ঢাকা, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

দলিল ও খতিয়ানে দাগ নম্বর আলাদা? সঠিকটি জানবেন যেভাবে

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৮ ১২:৫৩:০৪
দলিল ও খতিয়ানে দাগ নম্বর আলাদা? সঠিকটি জানবেন যেভাবে

একই জমির দলিলে এক দাগ নম্বর, আর খতিয়ানে অন্য দাগ নম্বর থাকলে কোনটি সঠিক, তা নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে জমি কেনাবেচা, নামজারি কিংবা ওয়ারিশি সম্পত্তি ভাগ করার সময় এমন অমিল দেখা দিলে জমির মালিকানা নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। তবে দুই কাগজে দাগ নম্বর আলাদা হলেই জমির কাগজ ভুল বা জাল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। পুরোনো ও নতুন জরিপে দাগ নম্বর পরিবর্তন, জমি বিভক্ত হওয়া কিংবা দলিল লেখার ভুলের কারণেও এমনটি হতে পারে।

বাংলাদেশে জমির সঠিক দাগ নম্বর নির্ধারণ করতে দলিল, খতিয়ান, মৌজা নকশা, জমির পরিমাণ এবং সীমানা মিলিয়ে দেখতে হয়। শুধু একটি কাগজে লেখা দাগ নম্বরের ভিত্তিতে জমির মালিকানা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। তাই দাগ নম্বরে অমিল দেখা দিলে প্রথমে তার কারণ যাচাই করা জরুরি।

জমির দাগ নম্বর কী?

দাগ নম্বর হলো মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমির খণ্ড শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত একটি নম্বর। ভূমি জরিপের সময় জমির অবস্থান, সীমানা ও অন্যান্য বিবরণ নথিভুক্ত করা হয়। একটি মৌজায় বিভিন্ন জমি আলাদা আলাদা দাগ নম্বরের মাধ্যমে চিহ্নিত থাকে।

জমির মালিকানা ও রেকর্ড যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দাগ নম্বর গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। জমির খতিয়ান, নিবন্ধিত দলিল, জমির পরিমাণ, চৌহদ্দি এবং মালিকানার ধারাবাহিকতাও যাচাই করতে হয়।

একই জমির দাগ নম্বর দুই কাগজে আলাদা হওয়ার কারণ

দলিল, খতিয়ান কিংবা অন্যান্য ভূমি রেকর্ডে দাগ নম্বরের অমিল দেখা দেওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।

১. পুরোনো ও নতুন জরিপের পার্থক্য

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত সিএস (CS), এসএ (SA), আরএস (RS) ও বিএস (BS) জরিপে একই জমির দাগ নম্বর আলাদা হতে পারে। পরবর্তী জরিপে জমির শ্রেণিবিন্যাস, সীমানা বা রেকর্ডের পরিবর্তনের কারণে নতুন দাগ নম্বর দেওয়া হলে পুরোনো দলিলের নম্বরের সঙ্গে বর্তমান খতিয়ানের নম্বর নাও মিলতে পারে।

এ ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন জরিপের দাগের মধ্যে সম্পর্ক যাচাই করতে হবে। শুধু নম্বর আলাদা বলে জমিটি ভিন্ন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

২. জমি ভাগ হয়ে যাওয়া

আগে একটি দাগের অন্তর্ভুক্ত জমি পরবর্তী সময়ে একাধিক অংশে বিভক্ত হতে পারে। জমির বিভাজন ও সংশ্লিষ্ট জরিপের রেকর্ড অনুযায়ী নতুন দাগ বা বাটা দাগ তৈরি হলে একই জমির পুরোনো ও নতুন নথিতে আলাদা নম্বর দেখা যেতে পারে।

৩. দলিল লেখার ভুল

জমি কেনাবেচার সময় দলিল প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে ভুল দাগ নম্বর লেখা হতে পারে। কখনো খতিয়ান নম্বর, জমির পরিমাণ, মৌজার নাম কিংবা চৌহদ্দির তথ্যেও ভুল থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দলিলের তফসিলের সঙ্গে অন্যান্য নথি মিলিয়ে দেখা জরুরি।

৪. ভূমি রেকর্ড বা নকশায় ভুল

কখনো জরিপের সময় তথ্য লিপিবদ্ধ করার ভুল, করণিক ত্রুটি কিংবা নকশার অসংগতির কারণে দাগ নম্বর নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড ও নকশা যাচাই করে ভুলের ধরন শনাক্ত করতে হবে।

দলিল ও খতিয়ানে দাগ নম্বর আলাদা হলে কোনটি সঠিক?

দলিল ও খতিয়ানে দাগ নম্বর আলাদা হলে কোনটি সঠিক, তা নির্ভর করে নথির ধরন, জরিপের সময় এবং জমির প্রকৃত পরিচয়ের ওপর। সব ক্ষেত্রে দলিলের নম্বর সঠিক কিংবা খতিয়ানের নম্বরই সঠিক—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৪এ ধারা অনুযায়ী, চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ড অব রাইটসের এন্ট্রিকে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ভুল প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা সঠিক বলে ধরে নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে খতিয়ানে কোনো তথ্য থাকলেই সেটি চূড়ান্ত মালিকানার অকাট্য প্রমাণ হয়ে যায় না।

তাই দাগ নম্বরের অমিল দেখা দিলে প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে, দুই কাগজ একই জরিপের কি না। এরপর দলিলের তফসিল, সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, মৌজা নকশা, জমির পরিমাণ এবং চৌহদ্দি মিলিয়ে দেখতে হবে।

আরও পড়ুন:

দলিল, খতিয়ান ও নামজারি: জমির মালিকানা কীভাবে বুঝবেন?

জমি কেনার আগে CS, SA, RS ও BS খতিয়ান চিনে নিন

অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে নিজের নামে করবেন কীভাবে?

একই জরিপের দুটি নথিতে দাগ নম্বর আলাদা থাকলে এবং পুরোনো ও নতুন দাগের পরিবর্তনের কোনো ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যাচাই করা উচিত।

জমির দাগ নম্বর যাচাই করতে কোন কোন কাগজ লাগবে?

জমির দাগ নম্বরের অমিল সমাধানের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

মূল দলিল: জমি কেনার সময় নিবন্ধিত দলিলে উল্লেখ করা মৌজা, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং চৌহদ্দি পরীক্ষা করুন।

খতিয়ান: জমিটির সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস জরিপের খতিয়ান সংগ্রহ করুন। একাধিক জরিপের রেকর্ড থাকলে সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।

মৌজা নকশা: সংশ্লিষ্ট জরিপের নকশায় দাগ নম্বরের অবস্থান ও জমির সীমানা যাচাই করুন। পুরোনো ও নতুন দাগের সম্পর্ক নির্ধারণে নকশা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

নামজারি খতিয়ান: জমির নামজারি হয়ে থাকলে সেই রেকর্ডও পরীক্ষা করুন। তবে নামজারি থাকলেই মালিকানা নিয়ে সব ধরনের বিরোধের নিষ্পত্তি হয়ে যায় না।

পূর্ববর্তী দলিল: জমিটি একাধিকবার হস্তান্তর হয়ে থাকলে আগের দলিলগুলো যাচাই করে মালিকানার ধারাবাহিকতা বুঝে নিন।

এসব নথির তথ্য একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে দাগ নম্বরের অমিলটি জরিপ পরিবর্তনের কারণে হয়েছে, নাকি কোনো নথিতে ভুল রয়েছে, তা শনাক্ত করা সহজ হয়।

অনলাইনে জমির দাগ নম্বর যাচাই করার নিয়ম

জমির খতিয়ান ও দাগ নম্বর সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য জানতে সরকারি ভূমিসেবা ও ভূমি রেকর্ডের ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যায়।

প্রথমে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ব্যবস্থাপনার সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।

ওয়েবসাইট: [https://dlrms.land.gov.bd/](https://dlrms.land.gov.bd/)

এরপর প্রযোজ্য অনুসন্ধান ব্যবস্থা থেকে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা ও জরিপের ধরন নির্বাচন করে খতিয়ান বা দাগ নম্বরের তথ্য খুঁজুন।

মৌজা নকশা অনুসন্ধানের জন্য ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটও ব্যবহার করতে পারেন।

ওয়েবসাইট: [https://settlement.gov.bd/Map/MapSearch](https://settlement.gov.bd/Map/MapSearch?)

অনলাইনে তথ্য পাওয়া না গেলে কিংবা প্রদর্শিত তথ্যের সঙ্গে দলিলের অমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে নথি সংগ্রহ করে যাচাই করুন। অনলাইনে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মূল বা প্রত্যয়িত নথির মিল আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

দাগ নম্বর ভুল হলে কীভাবে সংশোধন করবেন?

