সৌদি আরবে কোম্পানি আকামা না করলে কর্মীর করণীয় কী?
সৌদি আরবে কর্মরত কোনো প্রবাসীর আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কোম্পানি নবায়ন না করলে তিনি আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে পারেন। এ অবস্থায় কর্মীর জানা জরুরি—আকামা নবায়নের দায়িত্ব কার, কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং চাকরি পরিবর্তনের সুযোগ আছে কি না। সৌদি শ্রম আইনে নিয়োগকর্তার ওপর আকামা ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের খরচ বহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই কোম্পানি দায়িত্ব পালন না করলে কর্মীকে বিষয়টি নথিভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে হবে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আকামার মেয়াদ শেষ হলে নিজের ইচ্ছায় অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করা বা নিয়ম না জেনে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বরং প্রথমে কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে শ্রম মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।
সৌদি আরবে আকামা নবায়নের দায়িত্ব কার?
সৌদি আরবের শ্রম আইনের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি কর্মী নিয়োগ, আকামা ও ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু এবং নবায়নের খরচ নিয়োগকর্তাকে বহন করতে হয়। নিয়োগকর্তার কারণে এসব নবায়নে দেরি হলে যে জরিমানা তৈরি হয়, তার দায়ও নিয়োগকর্তার ওপর বর্তায়।
অর্থাৎ, সাধারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকের আকামা নবায়নের খরচ কর্মীর ওপর চাপানো হলে বিষয়টি যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। কোম্পানি অর্থ দিতে বললে বা বেতন থেকে টাকা কাটতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র রেখে শ্রম কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
তবে গৃহকর্মীসহ নির্দিষ্ট কিছু পেশার ক্ষেত্রে আলাদা বিধিমালা প্রযোজ্য হতে পারে। তাই নিজের চাকরির ধরন অনুযায়ী সঠিক নিয়ম জেনে নেওয়া জরুরি।
কোম্পানি আকামা নবায়ন না করলে প্রথমে কী করবেন?
আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে থেকেই নবায়নের বিষয়টি নজরে রাখা ভালো। কোম্পানি সময়মতো নবায়ন না করলে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে।
১. কোম্পানিকে লিখিতভাবে জানান
প্রথমে কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা নিয়োগকর্তাকে আকামা নবায়নের অনুরোধ জানান। সম্ভব হলে ইমেইল, মেসেজ বা অন্য কোনো লিখিত মাধ্যমে যোগাযোগ করুন, যাতে পরে যোগাযোগের প্রমাণ দেখানো যায়।
২. আকামা ও চাকরির কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন
পাসপোর্ট, আকামার কপি, চাকরির চুক্তি, বেতনের প্রমাণ, কোম্পানির সঙ্গে কথোপকথন এবং নবায়নের অনুরোধসংক্রান্ত নথি নিরাপদে রাখুন। অভিযোগ করার সময় এসব তথ্য কাজে লাগতে পারে।
৩. আকামার বর্তমান অবস্থা যাচাই করুন
আকামার মেয়াদ শেষ হয়েছে কি না, ওয়ার্ক পারমিটের অবস্থা কী এবং কোম্পানির পক্ষ থেকে নবায়নের আবেদন করা হয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাই করার চেষ্টা করুন। সৌদি আরবের সরকারি ডিজিটাল সেবা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রযোজ্য তথ্য দেখা যেতে পারে।
৪. সমাধান না হলে অভিযোগ করুন
কোম্পানি বারবার অনুরোধের পরও ব্যবস্থা না নিলে সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের (HRSD) সঙ্গে যোগাযোগ করুন। অভিযোগের সময় প্রতিষ্ঠানের নাম, কর্মীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, আকামার অবস্থা এবং সমস্যার প্রমাণ প্রস্তুত রাখুন।
সৌদি আরবে আকামা নিয়ে অভিযোগ কোথায় করবেন?
সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ নম্বর ১৯৯১১। এই নম্বরে শ্রমসংক্রান্ত অভিযোগ ও পরামর্শের বিষয়ে যোগাযোগ করা যায়। মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কল সেন্টারটি রোববার থেকে বৃহস্পতিবার সৌদি স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চালু থাকে।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে অভিযোগসংক্রান্ত সেবা রয়েছে। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি জমা দিতে হতে পারে।
সরকারি ওয়েবসাইট: hrsd.gov.sa
অভিযোগ করার আগে নিজের সমস্যাটি সাধারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মসংক্রান্ত, নাকি গৃহকর্মী বা অন্য কোনো বিশেষ শ্রেণির আওতাভুক্ত—তা পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। কারণ, অভিযোগের প্রক্রিয়া ও প্রযোজ্য বিধিমালা এক নাও হতে পারে।
কোম্পানি আকামা না করলে কি অন্য কোম্পানিতে যাওয়া যাবে?
কিছু পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে কর্মীর চাকরি বা স্পনসর পরিবর্তনের সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোম্পানি আকামা নবায়ন করেনি বলেই কর্মী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করতে পারবেন—এমন নয়।
সৌদি আরবের প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী, চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত, অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। নিয়োগকর্তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা আকামা নবায়ন না করার মতো পরিস্থিতি কিছু ক্ষেত্রে কর্মীর জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু তা নির্ভর করে ঘটনার ধরন, প্রযোজ্য বিধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।
তাই অন্য কোম্পানিতে যাওয়ার আগে HRSD বা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া যাচাই করা উচিত। অনুমোদন ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করলে কর্মী নিজেও আইনি সমস্যায় পড়তে পারেন।
আকামার মেয়াদ শেষ হলে কর্মীর কী ঝুঁকি থাকতে পারে?
আকামা হলো সৌদি আরবে বৈধভাবে বসবাসের পরিচয়পত্র। এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নবায়ন না হলে কর্মীর প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
নবায়নের জন্য আকামা ফি, ওয়ার্ক পারমিট, বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিমা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হতে পারে। সৌদি আরবের সরকারি Absher নির্দেশিকায় আকামা নবায়নের ক্ষেত্রে এসব শর্তের উল্লেখ রয়েছে।
তবে আকামার মেয়াদ শেষ হলেই সব কর্মীর ক্ষেত্রে একই পরিণতি হবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। কর্মীর নথিপত্র, নিয়োগকর্তার অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রেকর্ডের ওপর পরিস্থিতি নির্ভর করে। তাই দ্রুত সরকারি পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
বেতন বন্ধ থাকলে বা কোম্পানি চাপ দিলে কী করবেন?
আকামা নবায়ন না করার পাশাপাশি কোম্পানি বেতন বন্ধ করে দিলে, কর্মীকে ভয়ভীতি দেখালে বা অন্যায়ভাবে টাকা দাবি করলে সেসব ঘটনারও প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।
কর্মী নিজের চাকরির চুক্তি, বেতনের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, মেসেজ এবং কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগের রেকর্ড রাখতে পারেন। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে অভিযোগ বা শ্রমবিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায়।
কোনো কাগজ না বুঝে স্বাক্ষর করা, পাওনা টাকা না পেয়েও পাওনা বুঝে পাওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া কিংবা চাপের মুখে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা কখন নেবেন?
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মী কোম্পানির সঙ্গে আকামা, বেতন বা চাকরিসংক্রান্ত বিরোধে আটকে গেলে এবং নিজে সমাধান করতে না পারলে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
বিশেষ করে নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হলে, নথিপত্র আটকে রাখলে, হয়রানি বা হুমকির শিকার হলে কিংবা সরকারি অভিযোগের প্রক্রিয়া বুঝতে সমস্যা হলে দূতাবাসের সহায়তা চাওয়া যেতে পারে। তবে আকামা নবায়ন বা চাকরি পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী হবে।
কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
সৌদি আরবে কাজ করতে যাওয়ার পর থেকেই আকামার মেয়াদ এবং ওয়ার্ক পারমিটের অবস্থা নিয়মিত খেয়াল রাখা উচিত। মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষা না করে আগেই কোম্পানিকে নবায়নের কথা মনে করিয়ে দিন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে কথার ওপর নির্ভর না করে লিখিত প্রমাণ রাখুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোম্পানি আকামা নবায়ন না করলেও নিয়ম না জেনে অন্যত্র কাজ শুরু করবেন না এবং অবৈধভাবে অবস্থান বা কাজের ঝুঁকি নেবেন না। দ্রুত HRSD-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজের পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য নিয়ম জেনে নিন।
সৌদি আরবে কোম্পানি আকামা নবায়ন না করলে কর্মীকে একা দায় বহন করতে হবে—এমন নয়। সৌদি শ্রম আইনে নিয়োগকর্তার ওপর আকামা ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোম্পানি ব্যবস্থা না নিলে প্রমাণ সংরক্ষণ, লিখিতভাবে অনুরোধ, HRSD-তে অভিযোগ এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ পথ।
পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
১. সৌদি আরবে কোম্পানি আকামা নবায়ন না করলে কী করব?
প্রথমে কোম্পানিকে লিখিতভাবে নবায়নের অনুরোধ জানান এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। সমাধান না হলে সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের ১৯৯১১ নম্বরে যোগাযোগ করুন।
২. আকামা নবায়নের খরচ কে বহন করবে?
সৌদি শ্রম আইনের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাধারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কর্মীর আকামা ও ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু এবং নবায়নের খরচ নিয়োগকর্তার বহন করার কথা। নিয়োগকর্তার কারণে বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট জরিমানার দায়ও তার ওপর বর্তায়।
৩. আকামার মেয়াদ শেষ হলে কি অন্য কোম্পানিতে কাজ করা যাবে?
শুধু আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অনুমতি তৈরি হয় না। চাকরি পরিবর্তনের আগে প্রযোজ্য নিয়ম ও সরকারি অনুমোদন যাচাই করতে হবে।
৪. সৌদি আরবে শ্রমসংক্রান্ত অভিযোগের নম্বর কত?
সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ নম্বর ১৯৯১১। যোগাযোগের সময় সমস্যার বিবরণ ও প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখুন।
৫. কোম্পানি আকামা না করলে বাংলাদেশ দূতাবাসে অভিযোগ করা যাবে?
প্রয়োজনে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রমকল্যাণ উইনের সহায়তা চাওয়া যায়। তবে আকামা নবায়ন ও চাকরি পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হবে।
আল-মামুন/