর্চা হয়ে যায়। দিনের কাজ, ব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে পরে হাঁটা বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও এতে কমে। যাদের সকালে সময় বের করা সহজ, তাদের জন্য তাই এটি নিয়মিত হাঁটার ভালো সুযোগ হতে পারে।
তবে সকালেই হাঁটলে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যায়—এমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
৩৫টি গবেষণা নিয়ে করা একটি systematic review-তে দিনের বিভিন্ন সময়ে শারীরিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে সকাল, বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যে সবার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়কে স্বাস্থ্যগতভাবে স্পষ্টভাবে সেরা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়নি। বিভিন্ন গবেষণার ফলও একরকম ছিল না।
অর্থাৎ, সকালে হাঁটা অবশ্যই ভালো অভ্যাস হতে পারে, কিন্তু শুধু সকালেই হাঁটতে হবে—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।
বিকেলে হাঁটার সুবিধা কোথায়?
সকালে সময় না পাওয়া মানুষের জন্য বিকেল বা সন্ধ্যার হাঁটা কার্যকর বিকল্প হতে পারে। দিনের কাজের ফাঁকে কিছুটা সময় বের করে হাঁটলে দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাসও ভাঙা যায়।
কিছু গবেষণায় দিনের পরের দিকে ব্যায়ামের সঙ্গে রক্তে শর্করা ও রক্তচাপের মতো কিছু স্বাস্থ্য সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণার ফলকে সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা যায় না। কারণ গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষের বয়স, স্বাস্থ্য, ব্যায়ামের ধরন ও সময়কাল এক ছিল না।
তাই ‘বিকেলের হাঁটাই সবচেয়ে ভালো’—এমন সিদ্ধান্তও ঠিক হবে না।
বরং আপনার জন্য কোন সময়টি সবচেয়ে ভালো, সেটি অনেকটাই নির্ভর করবে কোন সময়ে নিয়মিত হাঁটতে পারবেন তার ওপর।
খাবারের পর হাঁটা কেন আলাদা?
সকাল ও বিকেলের তুলনার বাইরে খাবারের পর হাঁটার বিষয়টি কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে হালকা শারীরিক কর্মকাণ্ড উপকারী হতে পারে।
একটি systematic review ও meta-analysis-এ দেখা গেছে, খাবারের পর শারীরিক কর্মকাণ্ড করলে খাবারের পর রক্তে শর্করার যে বৃদ্ধি ঘটে, তা কমাতে সাহায্য করতে পারে। খাবারের পর তুলনামূলক দ্রুত শারীরিক কর্মকাণ্ড শুরু করলে এই সুবিধা বেশি হতে পারে বলেও গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
আরেক গবেষণায় টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাবারের পর হাঁটা খাবারের আগে হাঁটার তুলনায় খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে বেশি কার্যকর বলে দেখা যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই প্রতিবার খাবারের পর হাঁটতে হবে। ডায়াবেটিসসহ কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটবেন?
হাঁটার সময় ঠিক করার পাশাপাশি সপ্তাহে মোট কতটা শারীরিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরামর্শ দেওয়া হয়। দ্রুত হাঁটা বা brisk walking এর একটি উদাহরণ।
এটি চাইলে সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে করা যায়। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী সময়কে ছোট ছোট পর্বেও ভাগ করা সম্ভব। ফলে প্রতিদিন একটানা দীর্ঘ সময় হাঁটার সুযোগ না থাকলেও নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া যায়।
এখানে মূল বিষয় হলো—একদিন অনেকক্ষণ হাঁটার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত সক্রিয় থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাতে হাঁটলে ঘুমের সমস্যা হবে?
সন্ধ্যা বা রাতে হাঁটার ক্ষেত্রে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে, এতে ঘুমের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না।
গবেষণায় এ বিষয়ে সবার জন্য একই ফল পাওয়া যায়নি। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি systematic review-তে সকাল বনাম সন্ধ্যা বা রাতের ব্যায়ামের ঘুমের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে সকালে ব্যায়াম করলেই ঘুমের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বেশি সুবিধা পাওয়া যায়—এমন সর্বজনীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে ঘুমের খুব কাছাকাছি সময়ে উচ্চমাত্রার ব্যায়াম করলে কিছু মানুষের ঘুমের ধারাবাহিকতা বা মানে প্রভাব পড়তে পারে। তাই রাতে হাঁটার পর যদি নিজের ঘুমে সমস্যা লক্ষ্য করেন, তাহলে হাঁটার সময় কিছুটা এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, মাঝারি মাত্রার হাঁটা অনেকের ক্ষেত্রে এমন সমস্যা তৈরি নাও করতে পারে।
তাহলে কখন হাঁটা সবচেয়ে ভালো?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—যে সময়ে নিয়মিত হাঁটা সম্ভব, সেই সময়টিই আপনার জন্য সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
সকালে সময় ও সুযোগ থাকলে সকালে হাঁটুন। সকালে ব্যস্ততা বেশি হলে বিকেল বেছে নিন। আবার বিকেলেও সময় না মিললে দিনের অন্য সুবিধাজনক সময়ে হাঁটার অভ্যাস করা যেতে পারে।
কারণ অনিয়মিতভাবে ‘আদর্শ সময়ের’ অপেক্ষায় থাকার চেয়ে নিজের রুটিনে মানানসই সময়ে নিয়মিত হাঁটা বেশি বাস্তবসম্মত।
গবেষণার বর্তমান চিত্রও এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না যে সকাল, বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যে একটি সময় সবার জন্য নিশ্চিতভাবে সেরা।
হাঁটার সময় বেছে নেওয়ার আগে যে বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন
নিজের রুটিন দেখুন: কোন সময়ে নিয়মিত হাঁটা সম্ভব, সেটিই প্রথম বিবেচনা হওয়া উচিত।
আবহাওয়া বিবেচনা করুন: অতিরিক্ত গরম, আর্দ্রতা বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় বাইরে হাঁটার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
নিরাপদ জায়গা বেছে নিন: ভোর বা রাতে হাঁটলে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
ধীরে শুরু করুন: দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে সক্রিয় না থাকলে শুরুতেই বেশি সময় বা দ্রুত গতিতে হাঁটার প্রয়োজন নেই। সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ানো ভালো।
শরীরের সংকেত বুঝুন: হাঁটার সময় অস্বাভাবিক অস্বস্তি বা শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
শুধু সময় নয়, হাঁটার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু হাঁটছেন কি না, সেটিই একমাত্র বিষয় নয়। হাঁটার গতি এবং মোট শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাভাবিক গতিতে হাঁটার তুলনায় কিছুটা দ্রুত হাঁটলে তা মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের পর্যায়ে যেতে পারে। তবে কতটা দ্রুত হাঁটা একজন ব্যক্তির জন্য উপযুক্ত, তা তার বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে।
তাই অন্য কারও হাঁটার গতি দেখে নিজের সঙ্গে তুলনা করার প্রয়োজন নেই। নিজের সক্ষমতার মধ্যে থেকে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সকালে হাঁটা ভালো, বিকেলে হাঁটাও ভালো—কিন্তু কোনটি সবার জন্য ‘সেরা’, তার সহজ কোনো উত্তর নেই। গবেষণার বর্তমান তথ্য বরং দেখায়, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং দীর্ঘদিন ধরে সেই অভ্যাস ধরে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের সকালে সময় মেলে, তারা সকালে হাঁটতে পারেন। যারা সকালে ব্যস্ত থাকেন, তাদের জন্য বিকেল বা সন্ধ্যা ভালো বিকল্প। আর খাবারের পর রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণের মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে খাবারের পর হাঁটার সম্ভাব্য সুবিধাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সবশেষে, ঘড়ির কাঁটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আপনি এমন কোন সময় বেছে নিচ্ছেন, যে সময়ে নিয়মিত হাঁটা আপনার পক্ষে সম্ভব।
FAQ
সকালে হাঁটা কি বিকেলে হাঁটার চেয়ে বেশি উপকারী?
না। সবার জন্য সকালকে বিকেলের তুলনায় নিশ্চিতভাবে বেশি উপকারী বলার মতো পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক প্রমাণ নেই। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের পর হাঁটা কি উপকারী?
গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের পর শারীরিক কর্মকাণ্ড খাবারের পর রক্তে শর্করার বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে খাবারের পর তুলনামূলক দ্রুত হাঁটার সম্ভাব্য উপকার পাওয়া গেছে।
প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটা উচিত?
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য রাখা হয়। এটি সপ্তাহজুড়ে ভাগ করে করা যায়।
রাতে হাঁটা কি ঘুমের ক্ষতি করে?
সবার ক্ষেত্রে নয়। তবে ঘুমের একেবারে কাছাকাছি সময়ে উচ্চমাত্রার ব্যায়াম কিছু মানুষের ঘুমে সমস্যা করতে পারে। নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করা ভালো।
হাঁটার জন্য শেষ পর্যন্ত কোন সময়টি বেছে নেব?
যে সময়ে আপনার নিয়মিত হাঁটা সম্ভব এবং দীর্ঘদিন অভ্যাসটি ধরে রাখতে পারবেন, সেই সময়টিই বেছে নেওয়া সবচেয়ে বাস্তবসম্মত।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- মুনাফার ধারাবাহিকতার পর বিএসআরএম স্টিলে আসছে বড় সিদ্ধান্ত
- আর্জেন্টিনা বনাম বেনিন ম্যাচ কখন, কোথায় কীভাবে লাইভ দেখবেন
- Vivo V80 কেনার আগে জেনে নিন এর ভালো-মন্দ, কার জন্য সেরা
- আজকের সোনার দাম: ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেটের দর
- OPPO F35 Pro 5G: ৮,০০০mAh ব্যাটারি ও ১৪৪Hz AMOLED
- আর্জেন্টিনা বনাম বেনিন ম্যাচ: সময়, একাদশ ও লাইভ দেখার উপায়
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ১টি দেশের টাকার মান
- মেসির শেষ ম্যাচ আজ, আর্জেন্টিনা-বেনিন কখন ও কোথায় দেখবেন