দাগ নম্বরের ভুল সংশোধনের আগে বুঝতে হবে, ভুলটি দলিলে হয়েছে, নাকি সরকারি ভূমি রেকর্ডে রয়েছে। কারণ, দুই ধরনের ভুল সংশোধনের পদ্ধতি এক নয়।

সরকারি খতিয়ান বা জরিপের নকশায় করণিক কিংবা জরিপসংক্রান্ত ত্রুটি থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। ভুলের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য সংশোধনের আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হতে পারে।

অন্যদিকে, নিবন্ধিত দলিলে ভুল দাগ নম্বর লেখা থাকলে সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তবে ভুলের প্রকৃতি অনুযায়ী দলিল সংশোধন, অতিরিক্ত দলিল বা আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।

দাগ নম্বরের অমিলের সঙ্গে জমির মালিকানা, সীমানা বা অন্য ব্যক্তির দাবিসংক্রান্ত বিরোধ জড়িত থাকলে শুধু রেকর্ড সংশোধনের আবেদন যথেষ্ট নাও হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।

জমি কেনার আগে দাগ নম্বর না মিললে কী করবেন?

জমি কেনার সময় দলিলের দাগ নম্বরের সঙ্গে খতিয়ান বা মৌজা নকশার তথ্য না মিললে বিষয়টি উপেক্ষা করবেন না। বিক্রেতার দেওয়া কাগজপত্রের পাশাপাশি জমিটির মালিকানার ধারাবাহিকতা ও প্রকৃত অবস্থান যাচাই করুন।

জমি কেনার আগে যেসব বিষয় নিশ্চিত করবেন:

1. বিক্রেতার মালিকানার দলিল ও পূর্ববর্তী দলিল যাচাই করুন।

2. সংশ্লিষ্ট জরিপের খতিয়ান ও মৌজা নকশা মিলিয়ে দেখুন।

3. জমির পরিমাণ ও চৌহদ্দি দলিলের বিবরণের সঙ্গে মেলে কি না, তা যাচাই করুন।

4. সরেজমিনে জমির অবস্থান ও সীমানা পরীক্ষা করুন।

5. দাগ নম্বরের অমিলের কারণ পরিষ্কার না হলে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ারের সহায়তা নিন।

6. মালিকানা নিয়ে সন্দেহ বা বিরোধ থাকলে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ ছাড়া কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না।

এসব পদক্ষেপ অনুসরণ করলে ভুল জমি কেনা, সীমানা নিয়ে বিরোধ কিংবা ভবিষ্যতে মালিকানা-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

একই জমির দাগ নম্বর দুই কাগজে আলাদা হলে কোনটি সঠিক, তা নির্ধারণের জন্য শুধু দলিল বা খতিয়ানের একটি নম্বরের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। পুরোনো ও নতুন জরিপের পার্থক্য, জমির বিভাজন, নথি লেখার ভুল কিংবা রেকর্ডের ত্রুটি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে যাচাই করতে হবে।

জমির মূল দলিল, খতিয়ান, মৌজা নকশা, জমির পরিমাণ ও চৌহদ্দি মিলিয়ে দেখুন। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস ও ভূমি আইনজীবীর সহায়তা নিন। বিশেষ করে জমি কেনাবেচার আগে দাগ নম্বরের অমিলের কারণ নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এতে ভবিষ্যতে জমির মালিকানা নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধ এড়ানো সহজ হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: একই জমির দলিল ও খতিয়ানে দাগ নম্বর আলাদা হলে কোনটি সঠিক?

উত্তর: শুধু নম্বর দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট জরিপের খতিয়ান, মৌজা নকশা, দলিলের তফসিল, জমির পরিমাণ ও চৌহদ্দি যাচাই করে জমিটির পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশ্ন ২: পুরোনো ও নতুন জরিপে দাগ নম্বর আলাদা হতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ। পরবর্তী জরিপে জমির বিভাজন বা রেকর্ড পরিবর্তনের কারণে দাগ নম্বর আলাদা হতে পারে। পুরোনো ও নতুন দাগের সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট নথি ও নকশা দিয়ে যাচাই করতে হবে।

প্রশ্ন ৩: দলিলে দাগ নম্বর ভুল থাকলে কি জমির মালিকানা বাতিল হয়ে যায়?

উত্তর: শুধু দাগ নম্বর ভুল থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকানা বাতিল হয় না। তবে ভুলটি জমির পরিচয় বা মালিকানা নির্ধারণে প্রভাব ফেললে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

প্রশ্ন ৪: অনলাইনে কি জমির দাগ নম্বর যাচাই করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ। সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ব্যবস্থার ওয়েবসাইটে প্রযোজ্য তথ্য দিয়ে খতিয়ান ও দাগ নম্বর অনুসন্ধান করা যায়। জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে নথি যাচাই করা উচিত।

প্রশ্ন ৫: খতিয়ানে দাগ নম্বর ভুল থাকলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে?

উত্তর: ভুলের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অফিস অথবা উপযুক্ত ভূমি প্রশাসন কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে। দলিলের ভুল ও সরকারি রেকর্ডের ভুল সংশোধনের পদ্ধতি আলাদা হতে পারে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: