ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

গণভোটের রায় না মানলে আন্দোলন বাড়াবে জামায়াত

রাজনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৯ ১৭:৪৬:২৮
গণভোটের রায় না মানলে আন্দোলন বাড়াবে জামায়াত

গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান সংস্কারপ্রক্রিয়া কার্যকর না হলে রাজপথের কর্মসূচি আরও জোরালো করার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির আপত্তি, বিএনপি সরকার জনগণের গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কারের পথে না গিয়ে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে সরকারের পদক্ষেপকে গ্রহণযোগ্যতা দিতে চায় না জামায়াত। তাই সংসদের ভেতরে ও বাইরে চাপ বাড়িয়ে সরকারের অবস্থান পরিবর্তন করাই এখন দলটির লক্ষ্য।

তবে এই আন্দোলনকে আপাতত সরকার পতনের কর্মসূচি হিসেবে দেখছে না দলটি। জামায়াতের নেতাদের বক্তব্য, গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি সামনে আনাই তাদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য। এসব দাবি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।

দলটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংবিধান সংশোধন এবং সংবিধান সংস্কারকে একই বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে রাজি নয় জামায়াত। তাদের মতে, গণভোটে জনগণের সম্মতি ছিল জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পরিবর্তন বাস্তবায়নের পক্ষে; কেবল বিদ্যমান সংবিধানের কিছু ধারা বদলানোর পক্ষে নয়।

সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আপত্তি, কমিটি থেকে দূরে জামায়াত

সংবিধান সংশোধনের জন্য সরকারের উদ্যোগে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব থাকলেও সেখানে প্রতিনিধি দেয়নি জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো। দলটির নেতাদের আশঙ্কা, কমিটির কার্যক্রমে অংশ নিলে সরকারের পছন্দ অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ পরোক্ষভাবে বৈধতা পেতে পারে।

গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে এই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়াই কমিটির দায়িত্ব।

সেপ্টেম্বর থেকে কমিটি জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করে। বিরোধী দলগুলোর কাছে পাঁচজন প্রতিনিধির নাম চাওয়া হয়েছিল। তবে জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো কাউকে মনোনীত করেনি।

কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

জামায়াতের নেতারা মনে করেন, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারলেও তাতে গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে। এ কারণেই বিশেষ কমিটির বাইরে থেকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায় দলটি।

গণভোটের সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ

গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার না করে বিকল্প পদ্ধতিতে এগোনোর বিরোধিতা আগেই জানিয়েছে জামায়াত। গত ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সংবিধানের মৌলিক পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস। গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে অন্য কোনো পদ্ধতিকে জনগণের ম্যান্ডেট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

৬ অক্টোবর প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে ‘গণবিরোধী, আইনবিরোধী’ পথ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ হলো গণভোটের রায় অনুসারে সংস্কার বাস্তবায়ন করা।

এই দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে বিরোধী দল লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে বলেও জানান তিনি। সরকার দাবি না মানলে ভবিষ্যতে রাজপথের আন্দোলন আরও জোরালো করা হবে বলে সতর্ক করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর বক্তব্য, বিএনপি সরকার শেষ পর্যন্ত দাবি মেনে নেবে; অতীতেও তারা এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমন আচরণ করেছে।

নতুন করে গণভোট আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন

সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে জামায়াতের আপত্তি শুধু বিশেষ কমিটির কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়। আগের গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর না করে একই বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নতুন করে গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দলটি।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ আগের গণভোটের রায়ের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে নতুন গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা এবং এর আইনগত ভিত্তি নিয়েও তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

৬ অক্টোবর প্রথম আলোকে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আগের গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার নতুন করে গণভোট আয়োজনের কথা বলছে। তাঁর ভাষায়, এটি জাতির সঙ্গে প্রতারণা। তিনি আরও বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব হলেও সেই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট থেকে শুরু বর্তমান বিতর্ক

গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার রাষ্ট্রসংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছিল, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। ওই পরিষদের গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ শেষ করার কথা ছিল।

এই বিধান অনুসারে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচিত সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন। কিন্তু বিএনপি ও তাদের জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ না নেওয়ায় পরিষদটি গঠিত হয়নি।

এরপর সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করে। এই উদ্যোগকে ঘিরেই এখন রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। জামায়াতের অবস্থান হলো, গণভোটে জনগণের অনুমোদন পাওয়া সংস্কারপ্রক্রিয়া কার্যকর না করে কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা হলে তা গণভোটের উদ্দেশ্য পূরণ করবে না।

দাবি পূরণ না হলে রাজপথে কর্মসূচি বাড়ানোর ইঙ্গিত

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ৬ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিটি গঠন করে নিজেদের মতো সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা করছে। এ ধরনের উদ্যোগ ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে আন্দোলন জোরদার করতে চায় দলটি।

জামায়াতের নেতাদের বক্তব্যে আপাতত সরকার পতনের চেয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদ কার্যকর করা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি আদায়ের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংসদে বিশেষ কমিটির কার্যক্রম চলার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায় দলটি।

অন্যদিকে, বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্য জানিয়েছেন। ফলে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য আগামী দিনগুলোতে কীভাবে এগোয়, তা নির্ভর করবে সরকারের উদ্যোগ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানের ওপর।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

১. সংবিধান সংশোধন নিয়ে জামায়াতের মূল আপত্তি কী?

দলটির দাবি, গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কারপ্রক্রিয়া কার্যকর না করে সরকার প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে।

২. জামায়াত কেন বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়নি?

জামায়াতের নেতাদের আশঙ্কা, কমিটিতে অংশ নিলে সরকারের উদ্যোগকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া হবে।

৩. ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে কত শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন?

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার রাষ্ট্রসংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।

৪. সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি কেন?

জামায়াত ও এনসিপির নির্বাচিত সদস্যরা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি ও তাদের জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেননি। ফলে পরিষদ গঠিত হয়নি।

৫. জামায়াত কি সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করতে যাচ্ছে?

দলটির নেতারা জানিয়েছেন, আপাতত তাদের কর্মসূচির লক্ষ্য সরকার পতন নয়। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদ কার্যকর করা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি আদায়ই প্রধান লক্ষ্য। তবে দাবি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলন জোরদার করার কথা বলেছেন তাঁরা।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: