ঢাকা, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩

অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে নিজের নামে করবেন কীভাবে?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৭ ১৩:০৫:২৫
অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে নিজের নামে করবেন কীভাবে?

নিজের কেনা বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি অন্য ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে গেলে তা নিজের নামে সংশোধন করার সুযোগ রয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রে একই নিয়মে জমির রেকর্ড পরিবর্তন করা যায় না। রেকর্ডে নামের বানান ভুল, জমির হিস্যায় অসংগতি, জরিপের সময় অন্যের নাম উঠে যাওয়া কিংবা প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ—সমস্যার ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়। বাংলাদেশের ভূমি আইন অনুযায়ী, কিছু ভুল ভূমি অফিসের মাধ্যমে সংশোধন করা সম্ভব, আবার চূড়ান্ত জরিপের রেকর্ড নিয়ে বিরোধ হলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের শরণাপন্ন হতে হয়।

তাই অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়েছে জানতে পারলে প্রথমেই জমির কাগজপত্র যাচাই করে বুঝতে হবে, ভুলটি কী ধরনের এবং সংশোধনের জন্য কোন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হবে।

অন্যের নামে জমি রেকর্ড হওয়ার কারণ কী?

জমির রেকর্ডে ভুল নাম ওঠার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। জরিপের সময় তথ্য সংগ্রহে ভুল, জমির মালিকানা হস্তান্তরের তথ্য হালনাগাদ না হওয়া, উত্তরাধিকারীদের নাম সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত না করা কিংবা জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে রেকর্ড পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

কখনো জমির আগের মালিকের নাম পুরোনো খতিয়ানে থাকলেও পরবর্তী সময়ে বৈধভাবে জমি বিক্রি করা হয়। কিন্তু নতুন মালিকের নাম সংশ্লিষ্ট রেকর্ডে ওঠে না। আবার কোনো জমির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে একাধিক ব্যক্তির দাবি থাকলেও রেকর্ডে একজনের নাম দেখা যেতে পারে।

এ কারণে শুধু খতিয়ানে কার নাম রয়েছে, তা দেখে জমির মালিকানা নির্ধারণ করা উচিত নয়। জমির দলিল, পূর্ববর্তী খতিয়ান, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাগজপত্র, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ একসঙ্গে যাচাই করা জরুরি।

প্রথমে যে কাগজপত্র সংগ্রহ করবেন

অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে থাকলে নিজের দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করুন। সাধারণত নিচের কাগজপত্রগুলো কাজে আসে।

1. জমি কেনা হয়ে থাকলে নিবন্ধিত ক্রয়দলিল এবং প্রয়োজনে পূর্ববর্তী মালিকের দলিল।

2. জমির সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা প্রযোজ্য অন্যান্য জরিপের খতিয়ান।

3. জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, মৌজা ও জমির পরিমাণের তথ্য।

4. নামজারি হয়ে থাকলে নামজারি মামলার আদেশ ও সংশ্লিষ্ট খতিয়ান।

5. উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়া হলে ওয়ারিশ সনদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টনসংক্রান্ত দলিল।

6. ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং জমির দখলসংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক প্রমাণ।

7. জমির মালিকানা নিয়ে মামলা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট মামলার কাগজপত্র ও আদালতের আদেশ।

সব নথি প্রতিটি ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। জমির ইতিহাস ও সমস্যার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্ধারণ করতে হবে।

কোন ধরনের ভুল হলে কোথায় আবেদন করবেন?

অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে প্রথমে ভুলের ধরন নির্ধারণ করতে হবে। কারণ, সাধারণ করণিক ভুল এবং প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ এক ধরনের সমস্যা নয়।

নামের বানান বা হিসাবের ভুল হলে

খতিয়ানে নামের বানান, জমির হিস্যা বা গাণিতিক হিসাবে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের কাছে সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে। তবে ভুলটি সত্যিই করণিক কি না, তা যাচাই করা হবে।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ধরনের করণিক ভুল সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে। সংশোধনের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের অবস্থা ও প্রযোজ্য বিধানের ওপর নির্ভর করে।

জরিপে অন্যের নাম উঠে গেলে

জরিপের সময় জমির প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নাম রেকর্ড হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, দলিল ও জরিপের নথি যাচাই করুন। রেকর্ডটি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হতে হবে।

আরও পড়ুন:

জমি কেনার আগে CS, SA, RS ও BS খতিয়ান চিনে নিন

দলিল, খতিয়ান ও নামজারি: জমির মালিকানা কীভাবে বুঝবেন?

অনলাইনে জমির দাগ নম্বর ও খতিয়ান বের করার নিয়ম

চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত সর্বশেষ সংশোধিত রেকর্ড নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৫ক ধারায় প্রতিষ্ঠিত ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এই ধরনের মামলা দায়েরের সময়সীমাও আইনে নির্ধারিত রয়েছে।

তাই জরিপের রেকর্ডে ভুল ধরা পড়লে দেরি না করে জমির কাগজপত্রসহ ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। সব ধরনের রেকর্ড বিরোধে একই আদালত বা একই আবেদনপদ্ধতি প্রযোজ্য হয় না।

জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের নামে রেকর্ড হলে

কেউ জাল দলিল, মিথ্যা তথ্য বা প্রতারণার মাধ্যমে জমি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে থাকলে বিষয়টি সাধারণ নামের ভুল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে মূল দলিল, পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং জালিয়াতির অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

ভুলটি চূড়ান্ত রেকর্ডে প্রতারণামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন অনুসারে দেওয়ানি আদালত বা অন্য উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়াও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কোন পথে যেতে হবে, তা নির্ধারণের আগে নথি পরীক্ষা করা জরুরি।

নামজারি রেকর্ডে অন্যের নাম থাকলে কী করবেন?

জমির দলিল নিজের নামে থাকলেও নামজারি অন্য ব্যক্তির নামে হয়ে থাকলে প্রথমে নামজারি মামলার নথি সংগ্রহ করুন। কোন দলিল বা তথ্যের ভিত্তিতে নামজারি করা হয়েছে, তা জানা জরুরি।

যদি নামজারিতে ভুল হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আদেশ ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী আপিল, পর্যালোচনা বা সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে জমির মালিকানা নিয়ে প্রকৃত বিরোধ থাকলে নামজারি সংশোধনের আবেদনই সব সময় যথেষ্ট হবে না।

নামজারি মূলত রাজস্ব রেকর্ড হালনাগাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তাই নামজারি রেকর্ডে নাম পরিবর্তন হলেও জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সেই বিরোধের পৃথক আইনি নিষ্পত্তির প্রয়োজন হতে পারে।

আবেদন করার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন

জমির রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করার আগে কয়েকটি বিষয় ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রথমত, জমির মৌজা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও পরিমাণ সঠিকভাবে মিলিয়ে দেখুন। একই মৌজায় কাছাকাছি দাগ নম্বর বা একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকলে ভুল শনাক্ত করতে সমস্যা হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, জমির মালিকানা কীভাবে আপনার কাছে এসেছে, তা প্রমাণ করার মতো ধারাবাহিক নথি সংগ্রহ করুন। শুধু করের রসিদ বা দখল থাকলেই সব ক্ষেত্রে মালিকানা প্রমাণিত হয় না।

তৃতীয়ত, জমির রেকর্ড চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে কি না এবং ভুলটি কোন পর্যায়ে হয়েছে, তা নিশ্চিত করুন। এর ওপর নির্ভর করতে পারে কোথায় আবেদন করবেন এবং কোন আইনি প্রতিকার গ্রহণ করবেন।

চতুর্থত, অন্য ব্যক্তি জমির মালিকানা দাবি করলে তাঁর নথিও আইনসম্মতভাবে যাচাই করার প্রয়োজন হতে পারে। বিরোধের প্রকৃতি না বুঝে একতরফাভাবে রেকর্ড পরিবর্তনের চেষ্টা করলে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।

সরকারি ভূমিসেবা কোথায় পাবেন?

ভূমি রেকর্ড, খতিয়ান, নামজারি এবং সংশ্লিষ্ট সেবা সম্পর্কে তথ্য জানতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসেবা পোর্টাল: [https://land.gov.bd/](https://land.gov.bd/)

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর: [https://dlrs.gov.bd/](https://dlrs.gov.bd/)

বাংলাদেশের প্রচলিত ভূমি আইন: [https://bdlaws.minlaw.gov.bd/](https://bdlaws.minlaw.gov.bd/)

অনলাইনে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসনের ভূমি শাখা বা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অফিসে যোগাযোগ করুন। জমির বিরোধ জটিল হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা নিরাপদ।

অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে নিজের নামে সংশোধন করা সম্ভব কি না, তা নির্ভর করে জমির মালিকানার প্রমাণ, ভুলের ধরন এবং রেকর্ডের বর্তমান অবস্থার ওপর। নামের বানান বা হিসাবের ভুলের ক্ষেত্রে এক ধরনের ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে, আর চূড়ান্ত জরিপের রেকর্ড বা মালিকানা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে ভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া।

তাই প্রথমে দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও জমির অন্যান্য নথি সংগ্রহ করুন। এরপর ভুলটি চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষ বা উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থা নিন। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যেখানে আইন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মামলা বা আবেদন করতে হয়।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন ১: অন্যের নামে জমি রেকর্ড হলে নিজের নামে করা যায় কি?

উত্তর: হ্যাঁ, আইনগতভাবে সংশোধনের সুযোগ থাকতে পারে। তবে জমির মালিকানার প্রমাণ, ভুলের ধরন ও রেকর্ডের অবস্থার ভিত্তিতে উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে।

প্রশ্ন ২: জমির দলিল নিজের নামে, কিন্তু খতিয়ানে অন্যের নাম—কোথায় যাব?

উত্তর: প্রথমে দলিল ও খতিয়ান যাচাই করে সমস্যাটি চিহ্নিত করুন। সাধারণ করণিক ভুলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যেতে পারে। প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ হলে আদালতের আশ্রয় প্রয়োজন হতে পারে।

প্রশ্ন ৩: অন্যের নামে রেকর্ড হওয়া জমি সংশোধন করতে কী কী কাগজ লাগে?

উত্তর: সাধারণত জমির দলিল, সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, দাগ ও মৌজার তথ্য, নামজারির নথি এবং মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণের কাগজ প্রয়োজন হতে পারে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথি লাগতে পারে।

প্রশ্ন ৪: চূড়ান্ত খতিয়ানে অন্যের নাম থাকলে কোথায় মামলা করতে হয়?

উত্তর: সর্বশেষ সংশোধিত জরিপের চূড়ান্ত রেকর্ড নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার প্রযোজ্য হতে পারে। তবে সব ধরনের রেকর্ড বা মালিকানা বিরোধ একই ট্রাইব্যুনালের আওতায় পড়ে না।

প্রশ্ন ৫: জমির রেকর্ড সংশোধন করতে কত দিন লাগে?

উত্তর: নির্দিষ্ট সময় সবার ক্ষেত্রে এক নয়। ভুলের ধরন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রক্রিয়া, আপত্তি এবং মামলা থাকলে তার নিষ্পত্তির ওপর সময় নির্ভর করে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: